কলেজের পরিচালন সমিতিতে সরকারি প্রতিনিধি রূপে মনোনীত হইতে হইলে অতঃপর অন্তত স্নাতক হইতেই হইবে, শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় নির্দেশ দিলেন। শিক্ষা জগতের দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করিবার দায়িত্বটি যথেষ্ট পালন করা হইয়াছে ভাবিয়া শিক্ষামন্ত্রী সুখে নিদ্রা যাইতে পারেন। এই রাজ্যে সকলই প্রতীকী, কাজেই এই ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রমী হইবার দায় তাঁহার সম্ভবত নাই। কিন্তু, প্রতীক হিসাবেও ইহা বড় অল্প হইল। মন্ত্রিমহোদয়ের সিদ্ধান্তে আরাবুল ইসলামদের গায়ে আঁচড়টিও পড়িবে না। সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত কলেজগুলির পরিচালন সমিতির গঠন দেখিলেই আর সংশয় থাকে না। সমিতিতে সরকারি প্রতিনিধি দুই জন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিও দুই জন। চার জন শিক্ষক ও দুই জন শিক্ষাকর্মী নির্বাচনের মাধ্যমে সমিতিতে আসেন। কলেজের অধ্যক্ষ সমিতির সচিব। এক জন ছাত্রও সমিতির সদস্য হন। এবং, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও (কলিকাতা পুরসভার ক্ষেত্রে কাউন্সিলর, অন্য পুরসভার পুরপ্রধান এবং পঞ্চায়েত এলাকায় পঞ্চায়েত সমিতির প্রধান) এই সমিতির সদস্য। যাঁহারা কলেজে কর্মরত, তাঁহাদের বাদ রাখিয়া সভাপতি নির্বাচন করিতে হয়। সমিতি যদি সঙ্গত বোধ করে, তবে কোনও বহিরাগতকেও সভাপতি করা চলে। তাঁহার শিক্ষাগত যোগ্যতা লইয়া প্রশ্ন উত্থাপনের কোনও অবকাশ নাই। আরাবুল ইসলাম এই পথেই ভাঙড় কলেজে ঢুকিয়াছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী সিংহদুয়ারটি খোলা রাখিয়া খিড়কির দরজায় তালা লাগাইয়াছেন।
পার্থবাবু বলিতেই পারেন, তাঁহার হাত বাঁধা। কলেজের পরিচালন সমিতি কী ভাবে গঠিত হইবে, তাহা রাজ্য সরকার স্থির করে না। সেই এক্তিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের। সিন্ডিকেটে গৃহীত প্রস্তাব সেনেটের সম্মতিক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের নিকট হইতে যখন অনুমোদিত হইয়া আসে, তখন সেই নিয়ম রাজ্য সরকার বদলাইতে পারে না। কথাটি ভুল নহে। এই ক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের। শিক্ষাজগতের সহিত দূরতম সম্পর্কও নাই, এমন ব্যক্তিরাও পরিচালন সমিতির সদস্য হইতে পারেন, এহেন একুশে আইন কী ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পাইয়াছিল, তাহা ভাবিবার বিষয়। অনুমান করা চলে, তাহা রাজনীতির প্রভাব ব্যতীত হয় নাই। কিন্তু, একটি বিচিত্র নিয়ম চালু বলিয়া তাহাকেই মানিয়া চলিতে হইবে, এমন কোনও দায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নাই। অবিলম্বে এই নিয়ম পরিবর্তন করা প্রয়োজন। শুধু স্নাতক হইলেই চলিবে না, কলেজের পরিচালন সমিতিতে ঠাঁই পাইতে হইলে শিক্ষা জগতের সহিত যুক্ত থাকিতেই হইবে। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজগুলিতে পরিচালন সমিতির গুরুত্ব এবং ক্ষমতা যে প্রকার, তাহাতে যে কাহারও হাতে সেই দায়িত্ব ন্যস্ত করা অতি বিপজ্জনক। সেই বিপদের অবয়ব আরাবুল ইসলামের ন্যায়।
তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কন্ধে দায় চাপাইলেই মন্ত্রিবরের দায়িত্ব ফুরাইয়া যায় না। কলেজের পরিচালন সমিতিতে আরাবুলদের অনুপ্রবেশ (বলা ভাল, আবির্ভাব) ঘটনাক্রমে হয় নাই। সব প্রতিষ্ঠানে নির্বিকল্প দলতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঐকান্তিক তাগিদই আরাবুলদের এই আসন দিয়াছে। দলতন্ত্র কায়েমের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি যে বামপন্থীদের দান, তাহা অনস্বীকার্য। কিন্তু, বর্তমান শাসকরাও সেই ধারাটিকে অব্যাহত রাখিয়াছেন। কাজেই, এই সমস্যাটির মূলোচ্ছেদ করিতে হইলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিকল্প নাই। পার্থবাবু এবং তাঁহার দলনেত্রীকে বিশ্বাস করিতে হইবে, শিক্ষাঙ্গনে অশিক্ষিতদের প্রবেশাধিকার নাই। রাজনীতির কোনও প্রয়োজনই শিক্ষার ভবিষ্যত্ অপেক্ষা গুরুতর হইতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম পাল্টাইলেই মন পাল্টাইবে না, বরং নূতন নিয়মে ছিদ্রের সন্ধান করিবে। কাজেই, নেতারা মন পাল্টান। আরাবুল ইসলামরা দলের রাজনৈতিক ‘সম্পদ’ হইতে পারেন, কিন্তু কাহার স্থান কোথায়, এই বিচারবোধ জরুরি।