Advertisement
E-Paper

ভোটের বাজারে রামনবমীই হয়ে উঠল নির্বাচনী প্রচারের মাধ্যম, দিকে দিকে মিছিল, মোটের উপর উদ্‌যাপন শান্তিপূর্ণই

গত বছরের মতো এ বারও রামনবমী পালিত হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। জেলায় জেলায় রামনবমীর মিছিলে সাড়া মিলেছে। এ বার এই ধর্মীয় উদ্‌যাপনের সঙ্গে মিশে গিয়েছে নির্বাচনী প্রচার।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ ২১:৫২
মেদিনীপুরে রামনবমী উপলক্ষে বাইক মিছিল। বৃহস্পতিবার।

মেদিনীপুরে রামনবমী উপলক্ষে বাইক মিছিল। বৃহস্পতিবার। —নিজস্ব চিত্র।

শিয়রে নির্বাচন। তাই পশ্চিমবঙ্গে এ বছরের রামনবমীর উদ্‌যাপন হয়ে উঠল নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম মাধ্যম। রাজ্যের নানা প্রান্তে উৎসবকে কেন্দ্র করে নেতা-কর্মীরা পথে নামলেন। উঠল রামের নামে স্লোগান, পাল্টা স্লোগান। কোথাও মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে বিজেপি নেতা হাতে তুলে নিলেন গদা, কোথাও খোদ প্রার্থীর হাতে দেখা গেল লাঠি। তবে দিনের শেষে রামনবমীর প্রথম দিনের উদ্‌যাপন মোটের উপর শান্তিপূর্ণই। কোথাও বড় কোনও গোলমালের খবর পাওয়া যায়নি।

রামনবমী উপলক্ষে বিজেপি যে ঢালাও প্রচারে নামবে, তা আগে থেকেই ঠিক ছিল। বলা হয়েছিল, বৃহস্পতি এবং শুক্রবার রামনবমীকে কেন্দ্র করেই পদ্ম শিবিরের নির্বাচনী প্রচার আবর্তিত হবে। সেই মতো বেলা গড়াতেই দিকে দিকে মিছিল শুরু হয়। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী মাথায় গেরুয়া পাগড়ি পরে মিছিলে নেমেছিলেন ভবানীপুর কেন্দ্রে। সেখান থেকেই তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ভোটে লড়ছেন। মিছিল থেকে শুভেন্দু বলেন, ‘‘রামনবমীতে রামরাজ্য চাই। রামরাজ্যের মতো নারীদের সুরক্ষা, হাতে হাতে কাজ, পেটে পেটে ভাত চাই। সুশাসন চাই। আর সনাতন বিরোধীদের বিনাশ চাই।’’ শুভেন্দুদের মিছিলে হাঁটেন কয়েক জন সাধুসন্ন্যাসীও। বিজেপির কোনও পতাকা মিছিলে ছিল না। ভবানীপুর থেকে শুভেন্দু গিয়েছিলেন সোদপুরের পানিহাটিতে। সেখানকার বিজেপি প্রার্থী তথা আরজি করে নির্যাতিতা চিকিৎসকের মায়ের সঙ্গে দেখা করেন বিরোধী দলনেতা। তার পর এন্টালিতে শ্রীরাম স্বাভিমান পরিষদ আয়োজিত একটি শোভাযাত্রাতেও যোগ দেন। রামলীলা পার্ক থেকে শুভেন্দু বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রামনবমীর দিন রাজনৈতিক ভাষণ দিচ্ছেন। তিনি ইদের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সময় পান। কিন্তু রামনবমীর জন্য ওঁর সময় নেই।’’

রামনবমীর মিছিলে হাতে গদা নিয়ে বিজেপি প্রার্থী রুদ্রনীল ঘোষ। বৃহস্পতিবার হাওড়ায়।

রামনবমীর মিছিলে হাতে গদা নিয়ে বিজেপি প্রার্থী রুদ্রনীল ঘোষ। বৃহস্পতিবার হাওড়ায়। —নিজস্ব চিত্র।

