Advertisement

নবান্ন অভিযান

১৬৩ ধারা জারি নেতাজি ইন্ডোর, সাখাওয়াত স্কুল-সহ কলকাতার সব গণনাকেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে! রাজ্য জুড়ে কী কী ব্যবস্থা?

স্ট্রংরুমের পাশাপাশি গণনাকক্ষের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা করেছে নির্বাচন কমিশন। মূলত কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকবে গণনাকেন্দ্রগুলি। সঙ্গে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকছে রাজ্য পুলিশও।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০১ মে ২০২৬ ২২:৩১
Kolkata Police has imposed Section 163 within 200 meters of all counting centres in Kolkata, how is the security in other places in the state

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

কলকাতায় ভোটগণনা হবে সাত জায়গায়। সেই সাতটি গণনাকেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে ১৬৩ ধারা জারির কথা জানাল কলকাতা পুলিশ। গণনার দিন অর্থাৎ সোমবার সকাল ৫টা থেকে এই নির্দেশ কার্যকর হবে। ওই সাত জায়গার আশপাশের ২০০ মিটারের মধ্যে কোনও বেআইনি জমায়েত করা যাবে না বলে জানাল পুলিশ। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই ২০০ মিটারের মধ্যে পাঁচ জন বা তার বেশি মানুষের সমাগমকেই বেআইনি জমায়েত হিসাবে দেখা হবে। নির্দেশ অমান্য করলে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ করবে পুলিশ। শুধু কলকাতা নয়, রাজ্যের সব প্রান্তের গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তা আঁটোসাঁটো করা হচ্ছে। কমিশন সূত্রে খবর, প্রয়োজন মতো রাজ্যের অন্যান্য গণনাকেন্দ্রের আশপাশে ১৬৩ ধারা জারি করা হতে পারে।

স্ট্রংরুমের পাশাপাশি গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা করেছে নির্বাচন কমিশন। মূলত কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকবে গণনাকেন্দ্রগুলি। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকছে রাজ্য পুলিশও। সোমবার গণনা হলেও এখন থেকেই গণনাকেন্দ্রগুলিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও এখনই দ্বিস্তরীয় নিরাপত্তা রয়েছে। গণনার দিন কেন্দ্রগুলিতে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য ২০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োগ করেছে কমিশন। প্রয়োজনে সেই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতিটি স্ট্রংরুম পাহারা দেওয়ার জন্য ন্যূনতম ২৪ জন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে।

ভোটে মানুষের রায় এখন যন্ত্রবন্দি হয়ে স্ট্রংরুমে গচ্ছিত। সোমবার সেই স্ট্রংরুম থেকে ইভিএম, ভিভিপ্যাট নিয়ে আসা হবে গণনাকেন্দ্রে। তার পরেই ওই ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিটের সিল এবং ট্যাগ ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। তার পরে প্রার্থী বা তাঁর এজেন্টদের সামনে গণনা-টেবিলে তা খোলা হবে। সাধারণত একটি গণনাকেন্দ্রে ১৪টি টেবিল থাকে। প্রত্যেক বার ১৪টি টেবিলে গণনা সম্পন্ন হলে এক রাউন্ড হয়। গণনা চলে কয়েক রাউন্ড ধরে।

গণনার সময় যাতে কোনও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সে দিকে ক়ড়া নজরদারি চালাবে কমিশন। বাঁকুড়া জেলার ১২টি বিধানসভা কেন্দ্রের ইভিএম রাখা হয়েছে জেলার তিনটি স্ট্রংরুমে। সেই সব জায়গাতেই হবে গণনা। হুগলি জেলার ১৮টি কেন্দ্রের ভোটগণনা হবে চারটি মহকুমায়। এমনই রাজ্যের প্রতিটি জেলায় মোট ৭৭টি কেন্দ্রে ভোটগণনা হবে সোমবার। তার মধ্যে কলকাতার সাতটি জায়গায় গণনাকেন্দ্র তৈরি করেছে কমিশন। সেগুলি হল নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম, হেস্টিংস হাউস কমপ্লেক্স, যাদবপুরের এপিসি রায় পলিটেকনিক কলেজ, ডায়মন্ড হারবার রোডের সেন্ট টমাস বয়েজ় স্কুল, সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল এবং বাবা সাহেব অম্বেডকর এডুকেশন ইউনিভার্সিটি।

প্রত্যেক গণনাকেন্দ্রই ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকা থাকবে। গণনাকেন্দ্রের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও ঘটনা যাতে না-ঘটে, তার জন্য ১৬৩ ধারা জারি করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ। নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘আইনসম্মত ভাবে নিযুক্ত কোনও ব্যক্তিকে বাধা, কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর মতো পরিস্থিতি এড়াতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যে কোনও হামলা প্রতিরোধ করতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারার অধীন নির্দেশিকা জারি করা প্রয়োজন রয়েছে। গণনাকেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে পাঁচ জন বা তার বেশি মিলে জমায়েত করতে পারবেন না। কোনও মিছিল, সমাবেশ, জনসভা করা যাবে না, বিক্ষোভ প্রদর্শন করা যাবে না। আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র, লাঠি বা অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে এমন কোনও জিনিস, বিস্ফোরক বা আতশবাজি, দাহ্য পদার্থ, ইট-পাথর ওই সমস্ত এলাকায় নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।’

শুধু কলকাতায় নয়, সব জেলার গণনাকেন্দ্রেই কমবেশি একই নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। গণনাকেন্দ্রে থাকছে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গণনাকেন্দ্রের বাইরে ১০০ মিটার এলাকায় কোনও যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না। সেখানকার নিরাপত্তায় থাকছে রাজ্যের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। গণনাকেন্দ্রে প্রবেশ এবং গণনাকক্ষের মধ্যেকার অংশ থাকবে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর দখলে। তল্লাশির পরেই ভিতরে যাওয়ার অনুমতি মিলবে। মোবাইল, অস্ত্র ইত্যাদি জমা রাখতে হবে। গণনাকক্ষের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনী।

সোমবার গণনা শুরু হবে সকাল ৮টা থেকে। তার আগে স্ট্রংরুম থেকে ইভিএমগুলি নিয়ে যাওয়া হবে সংশ্লিষ্ট গণনাকক্ষে। গণনার সময় ওই কক্ষে শুধু থাকতে পারবেন রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, কাউন্টিং স্টাফ, টেকনিক্যাল স্টাফ, কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার, কমিশনের অনুমোদিত ব্যক্তি ও অবজ়ার্ভার, দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, প্রার্থী বা তাঁদের এজেন্ট।

গণনাকেন্দ্র পরিদর্শনে সিইও

শুক্রবার জঙ্গলমহলের তিন জেলার মোট পাঁচটি গণনাকেন্দ্র পরিদর্শন করেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ অগ্রবাল। প্রথমে পুরুলিয়া জেলার দু’টি, তার পরে ঝাড়গ্রাম জেলার একটি এবং বাঁকুড়া জেলার দু’টি গণনাকেন্দ্রের পরিকাঠামো-সহ সমস্ত ব্যবস্থা সরেজমিনে খতিয়ে দেখেন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক। স্ট্রংরুমের নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তরে সিইও বলেন, ‘‘ওখানে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা রয়েছে। শুধু অভিযোগ করলেই হয় না। লিখিত অভিযোগ এখনও পর্যন্ত কেউ করেননি।’’ তিনি আরও জানান, ভোটগণনার দিন এবং নির্বাচনের পরে হিংসা রুখতে এ রাজ্যে যথেষ্ট সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকবে।

ফলাফলের আভাস মিলবে কখন

সোমবার যন্ত্রবন্দি মানুষের রায় গোনার কাজ শুরু হবে সকাল ৮টা থেকে। কখনও-সখনও কোনও কেন্দ্রের গণনা শেষ হতে রাতও পেরিয়ে যায়। গণনার শুরুতেই পোস্টাল ব্যালট গোনা হয়। তার পরে হয় ইভিএমের ভোটগণনা। গণনা শুরুর চার ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ, দুপুর ১২টার মধ্যেই ভোটের ফলের প্রাথমিক ধারণা আসতে শুরু করে। অর্থাৎ ওই সময়ের মধ্যেই কয়েক রাউন্ডের গণনা শেষ হয়। ফলে কারা জিতছেন, কারা হারছেন— তার ইঙ্গিত মোটের উপর স্পষ্ট হতে শুরু করে। তবে ব্যতিক্রমও থাকে।

ইভিএমের সাতকাহন

ভোটারেরা নিজেদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন ইভিএমে। এই ইভিএমের দু’টি অংশ। এক, ব্যালট ইউনিট আর দুই, কন্ট্রোল ইউনিট। সব বুথেই ইভিএম মেশিনের পাশে ছিল একটি ভিভিপ্যাট মেশিন। ভোটারেরা ইভিএমে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর পাশে থাকা বোতাম টিপে ভোট দেন। তবে তিনি যেখানে ভোট দিলেন, সেই প্রার্থীর নামেই ভোটটি সংরক্ষিত হল কি না, তা ভোটারেরা দেখতে পান ভিভিপ্যাট মেশিনে। ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিটে একটি ‘রেজ়াল্ট’ বোতাম থাকে। সেই বোতাম টিপলেই জানা যায় ভোটসংখ্যা। মোট কত ভোট পড়েছে, কোন প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন, তা নির্দিষ্ট ফর্মে লেখা হয়। তার পরে প্রতিটি রাউন্ডের ফল ঘোষণা করা হয়। গণনা শেষে নির্দিষ্ট বুথের ভিভিপ্যাট স্লিপ গোনা হয়। মিলিয়ে দেখা হয় কন্ট্রোল ইউনিটের সঙ্গে। গণনার হিসাব রাখার জন্য মূলত দু’টি ফর্ম ব্যবহার করা হয়। ফর্ম ১৭সি এবং ফর্ম ২০।

গণনাকেন্দ্রের মধ্যেই সাধারণ স্ট্রংরুম এবং গণনাকক্ষ থাকে। ভোটগ্রহণের পর ইভিএম, ভিভিপ্যাট সব স্ট্রংরুমে সংরক্ষিত করে রাখা হয়। সোমবার স্ট্রংরুমগুলি থেকে ইভিএম নিয়ে যাওয়া হয় গণনাকক্ষে। প্রতিটি কক্ষের জন্য আলাদা প্রবেশ ও বাহির পথ থাকবে, সেটাই নিয়ম। গণনাকক্ষ যদি বড় হয়, তবে সেটিকে নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে ভাগ করে দেওয়া হয়। কোনও ভাবেই এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে সরাসরি যাওয়া যাবে না। ইভিএম আনা-নেওয়ার জন্য আলাদা নিরাপদ পথ রাখতে হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।

কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, বৈধ আইডি কার্ড ছাড়া গণনাকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না কেউই। ওই আইডি কার্ডে এ বার বিশেষ ব্যবস্থা করেছে কমিশন। প্রতিটি কার্ডে থাকছে কিউআর কোড। গণনাকক্ষে ঢোকার মুখে ওই কিউআর কোড স্ক্যান করে প্রত্যেককে ভিতরে ঢুকতে হবে। তবে তার আগে প্রত্যেকের আইডি কার্ড আরও দু’বার পরীক্ষা করবেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা। রিটার্নিং অফিসার, পর্যবেক্ষক ছাড়া গণনাকক্ষে কারও মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি নেই। পুরো গণনাপ্রক্রিয়ার ভিডিয়োগ্রাফি বাধ্যতামূলক। ভিডিয়োগ্রাফি করা হবে স্ট্রংরুম খোলা, ইভিএম আনা, ভোট গণনা এবং ফল ঘোষণার। এই সব ভিডিয়ো নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে— স্পষ্ট নির্দেশ কমিশনের।

সংক্ষেপে
  • রবিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছিল। রাজ্যের বেশ কয়েক জন আমলা এবং পুলিশ আধিকারিককে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করে নির্বাচন কমিশন। বুধবার রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। সেই সব পদে নতুন আধিকারিকও নিয়োগ করে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, কমিশন স্পষ্ট জানায়, যাঁদের অপসারণ করা হচ্ছে, তাঁদের এ রাজ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও কাজে আপাতত আর নিয়োগ করা যাবে না!
  • পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ক্ষেত্রে কমিশনের এই ‘সক্রিয়তা’ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে শাসকদল তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ভাবে অপসারণের পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিও লেখেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আগাম কোনও আলোচনা না-করে বা কোনও মতামত না-নিয়ে বদলি করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অতীতে নির্বাচন চলাকালীন কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আধিকারিককে সরানোর প্রয়োজন হলে কমিশনের পক্ষ থেকে সাধারণত রাজ্য সরকারের কাছে তিন জনের একটি প্যানেল চাওয়া হত। সেই তালিকা থেকে কমিশন নিজেই এক জনকে বেছে নিত। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এ বার সেই প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ঘটেছে। প্রার্থিতালিকা ঘোষণার আগেও কমিশনকে এ বিষয়ে তোপ দাগেন মমতা। নিশানা করেন কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেও।
সর্বশেষ
৩৬ মিনিট আগে
Counting Centre Poll Counting
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy