যে যাঁর ‘কাজ’ করে গেলেন। গত কয়েক দিন ধরেই দ্বিতীয় দফার ভোটে সবচেয়ে নজরকাড়া কেন্দ্র হিসাবে ভবানীপুরকেও বার বার পিছনে ফেলে দিচ্ছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে পড়া ফলতা বিধানসভা আসনটি। সৌজন্যে দুই ‘মুখোমুখি’ চরিত্র। প্রথম জন ফলতার তরুণ তৃণমূল প্রার্থী ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গির খান, যিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঘনিষ্ঠ’ বলে পরিচিত এবং ডাকাবুকো নেতা। দ্বিতীয় জন উত্তরপ্রদেশ থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার পুলিশ পর্যবেক্ষক হয়ে আসা ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ ওরফে ‘সিংহম’ অজয়পাল শর্মা, যিনি জাহাঙ্গিরের বাড়ির সামনে গিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে আলোড়ন তুলে দেন প্রচারমাধ্যমে। যার জবাব দেন জাহাঙ্গিরও।
ভোটের দিন অবশ্য সেই সংঘাতের রেশ দেখা যায়নি। সারা দিন ফলতার শ্রীরামপুর এলাকার দলীয় দফতরে নিজেকে বন্দি রেখেছিলেন জাহাঙ্গির। আর অজয়পাল সারা দিন চষে বেরিয়েছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তবে সোমবারের মতো সরাসরি মাঠে নেমে নয়, কখনও গাড়িতে চেপে, কখনও সিআরপিএফ-এর ক্যাম্পে বসেই পরিস্থিতির উপর নজর রেখেছিলেন তিনি।
বুধবার সকাল ৭টায় বেরিয়েছিলেন অজয়পাল। তাঁর প্রথম গন্তব্য ছিল ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের শিরাকল। সেখান থেকে ডায়মন্ড হারবারের দিকে যান। গুরুদাসনগর থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যান ডায়মন্ড হারবার রেলস্টেশন সংলগ্ন সিআরপিএফ ক্যাম্প অফিসে। সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ এই ক্যাম্প অফিসেই সিআরপিএফ-এর ডিজির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের হরিণডাঙা এলাকায়। এই হরিণডাঙারই একটি ভোটকেন্দ্রে ইভিএমে বিজেপির প্রতীকের উপর কালো টেপ লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বুথের সামনে বিক্ষোভও দেখায় বিজেপি। তবে অজয়পাল ওই ভোটকেন্দ্রে যাননি।
হরিণডাঙা থেকে অজয়পাল চলে যান ফলতা বিবেকানন্দ আদর্শ বিদ্যালয়ে। স্কুল চত্বরে থাকা সিআরপিএফ ক্যাম্পে দীর্ঘ সময় ছিলেন তিনি। তাঁকে নিয়ে স্থানীয়দের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ কেউ অজয়পালকে দেখার জন্যই ক্যাম্পের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। তবে অজয়পালের দেখা মেলেনি। দুপুর দেড়টা নাগাদ ফলতা বিধানসভার ফতেপুর, দিঘির পাড়, পয়সামোড়ের মতো এলাকায় টহল দিয়ে ডায়মন্ড হারবারের উদ্দেশে রওনা দেয় অজয়পালের গাড়ির কনভয়। সেখানে সিআরপিএফ ক্যাম্পে কিছু ক্ষণ ছিলেন। তার পর সাড়ে ৩টে নাগাদ ফের ফলতায় যান দক্ষিণ ২৪ পরগনার পুলিশ পর্যবেক্ষক। সেখান থেকে চলে যান আমতলায়।
গত সোমবার ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গিরের বাড়িতে হানা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশ। নেতৃত্বে ছিলেন অজয়পাল। ভোটারদের হুমকি দিলে ফল ভাল হবে না, মোটামুটি এটাই জাহাঙ্গিরের পরিচিতদের বুঝিয়ে চলে যান আদিত্যনাথের রাজ্যের ‘এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট’। এই ঘটনার পরে ওই পুলিশ পর্যবেক্ষকের এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলে তৃণমূল। বুধবার অবশ্য গাড়ি থেকে নামেননি অজয়পাল। তবে তাঁর সঙ্গে থাকা সিআরপিএফ জওয়ানেরা একাধিক জায়গায় গাড়ি থেকে নেমে ভিড় ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেন। কোথাও কোথাও লাঠিচার্জও করা হয়। প্রশাসনের একটি সূত্রের বক্তব্য, পুলিশ পর্যবেক্ষক আদতে নির্বাচন কমিশনের চোখ ও কান হিসাবে কাজ করেন। তাঁর কাজ কোনও ঘটনা সরেজমিনে খতিয়ে দেখে কমিশনের কাছে রিপোর্ট জমা দেওয়া। কিন্তু স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে কোনও পদক্ষেপ করা নয়। বুধবার অজয়পাল সেই ‘রুলবুক’ মেনেই কাজ করেছেন বলে মনে করছেন অনেকে।
অজয়পাল যেমন ঘুরে বেরিয়েছেন, জাহাঙ্গির তেমন ‘ঘর’ থেকে বেরোননি। নিজের নির্বাচনী কার্যালয়েই কাটিয়েছেন সকাল থেক। ভোট শেষ হওয়ার পর নিজের নির্বাচনী দফতর থেকে বেরোন। প্রত্যয়ের সুরে বলেন, “হাজার সিংহম এলেও আমি একই ভাবে ভোট করাব। আমার আসল কাজ ভোট করানো।” পরে আনন্দবাজার ডট কম-কে জাহাঙ্গির বলেন, “কেন্দ্রীয় বাহিনী সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার করেছে। কমিশনও বিজেপির কথায় কাজ করছে।” নিজের জয়ের ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ আশাবাদী বলেও জানান জাহাঙ্গির।
অন্য দিকে, দ্বিতীয় দফার ভোটের পর রাজ্যের ৭৭টি বুথে পুনর্নির্বাচন চেয়েছে বিজেপি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বুথ রয়েছে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রেই (৩২)। তার পরে রয়েছে মগরাহাট (১৩), ডায়মন্ড হারবার (২৯) এবং বজবজ (৩)। ঘটনাচক্রে, সব ক’টি বুথই দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্গত।
সোমবার রাতে অজয়পাল তাঁর বাড়িতে হানা দেওয়ার পর জাহাঙ্গির বলেছিলেন, ওই পুলিশ আধিকারিক ‘সিংহম’ হলে তাঁরাও এক এক জন ‘পুষ্পা’। নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতমূলক আচরণে কেউ মাথা নত করবেন না বলেও জানান জাহাঙ্গির। তবে আশঙ্কা থাকলেও বুধবার ‘সিংহম’ বনাম ‘পুষ্পা’ সরব দ্বৈরথ দেখা যায়নি। ‘যুদ্ধটা’ নীরবেই চলেছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
-
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল আরএন রবি, ইস্তফা না-দিলেও মমতা এখন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী! রাজ্য কার?
-
বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী! রাজ্যে প্রচারে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন কথা
-
ভোট-পরবর্তী গোলমালে রুজু ২০০ এফআইআর! কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অশান্তি পাকাতে চাইছেন: ডিজি সিদ্ধনাথ
-
‘কমিশন ১০টি গণনাকেন্দ্রের ছয় ঘণ্টার ফুটেজ দিক, দেখাক কিছু হয়নি, আমি মেনে নেব এটাই জনাদেশ’! চ্যালেঞ্জ অভিষেকের
-
৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেল বিজেপি! ৮০টি আসনে জয়ী তৃণমূল, তাদের ভোটের হার কত