গত বছরের মতো এ বারও রামনবমী পালিত হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানকার তথ্যপ্রযুক্তি ভবনে রামের মূর্তি বসিয়ে পুজো করেন ছাত্রছাত্রীদের একাংশ। গেরুয়া পতাকা দিয়ে ওই অংশ সাজানো হয়েছিল। তবে অন্য একটি ছাত্র সংগঠন পুজোর সামনে এসে বিক্ষোভ দেখায় বলে অভিযোগ। তারা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেয়। পাল্টা রামনবমীর সমর্থকদের তরফে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হয়। স্লোগান-পাল্টা স্লোগানে বেশ কিছু ক্ষণ পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানান, পুজোর কোনও অনুমতি কর্তৃপক্ষের তরফে দেওয়া হয়নি। ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মতো করে রামনবমী উদ্‌যাপন করছেন। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁরা পুজো করছেন, তাঁরা পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন। আমরাও যাদবপুর থানাকে জানিয়ে রেখেছিলাম এবং সতর্ক থাকতে বলেছিলাম। ক্যাম্পাসে পুলিশ আমরা কখনও ঢোকাই না। আমি ব্যক্তিগত ভাবে তার পক্ষপাতী নই। কিন্তু পুলিশকে বলে রাখা হয়েছে। আমি অনুমতি না-দিলে তাঁরা কেউ ভিতরে ঢুকবেন না। এখানে পুজোর কোনও আনুষ্ঠানিক অনুমতি নেই। মৌখিক ভাবে বলা হয়েছিল, এখানে তো যে যা খুশি করে। সেটাকে কেউ অনুমতি বলে ধরে নিয়েছেন।’’

যাদবপুরে পুজোর আয়োজক এক ছাত্র বলেন, ‘‘আমরা শান্তিপূর্ণ ভাবে পুজো করেছি। এখানে দেশবিরোধী কিছু সংগঠন এসেছিল। কারণ ছাড়াই স্লোগান দিচ্ছিল। ওরা আগের বছরেও ঝামেলা করেছিল। আমরা পাল্টা ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়েছি।’’ আরএসএফ-এর তরফে বিশ্ববিদ্যালয়ে রামনবমী পালনের বিরোধিতা করা হয়েছিল। ওই সংগঠনের এক ছাত্র বলেন, ‘‘আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো, ইদ সব হয়। কিন্তু এটা এমন একটা উৎসব, যাকে সাম্প্রদায়িক অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে বার বার। তাই আমরা এর বিরোধী। এই মঞ্চ থেকে সাম্প্রদায়িক হিংসার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।’’

জেলায় জেলায় রামনবমীর মিছিলেও সাড়া মিলেছে। হাওড়ায় বিজেপি প্রার্থীরা হাতে গদা নিয়ে প্রচারে নেমে পড়েছিলেন। শিবপুরের বিজেপি প্রার্থী তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষকে গদা হাতে নাচতে দেখা গিয়েছে রামনবমীর মিছিলে। মধ্য হাওড়ার বিজেপি প্রার্থী বিপ্লব মণ্ডলও গদা হাতে মিছিলে হেঁটেছেন। মিছিল থেকেই তিনি তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। বলেন, ‘‘এখানকার বিধায়ক কোনও কাজ করেননি। নিকাশি ব্যবস্থা, পানীয় জলের অবস্থা শোচনীয়। মানুষ আমাদেরই ভোট দেবেন। ১০০ শতাংশ আশাবাদী। নিজেদের ধর্ম রক্ষার জন্য আমরা হাতে গদা নিয়েছি।’’

বাঁকুড়ার ওন্দায় রামনবমীর মিছিলে বিজেপি প্রার্থীর হাতে লাঠি। বৃহস্পতিবার।

বাঁকুড়ার ওন্দায় রামনবমীর মিছিলে বিজেপি প্রার্থীর হাতে লাঠি। বৃহস্পতিবার। —নিজস্ব চিত্র।

হাওড়ায় প্রতি বছরের মতো এ বারও অঞ্জনি সেনা এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের তরফে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছিল। ডিজে বাজিয়ে মিছিল হয়। বহু মানুষ তাতে যোগ দিয়েছিলেন। রামনবমী নিয়ে বিকেলে সাংবাদিক বৈঠক করেন হাওড়া সিটি পুলিশের কমিশনার অখিলেশ চতুর্বেদী। তিনি জানান, শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা হয়েছে। কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ কোথাও অমান্য করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখছে। তেমন কিছু পেলে আইনানুগ পদক্ষেপ করা হবে।

রামনবমী উপলক্ষে মেদিনীপুরেও মিছিল হয়েছে। মেদিনীপুর শহরে রামনবমী সমারোহ সমিতির উদ্যোগে বাইক মিছিল বার করা হয়েছিল বৃহস্পতিবার বিকেলে। শহরের জজ কোর্ট সংলগ্ন অরবিন্দনগর থেকে মিছিল শুরু হয়। মেদিনীপুরের বিজেপি প্রার্থী শঙ্কর গুছাইতকে সেখানে হাতে গদা নিয়ে হুড খোলা জিপে চেপে ভোটের প্রচার করতে দেখা গিয়েছে।

বীরভূমের সিউড়িতে রামনবমীর মিছিলে অস্ত্র হাতে নিতে দেখা গিয়েছে কিছু বিজেপি সমর্থককে। ওই মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন সিউড়ির বিজেপি প্রার্থী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। কেউ কেউ হাতে নিয়েছিলেন তলোয়ার।

বাঁকুড়ার ওন্দায় বিজেপি প্রার্থী অমরনাথ শাখাকে রামনবমীর শোভাযাত্রায় স্টিলের লাঠি ঘোরাতে দেখা গিয়েছে। ওন্দা রেলস্টেশন মাঠ থেকে বাজার ঘুরে গোগড়া গ্রামে মিছিল শেষ হয়। বিজেপি প্রার্থী অবশ্য দাবি করেছেন, প্রচারের সঙ্গে এই মিছিলের সম্পর্ক নেই। লাঠি খেলা তাঁদের সংস্কৃতির অঙ্গ। ওই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সুব্রত দত্ত পাল্টা কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অমরনাথবাবু যোগ দিতেই পারেন। কিন্তু তিনি গত পাঁচ বছর ধরে ওন্দার মানুষের সঙ্গে খেলেছেন। ভোটের মুখে লাঠি খেলে ভুল বোঝানোর দরকার নেই।’’

পশ্চিম বর্ধমানেও রামনবমীর মিছিল হয়েছে। একসঙ্গে পা মিলিয়েছেন দুর্গাপুর পূর্বের বিজেপি প্রার্থী চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দুর্গাপুর পশ্চিমের বিজেপি প্রার্থী লক্ষ্মণ ঘোড়ুই। তাঁরা তলোয়ার হাতে হাঁটছিলেন। অভিযোগ, পুলিশ বাধা দিলেও কর্ণপাত করেননি। সাফ জানিয়ে দেন, এ রাজ্যে সুরক্ষা নেই। সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত কয়েক বছর ধরে রামনবমীকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে মিছিল, শোভাযাত্রা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উদ্‌যাপন বেড়েছে। এ ব্যাপারে বিজেপি এগিয়ে। তবে তাদের জমি পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি তৃণমূলও। অতীতে রামনবমীকে কেন্দ্র করে রাজ্যে অশান্তি, হিংসা এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতির নজির রয়েছে। তাই পুলিশ-প্রশাসন বাড়তি সতর্ক। এ বছর তার সঙ্গে ভোটের প্রচার জুড়ে গিয়ে রামনবমী আলাদা মাত্রা পেয়েছে। অনেক জায়গাতেই শুক্রবার এই উৎসব পালিত হবে। কলকাতায় রামনবমীর প্রস্তুতি, নিরাপত্তা নিয়ে হেস্টিংস থানায় একটি বৈঠক করেন পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ। শুক্রবারের জন্যেও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে।

Ram Navami BJP TMC Suvendu Adhikari
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy