Advertisement

নবান্ন অভিযান

প্রথম দফায় দুই ফুলের টক্করের জমিতে ভোট, বিধানসভার হিসাব বদলেছে লোকসভায়, ১৫২ আসনে বহুমুখী সমীকরণ

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ‘ধাক্কা’ খাওয়ার পরে ২০২১ সালের বিধানসভায় বেশ কিছুটা সামাল দিয়েছিল তৃণমূল। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে সেই ক্ষতে আরও কিছু প্রলেপ দিতে সমর্থ হয়েছিল রাজ্যের শাসকদল। কিন্তু নতুন করে ক্ষতও তৈরি হয়েছে তৃণমূলের। সে সব জায়গায় সাফল্য পেয়েছে বিজেপি।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ ২০:৩০
Elections will be held in the first phase of West Bengal 152 constituencies on Thursday dgtl

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

জেলা ১৬টি। আসন ১৫২টি। বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় ভোটগ্রহণ। সমগ্র উত্তরবঙ্গ এবং গোটা জঙ্গলমহলের পাশাপাশি ভোট হবে মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমান এবং পূর্ব মেদিনীপুর জেলায়। রাজ্যের অর্ধেকের বেশি আসনে এই ভোটে মূল যুযুধান দু’পক্ষ তৃণমূল এবং বিজেপি উভয়েই চাইবে যথাসম্ভব ‘দাপট’ দেখিয়ে রাখতে। টি২০ ক্রিকেটের পরিভাষায় ‘পাওয়ার প্লে’-তে যথাসম্ভব রান তুলে রাখতে।

গত পাঁচ বছরে দু’টি বড় ভোটের (২০২১ সালের বিধানসভা এবং ২০২৪ সালের লোকসভা) পরিসংখ্যান বলছে, এই ১৫২টি আসনে সেয়ানে-সেয়ানে লড়াইয়ে ছিল তৃণমূল-বিজেপি। গত বিধানসভায় যে ফল হয়েছিল, লোকসভায় তার অনেক কিছু বদলে গিয়েছিল। এই বিধানসভা নির্বাচনের আগে ১৫২টি আসনে কেবল বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াই নয়, বরং বহুমুখী সমীকরণ তৈরি হয়েছে। গত বিধানসভা ভোটের তিন বছরের মাথায় হয়েছিল লোকসভা ভোট। সেই নির্বাচনে বেশ কিছু হিসাবে বদল হয়েছিল। লোকসভা নির্বাচনের দু’বছরের মাথায় হতে চলেছে বিধানসভা ভোট। সেখানেও হিসাব বদলের বিভিন্ন উপকরণ মজুত।

প্রথম দফার ভোটের ১৫২টি আসনের মধ্যে ২০২১ সালে তৃণমূল জিতেছিল ৯২টিতে। বিজেপির দখলে ছিল ৫৯টি আসন। পাহাড়ের একটি আসন পেয়েছিল নির্দল। কিন্তু লোকসভা ভোটের বিধানসভা ভিত্তিক ফলাফলে বিস্তর বদল ঘটে গিয়েছে। ৯২ থেকে কমে তৃণমূলের এগিয়ে থাকা বিধানসভার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭টিতে। বিজেপি-ও ৫৯ থেকে সামান্য কমেছে। তারা এগিয়েছিল ৫৩টি আসনে। ২০২১ সালে যে বাম-কংগ্রেস ছিল শূন্য, তারা আবার গত লোকসভা ভোটে ১২টি বিধানসভায় এগিয়ে ছিল। এর মধ্যে কংগ্রেস ১১টি এবং বামেরা একটিতে। ঘটনাচক্রে, বাম-কংগ্রেসের এগিয়ে থাকা বিধানসভাগুলি তিনটি জেলায় সীমাবদ্ধ— মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুর। এই তিন জেলাতেই গত বিধানসভা ভোটে সর্বোচ্চ সাফল্য পেয়েছিল তৃণমূল। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল তৈরি করার পরে এই তিন জেলায় এমন সাফল্য কখনও পায়নি জোড়াফুল শিবির। প্রসঙ্গত, এই তিন জেলার ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘু ভোট সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ‘ধাক্কা’ খাওয়ার পরে ২০২১ সালের বিধানসভায় তা কিছুটা সামাল দিয়েছিল তৃণমূল। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে সেই ক্ষতে আরও কিছুটা প্রলেপ দিতে সমর্থ হয়েছিল রাজ্যের শাসকদল। উত্তরবঙ্গ এবং জঙ্গলমহল মিলিয়ে মোট চারটি লোকসভা আসন বিজেপির থেকে ছিনিয়ে নেয় তৃণমূল। আবার বিজেপি-ও পাল্টা ধাক্কা দিয়েছিল নির্দিষ্ট কিছু জেলায়। যেমন শুভেন্দু অধিকারীর জেলা পূর্ব মেদিনীপুরে ২০২১ সালের ভোটে ১৬টি আসনের মধ্যে ৯টিতে জিতেছিল তৃণমূল। কিন্তু গত লোকসভায় মাত্র একটি বিধানসভায় এগিয়ে ছিল তারা। বিজেপি এগিয়েছিল বাকি ১৫টিতে।

