মিড-ডে মিলের বন্দোবস্ত করতে যাচ্ছিলেন কর্তারা। জেলায় জেলায় শিশু শিক্ষাকেন্দ্রগুলির (এসএসকে) পরিস্থিতি দেখে তাঁদের মাথায় হাত। একের পর এক কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কোনও কেন্দ্রে নেই পড়ুয়া, কোনও কেন্দ্রে অভাব শিক্ষকের। কোনও কেন্দ্রে দুইয়েরই সঙ্কট।
দুয়ারে শিক্ষা পৌঁছে দিতে বছর কুড়ি আগেই রাজ্যে তৈরি করা হয়েছিল শিশু শিক্ষাকেন্দ্র (এসএসকে)। ধীরে ধীরে পড়ুয়ার সংখ্যা কমেছে। এখন সেগুলি ধুঁকছে বলে অভিযোগ। জেলার প্রত্যন্ত এলাকা হোক, বা শহর কলকাতার প্রান্তিক মানুষের আবাসস্থল— সকলের জন্য শিক্ষার প্রকল্প কি তবে মুখ থুবড়ে প়ড়েছে? প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকদের একাংশই।
স্কুলশিক্ষা দফতর সূত্রের খবর, ২০১৫ থেকেই দেখা পড়ুয়ার অভাবে বিভিন্ন সরকার পোষিত স্কুলে পাকাপাকি ভাবে তালা পড়েছে। বাদ যায়নি খাস কলকাতাও। বিখ্যাত লেখকেরা যে স্কুলে পড়শোনা করেছিলেন সেগুলিও পড়ুয়ার অভাবে বন্ধ হয়েছে। কোথাও ছাত্রাভাবে দু’টি স্কুলের পড়ুয়াদের একসঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামে যেখানে প্রাথমিক ও এসএসকে স্কুলগুলির গুরুত্ব অপিরসীম সেখানেও পড়ুয়া ভর্তি হচ্ছে না কেন? তারা যাচ্ছে কোথায়? তবে কি বাড়ছে স্কুলছুটের সংখ্যা? সর্বশিক্ষা মিশন, যা নাম বদলে এখন সমগ্র শিক্ষা অভিযান— তার বাস্তবতাই বা কোথায়?
দফতরের এক কর্তা জানান, কেন্দ্রের ইউপিএ-১ সরকার প্রতি কিলোমিটারে শিশু শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলে। প্রাক্-প্রাথমিক থেকে চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য এই কেন্দ্র। বিশেষত পঞ্চায়েত এলাকায় সাধারণ প্রাথমিক স্কুলগুলির মধ্যে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে যাতে পড়ুয়ারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই লক্ষ্যেই এসএসকে তৈরি করা হয়েছিল। এ রাজ্যে বাম আমলে স্কুলশিক্ষা দফতরের অধীনে সর্বশিক্ষা মিশন প্রকল্পে এইগুলি তৈরি হয়। পঞ্চায়েত এলাকার ক্ষেত্রে এই কেন্দ্রগুলির পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতি ও ব্লক ডেভলেপমেন্ট আধিকারিকে উপরে। পুরসভা এলাকাতেও এই ধরনের কেন্দ্র রয়েছে।
অভিযোগ, ধীরে ধীরে এই কেন্দ্রগুলি বেহাল হতে শুরু করেছে। বিরোধীরা আঙুল তুলছেন সরকারের দিকে। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যেমন এসএসকে রয়েছে, তেমনই রয়েছে সরকারি পোষিত প্রাথমিক ও উচ্চপ্রাথমিক স্কুলও। নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধ্রুবশেখর মণ্ডল বলেন, “পঞ্চায়েত এলাকায় বিশেষত প্রান্তিক মানুষের জন্য কেন্দ্র সরকারের সহযোগিতায় রাজ্য সরকার এই স্কুলগুলি তৈরি করেছিল বাম আমলে। কোনও ভাবেই যেন শিশুরা স্কুলের থেকে দূরে না সরে যায়, সে জন্যই এই উদ্যোগ। কিন্তু বর্তমান সরকার সে দিকে নজরই দিল না।”
হিসাব বলছে, প্রতিটি কেন্দ্রে অন্তত দু’জন করে সহায়ক ও একজন মুখ্য সহায়ক থাকার কথা। বহু ক্ষেত্রেই তা নেই। এ নিয়ে সার্বিক সচেতনতার অভাব রয়েছে বলেই মনে করছেন বিরোধীরা। দাবি, স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্যেরা অভিভাবকদের এই কেন্দ্রের গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাতে পারলে পরিস্থিতি এমন হত না। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, “দুয়ারে সরকার নিয়ে মাতামাতি হলেও দুয়ারে শিক্ষা নেই। সরকারের সে দিকে কোনও হুঁশই নেই। এটাই দুর্ভাগ্যের।”
যদিও পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির রাজ্য সভাপতি মইদুল ইসলাম এই বেহাল অবস্থার কথা স্বীকার করে সরাসরি কাঠগড়ায় তুলেছেন কেন্দ্রকে। তিনি বলেন, “কেন্দ্র সমগ্র শিক্ষার টাকা বন্ধ করে দেওয়ায় পৌর এলাকার কেন্দ্রগুলির শিক্ষকেরা গত ছ’মাস বেতন পাচ্ছেন না। পরিকাঠামোর অভাবে স্কুলগুলির বেহাল অবস্থা।’’ এসএসকে এবং এমএসকের নানা দাবি নিয়ে আন্দোলন করা সংগঠন শিক্ষক ঐক্য মুক্ত মঞ্চের সভানেত্রী ছবি চাকি দাস হাজরা বলেন, “২০১৩ সালের পর থেকে কেন্দ্রগুলিতে কোনও সহায়ক (শিক্ষক) নিয়োগ হয়নি। রাজ্য সরকার ২০১৯ সাল নাগাদ ৫ হাজার থেকে বেতন দ্বিগুন করে ১০ হাজার করে দিয়েছে। বার্ষিক ৩ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধিও হয়। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ না হলে কেন্দ্রগুলির হাল ফেরানো মুশকিল।”
পুর এলাকায় যে এসএসকে রয়েছে সেখানে সহায়কদের গত ছ’মাস ধরে বেতন হচ্ছে না বলে অভিযোগ। লিখিত ভাবে পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরকে লিখিত ভাবে অভিযোগ জানানো হয়েছে বলেও খবর। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে কেন্দ্র-রাজ্য জটিলতা। ‘সমগ্র শিক্ষা মিশন’ নামের সঙ্গে ‘পিএম’ (প্রধানমন্ত্রী) নাম যুক্ত হওয়ায় আপত্তি তুলেছে রাজ্য সরকার। তারা এ নাম ব্যবহার করতে চায় না। আবার কেন্দ্রও তা না করলে অর্থ বরাদ্দ করতে চায় না। আখেরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে পড়ুয়ারা। কার্যত তলানিতে ঠেকছে শিক্ষার হাল। সঙ্কটে গোটা রাজ্যের প্রায় ৫ হাজার শিশু শিক্ষাকেন্দ্র।