ভোট গণনার কাজে নিযুক্ত কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার এবং কাউন্টিং অ্যাসিসট্যান্ট কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী হতে পারেন, আবার রাজ্য সরকারেরও কর্মী হতে পারেন। এই নিয়ে নির্বাচন কমিশন যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, তা বিধি-বিরোধী বলা যাবে না— এ কথা জানিয়ে তৃণমূলের আপত্তির মামলা খারিজ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি পিএস নরসিংহ এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে জানাল, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কর্মীদের আলাদা করে দেখার মধ্যে ভ্রান্তি রয়েছে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পরে বিবৃতি দিয়ে তৃণমূল জানিয়েছে, তারা আশা রাখছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো ভোটগণনার প্রক্রিয়া স্বাধীন, স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ ভাবে হবে।
তৃণমূলের মূল অভিযোগ, ভোট গণনাকেন্দ্রে কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার বা তাঁর সহকারী বা অন্যান্য গণনাকর্মী হিসাবে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের নিয়োগ করছে নির্বাচন কমিশন। তাদের আবেদন ছিল, কমিশনের এই সিদ্ধান্ত তারা মেনে নিতে পারে না। হাই কোর্টে সেই মামলা খারিজ করেছিল। তার পরে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিল তৃণমূল। শনিবার বিচারপতি নরসিংহ এবং বিচারপতি বাগচীর বেঞ্চে ছিল শুনানি। সেখানে তৃণমূলের হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী কপিল সিব্বল, আইনজীবী মীনাক্ষী অরোরা। নির্বাচন কমিশনের হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী দামা শেষাদ্রি নাইডু।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, ‘‘কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার এবং কাউন্টিং অ্যাসিস্ট্যান্ট কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী হতে পারেন, আবার রাজ্য সরকারি কর্মীও হতে পারেন। সুতরাং, যখন এই বিকল্পটি নিয়মেই রয়েছে, তখন আমরা বলতে পারি না যে এই নোটিফিকেশনটি (কমিশনের) বিধি-বিরোধী।’’ তার পরেই বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘‘কমিশন সিদ্ধান্ত নিতেই পারে দু’জনই কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী থাকবেন। এতে কোনও নিয়ম ভঙ্গ হচ্ছে না।’’ তৃণমূল দাবি করে, কমিশন সার্কুলার মেনে কাজ করছে না। তাতে সুপ্রিম কোর্ট বলে, ‘‘যদি সার্কুলারে এমনটা বলা থাকত, তবুও আমরা তাতেও কোনও অন্যায় দেখতাম না। কারণ, নিয়মেই বলা আছে— কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্য সরকারের কর্মীকে এই পদে নিয়োগ করা যেতে পারে।’’
তৃণমূলের আইনজীবী যুক্তি দেন, রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের মধ্যে থেকে এলোমেলো ভাবে বাছাই হওয়া উচিত ছিল। তাতে বিচারপতি নরসিংহ বলেন, ‘‘রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারীদের আলাদা হিসাবে দেখার মধ্যে আর একটি ভ্রান্তি রয়েছে। আসলে তাঁরা সকলে সরকারি কর্মচারীই।’’ তার পরেই সুপ্রিম কোর্ট জানায়, গণনা সংক্রান্ত তৃণমূলের মামলায় তারা এখনই কোনও নির্দেশ দিতে রাজি নয়। কমিশন নিজের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কাজ করতে পারবে। অতিরিক্ত কোনও নির্দেশের প্রয়োজনীয়তা নেই আপাতত।
তৃণমূলের সওয়াল
শুনানির শুরুতে তৃণমূলের আইনজীবী কপিল সওয়াল করে বলেন, ‘‘আমাদের চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। গত ১৩ এপ্রিল জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছে নোটিস জারি করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা সেটা জানতে পারি ২৯ তারিখে। কমিশন আশঙ্কা করছে—প্রত্যেকটি বুথে নাকি সমস্যা বা অশান্তি হতে পারে। কিন্তু এই ধারণা তারা কোথা থেকে পাচ্ছে? এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’’ কেন্দ্রীয় আধিকারিকদের নিয়োগ প্রসঙ্গে কপিল বলেন, ‘‘গণনায় প্রতিটি টেবিলে ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের একজন কর্মী রয়েছেন, যাঁদের মাইক্রো অবজ়ার্ভার বলা হয়। তা হলে আবার কেন আরও একজন কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী প্রয়োজন?’’ কপিল যোগ করেন, ‘‘সার্কুলারেই বলা রয়েছে, একজন রাজ্য সরকারের কর্মী থাকা উচিত। কিন্তু তারা কোনও রাজ্য সরকারের মনোনীত প্রতিনিধিকে নিয়োগ করছে না। সিইও বলেছেন, বিভিন্ন মহল থেকে গণনা প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য অনিয়ম নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এটি সরাসরি রাজ্য সরকারের দিকেই আঙুল তুলছে। কিছু না কিছু তথ্য তো থাকা উচিত। প্রতিটি বুথে যে আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে, সেই তথ্য কোথায়? তারা এই বিষয়ে কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি। আর কেন আমাদের জানানো হল না যে, সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিকে রাখা হবে?’’
আরও পড়ুন:
কমিশনের সওয়াল
কমিশনের আইনজীবী বলেন, ‘‘গণনায় রিটার্নিং অফিসারের সর্বোচ্চ ক্ষমতা রয়েছে। তিনি রাজ্য সরকারের ক্যাডারেরই আধিকারিক। তা ছাড়া, প্রত্যেক প্রার্থীর নিজস্ব কাউন্টিং এজেন্ট গণনায় থাকবেন। তাই মামলায় যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’’
তৃণমূলের বিবৃতি
সুপ্রিম কোর্টের মামলা নিয়ে পরে তৃণমূলের তরফে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার এবং কাউন্টিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে শুধু কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগ অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিপন্থী বলে তৃণমূল মনে করে। শীর্ষ আদালতকে সেটা জানানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার এবং কাউন্টিং অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে নিয়োগ সংক্রান্ত কমিশনের ১৩ এপ্রিলের বিজ্ঞপ্তিটির ১ নম্বর ধারা, ওই বিজ্ঞপ্তির দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় উল্লিখিত একটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে হবে। সেখানে রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের নির্বাচনের বিধান রয়েছে। আদালতে শুনানির পর তৃণমূল আশা রাখছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো ভোটগণনার প্রক্রিয়া স্বাধীন, স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ ভাবে হবে।
তৃণমূল আবেদনে জানিয়েছিল, ভোট গণনাকেন্দ্রে কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার বা তাঁর সহকারী বা অন্যান্য গণনাকর্মী হিসাবে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের নিয়োগ করছে নির্বাচন কমিশন। সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল তৃণমূল। তাদের আবেদন ছিল, কমিশনের এই সিদ্ধান্ত তারা মেনে নিতে পারে না। মাইক্রো অবজ়ার্ভার হিসাবে কেন্দ্রীয় কর্মচারী নিযুক্ত করায় আপত্তি নেই তৃণমূলের। তবে বাকি গণনাকর্মীও কেন কেন্দ্রীয় সরকারি সরকারি কর্মচারী হবেন? কেন সেখানে রাজ্য সরকারের কর্মীরা থাকবেন না?এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করুক আদালত। প্রত্যেক গণনার টেবিলে কমপক্ষে এক জন কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার বা সহকারী হিসাবে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী নিয়োগের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন, তাতে হস্তক্ষেপ করেনি হাই কোর্ট। বিচারপতি কৃষ্ণা রাও শুনানিতে জানান, কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের নিয়োগ বৈধ। হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ, কমিশনের সিদ্ধান্তে বেআইনি কিছু নেই। মামলাকারীর অভিযোগ প্রমাণহীন। যদি ভবিষ্যতে গণনায় কারচুপি প্রমাণ হয়, তবে ইলেকশন পিটিশনের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা যাবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
-
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল আরএন রবি, ইস্তফা না-দিলেও মমতা এখন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী! রাজ্য কার?
-
বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী! রাজ্যে প্রচারে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন কথা
-
ভোট-পরবর্তী গোলমালে রুজু ২০০ এফআইআর! কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অশান্তি পাকাতে চাইছেন: ডিজি সিদ্ধনাথ
-
‘কমিশন ১০টি গণনাকেন্দ্রের ছয় ঘণ্টার ফুটেজ দিক, দেখাক কিছু হয়নি, আমি মেনে নেব এটাই জনাদেশ’! চ্যালেঞ্জ অভিষেকের
-
৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেল বিজেপি! ৮০টি আসনে জয়ী তৃণমূল, তাদের ভোটের হার কত