Advertisement

নবান্ন অভিযান

সোমবার সকাল ৮টায় গণনা শুরু, বেলা ১২টার মধ্যেই স্পষ্ট হবে পশ্চিমবঙ্গের শাসনভার কার হাতে তুলে দিলেন রাজ‍্যবাসী

দুই দফায় দেওয়া মানুষের রায় এখন স্ট্রংরুমে বন্দি। আগামী সোমবার সেই ভোট গোনার কাজ হবে। ভোট গোনার জন্য আলাদা ভাবে গণনাকক্ষ তৈরি করা হবে। নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয়েছে স্ট্রংরুম।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ২০:০১
Counting of assembly election votes will begin at 8 am on Monday

কী ভাবে গোনা হয় ভোট? —ফাইল চিত্র।

পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের রায় যন্ত্রবন্দি হয়ে গিয়েছে। অপেক্ষা শুধু সেই রায় ঘোষণার। কার ভাগ্যে কত ভোট জুটল, কোন দল জিতছে, কারা বসতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের মসনদে— তা সবই স্পষ্ট হবে ভোটগণনার পরেই। তবে গণনা সমাপ্ত হওয়ার আগেই একটা ইঙ্গিত তৈরি হয়ে যায়। আগামী ৪ মে, সোমবার যন্ত্রবন্দি মানুষের রায় গোনার কাজ শুরু হবে সকাল ৮টা থেকে। কখনও-সখনও কোনও কেন্দ্রের গণনা শেষ হতে রাতও পেরিয়ে যায়।

গণনার শুরুতেই পোস্টাল ব্যালট গোনা হয়। তার পরে শুরু হয় ইভিএমের ভোটগণনা। গণনা শুরুর চার ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ, দুপুর ১২টার মধ্যেই ভোটের ফলের প্রাথমিক ধারণা আসতে শুরু করে। অর্থাৎ ওই সময়ের মধ্যেই কয়েক রাউন্ডের গণনা শেষ হয়। ফলে কারা জিতছেন, কারা হারছেন— তার ইঙ্গিত মোটের উপর স্পষ্ট হতে শুরু করে। তবে ব্যতিক্রমও থাকে। কোনও কোনও কেন্দ্রের লড়াই চলে হাড্ডাহাড্ডি। সাধারণত দুই প্রার্থীর মধ্যে এই লড়াই চলে। কখনও এক জন এগিয়ে থাকেন, পরের রাউন্ডেই এগিয়ে যান অন্য জন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে লড়াইয়ে থাকে দুইয়ের বেশি প্রার্থীও।

পশ্চিমবঙ্গে দু’দফায় ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম দফার ভোটগ্রহণ হয়েছে ২৩ এপ্রিল। ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফা। দু’দফায় দেওয়া মানুষের রায় এখন স্ট্রংরুমে বন্দি। আগামী সোমবার সেই ভোট গোনার কাজ হবে। ভোটারেরা নিজেদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন ইভিএমে। ইভিএমের দু’টি অংশ। এক, ব্যালট ইউনিট। দুই, কন্ট্রোল ইউনিট। সব বুথেই ইভিএম মেশিনের পাশে ছিল একটি ভিভিপ্যাট মেশিন। ভোটারেরা ইভিএমে বোতাম টিপে নিজের মত জানান। তবে তিনি যেখানে ভোট দিলেন, সেই প্রার্থীর নামেই ভোটটি সংরক্ষিত হল কি না, তা ভোটারেরা দেখতে পান ভিভিপ্যাট মেশিনে।

ভোটদানের পর ইভিএম মেশনগুলিকে বুথে উপস্থিত সকল বুথ এজেন্টের সামনে ‘সিল’ করে দেওয়া হয়। তার পরে সেগুলিকে নিয়ে যাওয়া হয় স্ট্রংরুমে। গণনার দিনের আগে পর্যন্ত স্ট্রংরুমে কড়া পাহারার মধ্যে থাকে ইভিএম মেশিনগুলি। গণনার দিন নির্বাচন কমিশনের আধিকারিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ওই ‘সিল’ খোলা হয়। ইভিএম মেশিনে সংরক্ষিত ভোটগুলিকে গোনার কাজ করেন আধিকারিকেরা।

আঁটোসাঁটো স্ট্রংরুমের নিরাপত্তা

স্ট্রংরুমে ইভিএমগুলি থাকে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে। ২৪ ঘণ্টাই স্ট্রংরুমগুলির পাহারায় থাকে কেন্দ্রীয় বাহিনী। আগে স্ট্রংরুমগুলির নিরাপত্তায় ২০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। ওই সংখ্যা আর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতিটি স্ট্রংরুম পাহারা দেওয়ার জন্য ন্যূনতম ২৪ জন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে।

স্ট্রংরুমগুলিতে সর্ব ক্ষণ সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চালানো হয়। কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশ, স্ট্রংরুমের বাইরের এলাকায় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকতে পারবেন। স্ট্রংরুমে থাকবে একটি মাত্র প্রবেশপথ। ওই ঘরের দরজায় রয়েছে ‘ডবল লক সিস্টেম’। কে, কখন স্ট্রং রুমে ঢুকছেন, কখন বার হচ্ছেন, সবটাই লিখে রাখতে হচ্ছে লগবুকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক সেই কাজ করছেন অহরহ।

গণনাকক্ষ

স্ট্রংরুমের পাশাপাশি ভোট গোনার জন্য আলাদা ভাবে গণনাকক্ষ তৈরি করা হবে। সেটিও সুরক্ষিত থাকবে। প্রতিটি কক্ষের জন্য আলাদা প্রবেশ ও বাহির পথ থাকবে, সেটাই নিয়ম। গণনাকক্ষ যদি বড় হয়, তবে সেটিকে নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে ভাগ করে দেওয়া হয়। কোনও ভাবেই এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে সরাসরি যাওয়া যাবে না। ইভিএম আনা-নেওয়ার জন্য আলাদা নিরাপদ পথ রাখতে হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।

কারা থাকতে পারবেন গণনাকক্ষে?

গণনাকক্ষে সকলের প্রবেশের অনুমতি নেই। গণনাকক্ষের মধ্যে থাকতে পারবেন রিটার্নিং অফিসার, সহকারি রিটার্নিং অফিসার, কাউন্টিং স্টাফ, টেকনিক্যাল স্টাফ, কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার, কমিশনের অনুমোদিত ব্যক্তি ও অবজ়ার্ভার, দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, প্রার্থী বা তাঁদের এজেন্ট।

গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তা

গণনাকেন্দ্রে থাকছে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গণনাকেন্দ্রের বাইরে ১০০ মিটার এলাকায় কোনও যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না। সেখানকার নিরাপত্তায় থাকছে রাজ্যের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। গণনাকেন্দ্রে প্রবেশ এবং গণনাকক্ষের মধ্যেকার অংশ থাকবে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর দখলে। তল্লাশির পরেই ভিতরে যাওয়ার অনুমতি মিলবে। মোবাইল, অস্ত্র ইত্যাদি জমা রাখতে হবে। গণনাকক্ষের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনী।

বৈধ আইডি কার্ড

গণনাকেন্দ্রে যাঁদের প্রবেশের অনুমতি রয়েছে, তাঁদের জন্য আলাদা পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) থাকে। এ বার সেই পরিচয়পত্রের সঙ্গে থাকবে কিউআর কোড। ওই কোড স্ক্যান করেই যাচাই করা হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেওয়া অনুমতিপত্র। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র করতে গণনাকেন্দ্রে ঢোকার মুখে এক বার আইডি কার্ড পরীক্ষা করা হবে। গণনাকক্ষে যাওয়ার পথে আবার এক বার আইডি কার্ড যাচাই করবেন নিরাপত্তাকর্মীরা। শেষ বার গণনাকক্ষে ঢোকার মুখে পরীক্ষা হবে। সেখানেই আইডি কার্ডে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করতে হবে। ইভিএম বা ব্যালটের ছবি তোলা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। রিটার্নিং অফিসার, পর্যবেক্ষক ছাড়া গণনাকক্ষে কারও মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি নেই। পুরো গণনাপ্রক্রিয়ার ভিডিয়োগ্রাফি বাধ্যতামূলক। ভিডিয়োগ্রাফি করা হবে স্ট্রংরুম খোলা, ইভিএম আনা, ভোট গণনা এবং ফল ঘোষণার। এই সব ভিডিয়ো নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে— স্পষ্ট নির্দেশ কমিশনের।

ইভিএম আনার নিয়ম

স্ট্রংরুম থেকে ইভিএম আনা হয় গণনাকক্ষে। তার পরে সিল এবং ট্যাগ ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। গণনা-টেবিলে প্রার্থী বা তাঁর এজেন্টদের সামনে তা খোলা হয়। সাধারণত একটি গণনাকেন্দ্রে ১৪টি টেবিল থাকে। প্রত্যেক বার ১৪টি টেবিলে গণনা সম্পন্ন হলে এক রাউন্ড হয়।

গণনার পদ্ধতি

ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিটে একটি ‘রেজাল্ট’ বোতাম থাকে। সেই বোতাম টিপলেই জানা যায় ভোটসংখ্যা। মোট কত ভোট পড়েছে, কোন প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন, তা নির্দিষ্ট ফর্মে লেখা হয়। তার পরে প্রতিটি রাউন্ডের ফল ঘোষণা করা হয়। গণনা শেষে নির্দিষ্ট বুথের ভিভিপ্যাট স্লিপ গোনা হয়। মিলিয়ে দেখা হয় কন্ট্রোল ইউনিটের সঙ্গে।

গণনার হিসাব রাখার জন্য মূলত দু’টি ফর্ম ব্যবহার করা হয়। ফর্ম ১৭সি এবং ফর্ম ২০। ফর্ম ১৭সি-র প্রথম অংশ পূরণ করেন প্রিসাইডিং অফিসার। সেই অংশে থাকে— মোট কত জন ভোট দিয়েছেন, কত ভোট ইভিএমে রেকর্ড হয়েছে— গণনার সময় এটি ব্যবহার হয়। দ্বিতীয় অংশ পূরণ করেন গণনা পর্যবেক্ষক। এই অংশে থাকে নোটায় কত ভোট পড়েছে, প্রতিটি প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন। দ্বিতীয় অংশের ফলাফল প্রথম অংশের মোট ভোটের সঙ্গে মিলতেই হবে। যদি দুই হিসাব না মেলে তবে গণনায় বা অন্য কোনও গরমিল হয়েছে বলে ধরা হয়।

ফর্ম ২০ হল ভোট গণনার চূড়ান্ত ফলাফলের ‘শিট’। এখানে পুরো কেন্দ্রে প্রতিটি প্রার্থী মোট কত ভোট পেয়েছেন— সব একসঙ্গে লেখা থাকে। এখান থেকে জানা যায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্র অনুযায়ী ভোটের হিসাব, প্রতিটি প্রার্থীর মোট ভোট, নোটা ভোট এবং মোট ভোটের সংখ্যা। প্রতিটি গণনা টেবিল থেকে ফর্ম ১৭সি-র দ্বিতীয় অংশ নেওয়া হয়। সেখানকার তথ্য যোগ করে বানানো হয় ফর্ম ২০। প্রতিটি বুথের ফল লেখা হয় ফর্ম ২০-তে। সেই ফল ঘোষণা করা হয়। কাউন্টিং এজেন্ট বা প্রার্থী সেটা লিখে রাখতে পারেন।

বুথফেরত সমীক্ষা

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের বুথফেরত সমীক্ষার অধিকাংশেই এগিয়ে বিজেপি। কোনও কোনও সমীক্ষায় আবার তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে। তবে সর্বত্রই বিজেপি এবং তৃণমূলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় ‘চাণক্য টুডে’ তাদের বুথ ফেরত সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। সেই সমীক্ষার ইঙ্গিত, এ বারে ভোটে বড় ব্যবধানে জয় পেতে পারে বিজেপি। ‘চাণক্য টুডে’র অনুমান, পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভার মধ্যে কমবেশি ১৯২টি আসন পেতে চলেছে বিজেপি। আর তৃণমূলের ঝুলিতে যেতে পারে ১০০টি আসন। ২টি আসন পেতে পারে অন্যান্যরা। ভারতের নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের বুথফেরত বা প্রাক নির্বাচনী জনমত সমীক্ষা মেলে না। তবে মিলে যাওয়ার কিছু উদাহরণও রয়েছে।

সংক্ষেপে
  • রবিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছিল। রাজ্যের বেশ কয়েক জন আমলা এবং পুলিশ আধিকারিককে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করে নির্বাচন কমিশন। বুধবার রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। সেই সব পদে নতুন আধিকারিকও নিয়োগ করে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, কমিশন স্পষ্ট জানায়, যাঁদের অপসারণ করা হচ্ছে, তাঁদের এ রাজ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও কাজে আপাতত আর নিয়োগ করা যাবে না!
  • পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ক্ষেত্রে কমিশনের এই ‘সক্রিয়তা’ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে শাসকদল তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ভাবে অপসারণের পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিও লেখেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আগাম কোনও আলোচনা না-করে বা কোনও মতামত না-নিয়ে বদলি করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অতীতে নির্বাচন চলাকালীন কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আধিকারিককে সরানোর প্রয়োজন হলে কমিশনের পক্ষ থেকে সাধারণত রাজ্য সরকারের কাছে তিন জনের একটি প্যানেল চাওয়া হত। সেই তালিকা থেকে কমিশন নিজেই এক জনকে বেছে নিত। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এ বার সেই প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ঘটেছে। প্রার্থিতালিকা ঘোষণার আগেও কমিশনকে এ বিষয়ে তোপ দাগেন মমতা। নিশানা করেন কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেও।
সর্বশেষ
১ মিনিট আগে
vote counting Poll Counting Counting Centre EVM
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy