ভরা ভোট মরসুমে রামনবমী তিথি। দলের পতাকা দূরে সরিয়ে রেখে সামাজিক উপায়ে জনসংযোগের বিরাট সুযোগ। সে সুযোগের সদ্ব্যবহারে বিন্দুমাত্র ঘাটতি রাখতে চায় না তৃণমূল এবং বিজেপি কোনও পক্ষই। রাজ্যের সব প্রান্তে দু’তরফের নেতারা শুরু করে দিয়েছেন রামনবমী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। বৃহস্পতি এবং শুক্র দু’দিন মিলিয়েই এ বার পড়েছে নবমীর তিথি। ফলে অনেক নেতাই একাধিক ভাগে ভাগ করে নিয়েছেন নিজের কর্মসূচিকে।
এ রাজ্যে রাজনৈতিক ভাবে রামনবমীকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে একটা সময় পর্যন্ত একতরফা উপস্থিতি ছিল বিজেপি-রই। তবে গত কয়েক বছরে তৃণমূলও টক্কর দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে। আর রামনবমীকে কেন্দ্র করে কয়েক বছর আগের গোলমালের ঘটনা স্মরণে রয়েছে প্রশাসনের। ফলে পুলিশের তরফে জেলায় জেলায় আলাদা ভাবে সতর্কতার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে দু’দিনের জন্য।
বিজেপির পরিস্থিতি এমনই যে, প্রস্তুতি ঘিরে কখনও কখনও ‘দড়ি টানাটানি’ শুরু হয়ে যাচ্ছে নেতাদের মধ্যেই। বড়বাজারে পতাকা-ফেস্টুনের গুদামে তেমনই এক দফা ‘টানাটানি’ ঘটে গিয়েছে দুই ঘোষের মধ্যে।
আরও পড়ুন:
রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষ রামনবমী উদ্যাপন করেন খড়্গপুরে। ১০ বছর পরে তিনি ফের খড়্গপুর সদরে বিজেপির প্রার্থীও হয়েছেন। তাই এ বারের রামনবমীতে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করতে দিলীপ তৎপর। শুধু শোভাযাত্রা নয়। লাঠিখেলা, অস্ত্র প্রদর্শনী, লাড্ডু বিতরণ, মেলা। রামনবমী ঘিরে জমজমাট উৎসবের ছবি তৈরি করতে উদ্যোগ হয়েছেন দিলীপ। প্রস্তুতির অঙ্গ হিসাবেই বড়বাজারের এক পতাকা-ফেস্টুনের গুদামে দিলীপ নিজের আপ্ত সহায়ককে পর্যাপ্ত সংখ্যায় গেরুয়া ঝান্ডা কিনতে পাঠিয়েছিলেন। মঙ্গলবার বিকেলে সেই গুদাম তথা দোকানে পৌঁছে দিলীপের প্রতিনিধিরা দেখেন যে, খানাকুলের বিজেপি বিধায়ক সুশান্ত ঘোষও ঝান্ডা নিতে এসেছেন। কলকাতা এবং শহরতলির অন্যান্য এলাকা থেকেও বিজেপি-আরএসএসের লোকজন ওই দোকান থেকেই পতাকা-ফেস্টুন ইত্যাদি কেনেন। তাই মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যায়। মঙ্গলবার বিকেলে খড়্গপুর এবং খানাকুলের আয়োজকরা যখন প্রায় একইসঙ্গে সেখানে হাজির, তখন মজুত প্রায় শেষ পথে। অতএব দু’পক্ষই নিজেদের জন্য পর্যাপ্ত সাজসরঞ্জাম আগে জোগাড় করতে তৎপর হয়। পাছে মালপত্র ফুরিয়ে যায়। কিন্তু সে ‘টানাটানি’তে শেষ পর্যন্ত খানাকুলের সুশান্তকেই পিছু হঠতে হয়। কারণ দিলীপ তাঁরও নেতা। দিলীপের পাঠানো গাড়িতে আগে সাজসরঞ্জাম ওঠে। তার পরে সুশান্ত নেন।
তাতে হবে সুশান্তের আক্ষেপ নেই। বুধবার তিনি ফোনে সহাস্যে বললেন, ‘‘আমরা একই সঙ্গে প্রায় হাজির হয়েছিলাম। তবে অসুবিধা হয়নি। দিলীপদার জন্য মালপত্র চলে যাওয়ার পরেও যথেষ্ট ছিল। আমরাও পর্যাপ্ত সংখ্যাতেই পেয়েছি।’’ এ বছর রামনবমী তিথি দু’দিনে পড়েছে। ২৬ এবং ২৭ মার্চ। খড়্গপুরে দিলীপ রামনবমী উদযাপন করবেন ২৭ মার্চ অর্থাৎ শুক্রবার। খানাকুলে সুশান্তও শোভযাত্রা করবেন শুক্রবার।
রাজ্য বিজেপির আর এক প্রাক্তন সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের রামনবমী চলবে দু’দিন ধরেই। নিজের জেলা দক্ষিণ দিনাজপুরেই নানা প্রান্তে শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন তিনি। ২৬ মার্চ অর্থাৎ বৃহস্পতিবার শোভাযাত্রা করবেন হিলিতে। শুক্রবার বালুরঘাটে। রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও রামনবমী উদযাপন শুরু করছেন বৃহস্পতিবার থেকেই। সে দিন তিনি ভবানীপুরের শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন। পদ্মপুকুরে শুরু হয়ে হাজরা মোড় পর্যন্ত যাওয়ার কথা সে শোভাযাত্রার।
আসানসোলের দক্ষিণের বিধায়ক তথা রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি অগ্নিমিত্রা পালের রামনবমী ‘রুটিন’ সবচেয়ে লম্বা। তিনি বললেন, ‘‘আমাদের এখানে ২৬ মার্চ থেকে রামনবমী উদ্যাপন শুরু হচ্ছে। চলবে ৩০ তারিখ পর্যন্ত।’’ তার মধ্যে আসানসোল শহরে ২৮ তারিখ সবচেয়ে বড় শোভাযাত্রাটি হবে বলে অগ্নিমিত্রা জানাচ্ছেন। ওই অঞ্চলে রানিগঞ্জের মিছিলও প্রত্যেক বছর নজরকাড়া চেহারা নেয়। এ বারও তেমনই আয়োজন হচ্ছে বলে অগ্নিমিত্রার দাবি। তাঁর কথায়, ‘‘কেউ যদি আমাদের এই মিছিলকে শক্তিপ্রদর্শনের চেষ্টা হিসাবে দেখতে চান, আমাদের আপত্তি নেই। তবে আমরা অস্ত্রশস্ত্রে শক্তি প্রদর্শন করার কথা ভাবি না। আমরা জমায়েতে শক্তি দেখাই।’’
পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বড় রামনবমী শোভাযাত্রাগুলির অন্যতম দেখা যায় উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরে। সেখানে বৃহস্পতিবারই মিছিল বেরোবে। পুরুলিয়াতেও আয়োজন বড়ই হয়। তবে পুরুলিয়া সদরের বিজেপি বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘এ বছর ভোট আছে বলে ইচ্ছা করে পুলিশকে দিয়ে আমাদের শোভাযাত্রার অনুমতি আটকানোর চেষ্টা করছে তৃণমূল।’’ অনুমতি আটকে দিলেও শোভাযাত্রা আটকানো যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন সুদীপ।
কলকাতা এবং শহরতলির অধিকাংশ রামনবমী শোভাযাত্রা শুক্রবারই আয়োজিত হচ্ছে। তবে এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় শোভাযাত্রা দেখা যায় যেখানে, সেই বারাসতে মিছিল হবে বৃহস্পতিবার। ময়না থেকে ডাকবাংলো মোড় হয়ে কাছারি ময়দান পর্যন্ত যাবে মিছিল।
বুধবার ছিল চৈত্র নবরাত্রির সপ্তম দিন। দেবী কালরাত্রির প্রতি সমর্পিত দিন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেই উপলক্ষে ‘মা কালী’কে নিয়ে পোস্ট করেছেন। রামপ্রসাদী বাংলা গান ‘কালী কালী বল রসনা’ সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছেন মোদী। লিখেছেন, ‘‘মায়ের আরাধনা ভক্তদের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করে। তাঁর সাধনা প্রত্যেককে এক নতুন শক্তিতে পরিপূর্ণ করে।’’ বুধবার বিকেল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সফরে ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। সকালে তিনি দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিলেন। পরে সে ছবি সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নেন নিতিন। বাংলা পোস্টে তিনি লেখেন, ‘‘আজ চৈত্র নবরাত্রির সপ্তম দিনে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় অবস্থিত পবিত্র দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে মা ভবতারিণীর দর্শন লাভের সৌভাগ্য হল। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, আজ পশ্চিমবঙ্গে পুজোর প্যান্ডেল তৈরির জন্য উচ্চ আদালতের অনুমতি নিতে হয়, অথচ নামাজ পাঠের ক্ষেত্রে এখানকার সরকার উৎসাহ দেয়।’’ নিতিন আরও লেখেন, ‘‘মা ভবতারিণীর কাছে প্রার্থনা করি, পশ্চিমবঙ্গ যেন তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরদ্ধার করে ‘সোনার বাংলা’ এবং বিকশিত বাংলার লক্ষ্যে এগিয়ে যায়।’’
বিজেপি বা আরএসএস নেপথ্যে থেকে রামনবমীর যে কর্মসূচিগুলি করবে, তাতে অংশগ্রহণ না-করলেও ‘উৎসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত’ হয়ে থাকবে তৃণমূলও। দলীয় ভাবে না-হলেও দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি, বিধানসভা ভোটের প্রার্থীরা থাকবেন রামনবমীতে। বালির তৃণমূল প্রার্থী কৈলাস মিশ্র বুধবার বিকালেই রামনবমীর অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সন্ধ্যায় যান বাসন্তী পুজোতেও। পশ্চিম বর্ধমানের প্রায় সব নেতাই বৃহস্পতি এবং শুক্রবার রামনবমীতে অংশ নেবেন। হুগলির চাঁপদানির তৃণমূল বিধায়ক তথা শ্রীরামপুর-সাংগঠনিক জেলার সভাপতি অরিন্দম গুঁইন রামনবমীতে অংশ নেবেন শুক্রবার। উত্তর দিনাজপুরের ডালখোলা, উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল-সহ সর্বত্রই রামনবমীতে ব্যক্তি পরিচয়ে যোগ দেবেন তৃণমূলের নেতার।
রামনবমীতে শুধু কলকাতাতেই ছোট বড় ৬০ টি মতো মিছিল বেরোতে পারে। এরমধ্যে ৬ থেকে ৭টি বড় মিছিল। সতর্ক রয়েছে কলকাতা পুলিশ। কলকাতা পুলিশের নগরপাল অজয় নন্দ শহরে রামনবমীর পুলিশি প্রস্তুতি তদারকি করেন বুধবার। বড় মিছিলে ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিসি) পদমর্যাদার অফিসার নজরদারিতে থাকবেন। এ ছাড়াও কয়েক হাজার পুলিশকর্মী থাকবেন সার্বিক নিরাপত্তায়। পদস্থ পুলিশ অফিসারা বিভিন্ন দায়িত্বে থাকবেন। ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতি এবং শুক্রবার পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ থাকবে। অন্যান্য গাড়ির ক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুযায়ী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। একই রকম প্রস্তুতি রয়েছে রাজ্যের সব জেলাতেই।