এক দিকে দাঁড়িয়ে আছেন এক জন বাঙালি মহিলা। আর অন্য দিকে, প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে নির্বাচন কমিশন। রয়েছে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় এজেন্সিও। কিন্তু তার পরেও তৃণমূলকে হারানো সম্ভব নয়। বাঁকুড়ার বড়জোড়া এবং পূর্ব বর্ধমানের ভাতারের সভা থেকে এই ভাষাতেই বিজেপির বিরুদ্ধে সুর চড়ালেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে, ঝাড়গ্রামে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঝালমুড়ি খাওয়া নিয়েও কটাক্ষ করলেন তৃণমূলের ‘সেনাপতি’।
মমতা বনাম কেন্দ্রীয় এজেন্সি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা— সোমবার এই সুরে সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা। মঙ্গলবার বড়জোড়ার সভায় সেই সুর আরও কয়েক গুণ চড়িয়ে দিলেন অভিষেক। তাঁর কথায়, ‘‘বিজেপি সম্ভাব্য সব রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করছে।’’ কিন্তু তার পরেও এ রাজ্যে ত়ৃণমূলকে হারানো সম্ভব নয় বলেই দাবি অভিষেকের। কারণ? ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ মতে, বিজেপির সব শক্তির বিরুদ্ধে ‘লড়াই’ করছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেকের কথায়, ‘‘এক দিকে আছেন এক জন বাঙালি মহিলা, আর অন্য দিকে আছেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, ১৬টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, ইডি, সিবিআই, হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, আধাসামরিক বাহিনী, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশন।’’ এই দুই ‘শক্তির’ লড়াইয়ের কথা জানিয়ে অভিষেক বিভিন্ন জনমত সমীক্ষার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘‘সব জায়গায় বলছে তৃণমূল আবার ফিরছে। কেউ আটকাতে পারবে না। মানুষ কারও সঙ্গে থাকলে, তবে কেউ তাঁকে আটকাতে পারে না।’’
এই ‘লড়াইয়ে’ মোদীর এবং মমতার শাসনকালের উদাহরণও তুলে ধরেছেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘মোদী সরকার আকাশছোঁয়া দাম বাড়িয়ে আপনাদের উপর বোঝা চাপাচ্ছে, আর অন্য দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ এবং ‘যুব সাথী’র মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।’’ একই সঙ্গে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে টাকা আটকে রাখা, এসআইআরের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন অভিষেক। বড়জোড়া কেন্দ্রে মমতার সরকার কী কী উন্নয়নমূলক কাজ করেছে তার খতিয়ান তুলে অভিষেকের দাবি, ‘‘এখানে মোদী সরকারের অবদান শূন্য।’’
বাঙালি মনীষীদের অপমান, বিজেপিশাসিত রাজ্যে গিয়ে এখানকার পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থার অভিযোগ আরও এক বার তুললেন অভিষেক। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁরা আমাদের বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেন, আমাদের মাছ খাওয়া নিয়ে মজা করেন এবং এসআইআর থেকে শুরু করে লকডাউন, নোটবন্দি-সহ নানা কারণে লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য করেছেন, তাঁদের জবাব দেওয়া উচিত।’’ তবে সেই জবাব অবশ্যই গণতান্ত্রিক উপায়ে হতে হবে বলে জানান অভিষেক।
আরও পড়ুন:
শুধু বড়জোড়া নয়, ঝাড়গ্রামের প্রচারে গিয়েও কেন্দ্র এবং বিজেপির বিরুদ্ধে একসুরে আক্রমণ করেন অভিষেক। একই সঙ্গে মোদীর ঝালমুড়ি খাওয়া নিয়ে সরব হন। দিন দুয়েক আগে ভোটপ্রচারে এসে ঝাড়গ্রামে স্থানীয় এক দোকান থেকে ঝালমুড়ি খেয়েছিলেন মোদী। মঙ্গলবার লালগড়ের সভা থেকে মোদীর জনসংযোগকে কটাক্ষ করেন অভিষেক। মনে করান ২০১১ সালের আগের ঝাড়গ্রাম-সহ জঙ্গলমহলের পরিস্থিতির কথা। মোদীর উদ্দেশে অভিষেক বলেন, ‘‘আপনি পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন! কিন্তু ২০১১ সালের আগে হলে আপনি ঝাড়গ্রামে নামতেই পারতেন না। চক্কর খেতে হত আকাশে।’’
ঝাড়গ্রামে যে দিন মোদীর সভা ছিল, সে দিনই সেই এলাকায় তৃণমূল প্রার্থীর হয়ে প্রচারে আসার কথা ছিল সস্ত্রীক ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের। কিন্তু তৃণমূল অভিযোগ করে, ঝাড়গ্রামে প্রধানমন্ত্রীর সভার জন্য ‘নো ফ্লাই জ়োন’ করে দেওয়া হয়েছিল। সে জন্যই শুধু কেশিয়াড়িতে সভা করেই রাঁচী ফিরে যেতে হয়েছিল সস্ত্রীক সোরেনকে। সেই প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, ‘‘সমাজমাধ্যমে দেখলাম ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীকে আটকে দিয়ে ঝাড়গ্রামে ঝালমুড়ি খাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী!’’ তার পরেই অভিষেক বছর ১৫ আগে জঙ্গলমহলের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, ‘‘আগে কী পরিস্থিতি ছিল ঝাড়গ্রাম, গোপীবল্লভপুর, লালগড়, বিনপুর, নেতাইয়ের? সকাল ১১টা-১২টার পর মানুষ বাইরে বার হতে পারতেন না। থানা বন্ধ থাকত। আর আজ সেখানে এসে দেশের প্রধানমন্ত্রী ঝালমুড়ি খাচ্ছেন। এর থেকে বড় গর্বের কিছু হতে পারে না।’’
তৃণমূলের আমলে লালগড়, ঝাড়গ্রামে কী কী উন্নয়ন হয়েছে, তার খতিয়ান দেন অভিষেক। প্রশ্ন তোলেন, দু’বছর ওড়িশায় সরকারে রয়েছে বিজেপি, তার পরেও কেন কুড়মিদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি? তাঁর কথায়, ‘‘প্রধানমন্ত্রী বলছেন কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করবেন। কিন্তু আজ থেকে দু’মাস আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এই দাবি জানিয়েই কেন্দ্রীয় সরকারকে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু তা নিয়ে মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কিছুই করেননি।’’ অভিষেকের চ্যালেঞ্জ, ‘‘আমার কথা মিথ্যে হলে রাজনীতি ছেড়ে দেব।’’ শাহ প্রায় প্রতি সভা থেকেই বলছেন, ‘‘বিজেপি সরকারে এলে এ রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) চালু করবে।’’ সেই বিষয়ে অভিষেকের বার্তা, ‘‘ওই বিধি জোর করে আপনার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
-
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল আরএন রবি, ইস্তফা না-দিলেও মমতা এখন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী! রাজ্য কার?
-
বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী! রাজ্যে প্রচারে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন কথা
-
ভোট-পরবর্তী গোলমালে রুজু ২০০ এফআইআর! কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অশান্তি পাকাতে চাইছেন: ডিজি সিদ্ধনাথ
-
‘কমিশন ১০টি গণনাকেন্দ্রের ছয় ঘণ্টার ফুটেজ দিক, দেখাক কিছু হয়নি, আমি মেনে নেব এটাই জনাদেশ’! চ্যালেঞ্জ অভিষেকের
-
৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেল বিজেপি! ৮০টি আসনে জয়ী তৃণমূল, তাদের ভোটের হার কত