অসঙ্গতি অপরাধ নহে, কিন্তু তাহা প্রায়শই ঔদাসীন্যের পরিচায়ক। সরকারি কাজে ঔদাসীন্য অপরাধের শামিল। যে সরকার কর্মকুশলতার জন্য স্বাতন্ত্র্য দাবি করে, তাহার পক্ষে এই অপরাধ সমধিক। কেন্দ্রীয় সরকারের মহিলা ও শিশু বিকাশ মন্ত্রক নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা সম্পর্কে সংসদে একটি পরিসংখ্যান দিয়াছে, আদালতে অন্য একটি। অসঙ্গতি ধরা পড়িবার পরে মন্ত্রক নানাবিধ যুক্তি খাড়া করিবার চেষ্টা করিয়াছে, কিন্তু তাহাতে সত্য আড়াল করা যায় নাই। বিভিন্ন রাজ্য হইতে নিখোঁজ শিশুর যে পরিসংখ্যান কেন্দ্রে পৌঁছয়, তাহা সমন্বিত করিয়া একটি প্রামাণ্য হিসাব তৈয়ারি করিবার নিতান্ত প্রাথমিক কাজটুকুও ঠিক ভাবে করা হয় না, এই কারণেই এমন অসঙ্গতি ঘটিতে পারে। মন্ত্রকের কর্তা ও কর্মীরা এই বিষয়ে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মনোযোগ করিলে এমনটি হইত না।
এই ঔদাসীন্য প্রতীকী। শিশুদের সমস্যার প্রতি সরকারি মনোভাবে যে সামগ্রিক ঔদাসীন্য বিভিন্ন ভাবে প্রকট, ইহা তাহারই একটি অঙ্গ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাহার সহিত যুক্ত হইয়াছে এক গভীরতর সত্য। এ দেশে নিখোঁজ শিশুদের অধিকাংশই দরিদ্র, অনেকেই অনাথ অথবা কার্যত অনাথ। অনুমান করিতে কিছুমাত্র অসুবিধা নাই, তাহাদের অনেকের সম্পর্কে খোঁজখবর করিবার কোনও তাগিদ প্রশাসনের থাকে না, দায়সারা বিজ্ঞাপন দিয়াই তাহার কাজ ফুরায়। কিন্তু আরও গভীর এবং যন্ত্রণাদায়ক একটি সত্য আছে। যে শিশুরা সরকারি মতে নিখোঁজ সাব্যস্ত হয়, তাহাদের কত শতাংশ সত্যই হারাইয়া যায় আর কত শতাংশ নানা ভাবে পাচার হয়, সেই হিসাব কোনও প্রশাসনের খাতায় মিলিবে না। বস্তুত, মহিলা ও শিশু বিকাশ মন্ত্রকের হিসাবে যে অসঙ্গতি ধরা পড়িয়াছে, প্রকৃত নিখোঁজ এবং সরকারি হিসাবে নিখোঁজের তথ্যে তাহা অপেক্ষা অনেক বেশি অসঙ্গতি থাকিবার সম্ভাবনা। মন্ত্রকের কর্তারা সম্ভবত অতঃপর এ বারের ন্যায় ভুল করিবার বিষয়ে সতর্ক থাকিবেন, কিন্তু গভীরতর অসঙ্গতিটি বিশ্লেষণের কোনও চেষ্টা তাঁহারা করিবেন, এমন ভরসা হয় না।
ভরসা না হইবার প্রধান কারণ, শিশুদের পাচার হইবার পিছনে যে ধরনের সামাজিক ও আর্থিক পরিস্থিতি কাজ করে, তাহার মোকাবিলায় কোনও সরকারই আজ অবধি কোনও সুসংহত নীতি রচনা করিতে পারে নাই, চাহেও নাই। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্তরে বিশদ পরিকল্পনা সম্ভব নহে, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। বিভিন্ন রাজ্যে, বস্তুত বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ভাবে মোকাবিলার প্রয়োজন হইতে পারে। বিশেষত সীমান্তবর্তী রাজ্য বা এলাকাগুলিতে সমস্যার মাত্রা ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। কিন্তু একটি শর্ত সর্বত্র সমান প্রযোজ্য। তাহার নাম সদিচ্ছা। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক সদিচ্ছা। যে কোনও অঞ্চলে শিশু পাচারের পিছনে যে ধরনের চক্র কাজ করে এবং যে ভাবে কাজ করে, তাহার সম্পর্কে স্থানীয় স্তরে খোঁজখবর না থাকিবার কিছুমাত্র কারণ নাই। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও যে এই কারবার চলিতে থাকে, তাহার কারণটি সহজবোধ্য: যাঁহারা স্থানীয় স্তরে ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি ভোগ করেন তাঁহারা এই কারবার বন্ধ করিতে তৎপর নহেন। তাহার পিছনে অনেক ক্ষেত্রে হয়তো সরাসরি স্বার্থের গূঢ় লীলা কাজ করে, কিন্তু সম্ভবত আরও বড় কারণ নীচের তলা সম্পর্কে উপরতলার মজ্জাগত ঔদাসীন্য। সমাজের এই ঔদাসীন্যই রাজনীতি ও প্রশাসনের পরিচালকদের বোধ এবং আচরণে সংক্রামিত হয়। একেবারে দিল্লি অবধি।