এ বার নানা সমীকরণ তৈরি হয়েছে ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে। যেখানে বৃহস্পতিবার ভোট।

সংখ্যালঘু ভোট

মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরে মোট ৪৩টি আসন রয়েছে। প্রায় সব আসনেই সংখ্যালঘু ভোট গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এই তিন জেলাতেই সংখ্যালঘু ভোট ভাগের বিভিন্ন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। তৃণমূল থেকে বেরিয়ে হুমায়ুন কবীর নিজের দল গড়ে প্রার্থী দিয়েছেন। যদিও হুমায়ুন যে ভাবে শুরু করেছিলেন, ভোট যত এগিয়েছে তত তাঁর দলের ছন্নছাড়া অবস্থা প্রকট হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় হুমায়ুনের দলের প্রার্থীরাই তৃণমূলে যোগ দিচ্ছেন। গোপন ক্যামেরা অভিযানে হুমায়ুনের সঙ্গে বিজেপি-যোগের ফুটেজ প্রকাশ্যে এসেছে। ঘটনা পরম্পরা বলছে, ওই গোপন ক্যামেরা অভিযান প্রকাশ্যে আসার পর থেকে গত ১৫ দিনে হুমায়ুনের দলের করুণ দশা বেআব্রু হয়ে গিয়েছে। যা তৃণমূলের জন্য খানিকটা স্বস্তির বলেই অভিমত অনেকের। তবে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই তিন জেলাতেই বাম, কংগ্রেস, আইএসএফ ময়দানে রয়েছে। অন্তত ১৭টি আসনে বাম-কংগ্রেসের প্রচার এবং জমায়েত সাড়া ফেলেছে। ভোটবাক্সে তার কতটা প্রতিফলন হবে বা আদৌ হবে কিনা, তা বোঝা যাবে ফলপ্রকাশের পরে। তবে কোচবিহার এবং জলপাইগুড়ির যে আসনগুলিতে সংখ্যালঘু ভোট উল্লেখযোগ্য, সেখানে তৃণমূলের সমান্তরাল কোনও শক্তি মাথা তুলতে পারেনি।

হিন্দু ভোটের মেরুকরণ

মালদহ, মুর্শিদাবাদ, দুই মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমান এবং কোচবিহারে মেরুকরণের আবহ তীব্র থাকায় সেখানে হিন্দু ভোট ঐক্যবদ্ধ। প্রত্যাশিত ভাবে তা বিজেপির দিকেই গিয়েছে গত কয়েকটি ভোটে। এ বারও তার অন্যথা হওয়ার মতো কোনও পরিস্থিতি অন্তত প্রচারপর্বে দেখা যায়নি। বরং মালদহ, মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন অংশে নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে সেই মেরুকরণের আবহ আরও তীব্র হয়েছে। এক দিকে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হওয়ার নানা সমীকরণ এবং অন্য দিকে হিন্দু ভোটের ‘ঐক্য’ তৃণমূলের জন্য খুব শুভ সঙ্কেত নয় বলেই অনেকে মনে করছেন। যদিও অতীতে দেখা গিয়েছে, উল্টো দিকে বিজেপির উপস্থিতির কারণে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

রাজবংশী ভোট

২০১৯ সালের লোকসভা এবং ২০২১ সালে যে পরিমাণ রাজবংশী ভোট জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহারে বিজেপির পক্ষে ছিল, তাতে কিছুটা ক্ষয় হয়েছিল গত লোকসভা নির্বাচনে। বিজেপির সমর্থনে রাজ্যসভায় যাওয়া অনন্ত মহারাজের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতার নৈকট্য নিয়েও বিস্তর জল্পনা রয়েছে। রাজবংশী ভোট ভাঙার জন্যও তৃণমূল কৌশলের ত্রুটি রাখেনি। আবার বিজেপি-ও ক্ষয় মেরামত করতে নানা সাংগঠনিক পদক্ষেপ করেছে।

তফসিলি ও আদিবাসী ভোট

বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুরের পাশাপাশি আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়িতেও উল্লেখযোগ্য ভাবে তফসিলি এবং আদিবাসী ভোট রয়েছে। সেই ভোটে বিজেপির যে আধিপত্য তৈরি হয়েছিল ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে, গত বিধানসভা এবং গত লোকসভা নির্বাচনে তার অনেকটাই ভাঙতে পেরেছিল তৃণমূল। যদিও গত কয়েক মাসে তফসিলি ও আদিবাসী ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে বিজেপি প্রচারে খামতি রাখেনি। বিশেষত, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে ‘অপমান’ বিতর্ককে ‘হাতিয়ার’ করে পশ্চিমাঞ্চলেই তৃণমূল তথা রাজ্য সরকার-বিরোধী প্রচারকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে পদ্মশিবির।

হিসাবের বাইরে এসআইআর

এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রথম দফায় ভোটমুখী ১৬টি জেলায় সাড়ে ৪০ লক্ষের বেশি নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরেই শুধু বাদ পড়েছে প্রায় ১৬ লক্ষ নাম। কার্যত সব পক্ষের কাছেই নতুন ভোটার তালিকা। ফলে অতীতের হিসাব যে সব ক্ষেত্রে একই থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বাদের সংখ্যা তুলে ধরে বিজেপি, তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিএম তাদের মতো করে রাজনৈতিক আখ্যান তুলে ধরেছে প্রচারে। কেউ বলেছে, বেনোজল বার করে দেওয়া হয়েছে। ‘ভূতহীন’ ভোটার তালিকার ভিত্তিতে ভোট হবে। আবার কেউ বলেছে, রাষ্ট্রীয় লুটের পরে ভোট হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। যে ভোটের বাইরে রয়েছেন লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিক। বিজেপি-বিরোধীরা এই ভাষ্যও তুলে ধরছেন যে, ‘এ বার ভোট তাঁদের জন্য, যাঁদের এ বার ভোট নেই!’ তবে এ সবই রাজনৈতিক ধারণা নির্মাণের জন্য। নাম বাদ পড়া ভোটের ফলাফলে কী প্রভাব তৈরি করবে, সেটাই সব চেয়ে বড় প্রশ্ন। সেই প্রশ্নেরই জবাব দিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বুথের লাইনে দাঁড়াবেন ১৫২ আসনের ভোটারেরা।

সংক্ষেপে
  • রবিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছিল। রাজ্যের বেশ কয়েক জন আমলা এবং পুলিশ আধিকারিককে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করে নির্বাচন কমিশন। বুধবার রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। সেই সব পদে নতুন আধিকারিকও নিয়োগ করে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, কমিশন স্পষ্ট জানায়, যাঁদের অপসারণ করা হচ্ছে, তাঁদের এ রাজ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও কাজে আপাতত আর নিয়োগ করা যাবে না!
  • পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ক্ষেত্রে কমিশনের এই ‘সক্রিয়তা’ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে শাসকদল তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ভাবে অপসারণের পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিও লেখেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আগাম কোনও আলোচনা না-করে বা কোনও মতামত না-নিয়ে বদলি করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অতীতে নির্বাচন চলাকালীন কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আধিকারিককে সরানোর প্রয়োজন হলে কমিশনের পক্ষ থেকে সাধারণত রাজ্য সরকারের কাছে তিন জনের একটি প্যানেল চাওয়া হত। সেই তালিকা থেকে কমিশন নিজেই এক জনকে বেছে নিত। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এ বার সেই প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ঘটেছে। প্রার্থিতালিকা ঘোষণার আগেও কমিশনকে এ বিষয়ে তোপ দাগেন মমতা। নিশানা করেন কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেও।
West Bengal Politics TMC BJP First Phase Vote Election Campaigns election campaign strategy
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy