আমির খান ভারতের পর্যটন ডাকিবার বিজ্ঞাপনের মুখ ছিলেন, তাঁহার পর আর কাহাকেও বাছিয়া লওয়া হইতেছে না কেন, সেই প্রসঙ্গে ভারতের পর্যটনমন্ত্রী মহেশ শর্মা যাহা বলিলেন, তাহার মর্মার্থ: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থাকিতে এই কার্যে আর কাহাকে প্রয়োজন? তাঁহার অধিক বড় ম্যাসকট কে আছে? তিনি সমগ্র বিশ্বে জনপ্রিয়, তাই এই বার তিনিই হইবেন ভারতে পর্যটন ডাকিবার মুখ। মন্ত্রিমহোদয় ভুল বলেন নাই। প্রধানমন্ত্রীর হাবভাব দেখিয়া, ব্র্যান্ড অ্যামবাসাডরই মনে হইতেছে, যাঁহার কাজ অনাবিল হাস্য মুখে ঝুলাইয়া তাঁহার পণ্যের অনর্গল গুণগান করা, তিরিশ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনের ন্যায় চমকপ্রদ ও অগভীর বক্তব্য পেশ, এবং এক গড় সেলসম্যানের মতোই, শেষ বিচারে বিফলমনোরথ হইয়া ফিরিয়া আসা।
মোদী প্রধানমন্ত্রী হইবার পর প্রথম বৎসরে গিয়াছেন যোলোটি দেশে, দ্বিতীয় বৎসরে দশটি। দেশে দেশে তিনি বিপুল অভ্যর্থনা পাইয়াছেন, কখনও বারাক ওবামাকে ‘বারাক, বারাক’ বলিয়া ডাকিয়া বিশ্বকে চমকিত করিয়াছেন, কখনও ফ্রঁসোয়া ওলাঁদকে আষ্টেপৃষ্ঠে আলিঙ্গন করিয়া তাঁহাকে আড়ষ্ট অস্বস্তিতে ফেলিয়াছেন, কখনও তানজানিয়ার রাষ্ট্রপতির সহিত সঙ্গত করিয়া বিশাল ঢাক বাজাইয়াছেন। কিন্তু ঢক্কানিনাদে পটু হইলেই কূটনৈতিক জয় রূপকথার আপেলের ন্যায় খসিয়া পড়ে না, কোনও দেশের কর্ণধার ক্যামেরার সম্মুখে হাসিয়া গলিয়া পড়িলেই যে ভারতের এনএসজি-তে প্রবেশের প্রশ্নে অনুকূল ভোটটি দিবেন, তাহার অর্থ নাই। রাষ্ট্রনায়কের বাড়িতে না বলিয়া-কহিয়া অকস্মাৎ মধ্যাহ্নভোজ খাইতে হাজির হইলে, গণমাধ্যম আলোড়িত হয় বটে, কিন্তু সেই রাষ্ট্রের সহিত বন্ধুতা বাস্তবে সম্ভব হইয়া উঠে না। বিস্মিত গৃহকর্তা যথাবিধি আপ্যায়ন করেন, কিন্তু পরবর্তী কালে, মোক্ষম মুহূর্তে, ভারত যাহাকে ‘উগ্রপন্থী’ ডাকিতেছে, তাহাকে ‘শহিদ’ আখ্যা দিয়া প্রবল বিরোধিতা শুরু করিয়া দেন। কূটনীতি ও নাট্যরঙ্গ এক নহে, চমক-বক্তৃতা এক কথা, চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিয়া দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা আদায় করিয়া আনা ভিন্ন ব্যাপার।
সমস্ত দেশে প্রধানমন্ত্রীকেই ছুটিয়া যাইতে হইবে, তবেই কূটনীতির সুফসল ফলিবে, ইহাও উদ্ভট ধারণা। তাহা হইলে আর কূটনীতিকরা বসিয়া রহিয়াছেন কেন? নেতা হইবার এক আবশ্যিক গুণ, দায়িত্ব বিতরণ করিতে জানা। একাই গোল দিব, গোল রক্ষাও করিব, কোনও খেলোয়াড় এমন ভাবিয়া বসিলে, দলবদ্ধতার সমন্বয়ধর্মটি নষ্ট করিবেন, পরাজয় নিশ্চিত করিবেন। অহংকে অগ্রাধিকার দিয়া কাজের সুবিধাই মাটি করা বুদ্ধিমানের নীতি নহে। এই কাণ্ড যিনি ক্রমাগত করিয়া চলিয়াছেন, তিনি সম্ভবত নিজ ক্ষমতা সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী, ‘দেখোই না, চিনের প্রধানমন্ত্রীকেও ব্যক্তিগত চুম্বকশক্তির বশে কেমন পাড়িয়া ফেলি!’ ধরনের কথা ভাবেন, শিশু যেমন সুপারম্যান-সুপারম্যান খেলিয়া থাকে। আর, এই অভিযানগুলি বারংবার কার্যক্ষেত্রে ব্যর্থ হইতেছে দেখিয়াও তিনি যে কৌশল বদলাইতেছেন না, তাহা প্রমাণ করে, তিনি একটি গতেই চিন্তা করিতে পারেন। বিকল্প ভাবনার বহুমুখিতা, পিছাইয়া আসিয়া নূতন পথে অগ্রসর হইবার নমনীয়তা তাঁহার অভিধানে স্থান পায় না। হয়তো দেশের কল্যাণ অপেক্ষা, তাঁহার প্রকৃত উৎসাহ দেশের ‘পোস্টার বয়’ হইয়া উঠা, দেশের জন্য তিনি উদয়াস্ত খাটিতেছেন— ইহা প্রচার করা, যেমন ব্র্যান্ড অ্যামবাসাডরেরা সলীল ভান করিয়া থাকেন!