মালদহের কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরি এবং সাবিত্রী মিত্রের দ্বন্দ্বের মতোই সোনামুখীর দীপালি-সুরজিতের তিক্ত সম্পর্কের কথা কারও অজানা নয়। দুই নেতানেত্রীর দ্বন্দ্বের জেরে বারবার অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে জেলা নেতাদের। খবর গিয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছেও। তাই সোনামুখীতে দলের প্রার্থী দীপালি সাহার ভোট প্রচারে এসে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী কে, তা না দেখে সরাসরি দলকে দেখে ভোট দিতে বলে গেলেন। মমতার কথায়, ‘‘দীপালি কি সুরজিৎ প্রার্থী ভুলে যান। শুভাশিস না স্বপন ভুলে যান। আমাদের চিহ্নই বড় পরিচয়।” নেত্রীর এই বক্তব্যের পরে তৃণমূলের এক জেলা নেতার ব্যাখ্যা, ‘‘সোনামুখী ও ইন্দাসে দলের একাংশ প্রার্থীদের সাবোতাজ করে হারিয়ে দিতে পারে বলে নেত্রীর কানেও খবর পৌঁছেছে। সেই কারণেই এই বার্তা দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্তি দূর করতে চাইছেন দলনেত্রী।’’
সোনামুখীতে এই দুই নেতানেত্রীর বিরোধ অনেক দিনের। তৎকালীন বামফ্রন্ট পরিচালিত সোনামুখী পুরসভায় অনাস্থা নিয়ে আসা থেকে সংগঠনের নানা কাজ, এমনকী সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাতেও দুই নেতা-নেত্রীর দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দীপালিকে জেতাতে তাঁর বিক্ষুদ্ধ গোষ্ঠী মাঠে না নামলে ক্ষতির আশঙ্কাও দলের অনেকে করছেন। তার উপরে লোকসভা ভোটে বুথ লুঠপাটের অভিযোগে দীপালির নাম জড়িয়ে যাওয়ায় এবং তাঁর অনুগামী এক নেত্রী পারিবারিক বিবাদের মধ্যস্থতা করতে গিয়ে অন্তঃসত্ত্বাকে লাথি মারায় অভিযুক্ত হওয়ায় ভোটে তার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তাই এই কেন্দ্র ধরে রাখতে মমতা এ দিন দ্বন্দ্ব ভুলে কাজ করার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। এ দিন অবশ্য সোনামুখীর সভায় পুরপ্রধান সুরজিৎ মুখোপাধ্যায় ছিলেন না। তিনি ছিলেন মমতার ইন্দাসের সভায়। মমতাই জানান, ইন্দাসের সভার কাজে সুরজিৎ সেখানে রয়েছেন। কিন্তু নিচুতলার কর্মীরা জানাচ্ছেন, নেত্রী আড়াল করার চেষ্টা করলেও দীপালি ও সুরজিতের দ্বন্দ্ব চাপা থাকছে কই? ক’দিন বাদেই ফের তা সামনে চলে আসবে।
ইন্দাসের মাঠ ছাপিয়ে সভার ভিড়।—নিজস্ব চিত্র
তবে মমতাকে ভরসা দিয়েছে এ দিন সোনামুখী ও ইন্দাসের শাসপুরে জনতার ভিড়। পরে ছাতনা ও বড়জোড়াতে সভা করতে গিয়েও ভিড় দেখেছেন। পুলিশের হিসেব সব জায়গায়তেই গড়ে ১৫-২০ হাজার মানুষ ভিড় করেছিলেন। তীব্র গরমের মধ্যেও মানুষের এই ভিড় তৃণমূল নেতাদের স্বস্তি দিয়েছে। চড়া রোদকে উপেক্ষা করেও এত বিপুল জনসমাগম দেখে উচ্ছ্বসিত তৃণমূল নেত্রী তাঁর সরকারের আমলে উন্নয়নের ফিরিস্তি শোনান। তীব্র আক্রমণ শানালেন সিপিএম কংগ্রেসের জোটকেও।
তবে সোনামুখী ও বড়জোড়ায় মমতার সভায় জনতার একাংশের আচরণ কিছুটা হলেও উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে শাসকদলের নেতাদের। সোনামুখীতে এ দিন মমতা স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে জনতার কাছে জানতে চান, ‘‘আদিবাসী ভাই-বোনেরা, সংখ্যালঘু ভাই-বোনেরা, সাধারণ মা-বোনেরা আপনারা ভোটটা দেবেন তো?’’ জনতার মধ্যে থেকে কোনও আওয়াজ উঠে আসেনি। নেত্রী অবশ্য তার অপেক্ষায় না থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে যান। যদিও স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের দাবি, অত্যাধিক গরমে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে কিছু জানাতে পারেননি। তাঁরা তৃণমূলকে ভোট দেবেন বলেই তো এত কষ্ট করে সভায় এসেছিলেন।
বড়জোড়ায় অবশ্য তাঁর জন্য আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। সেখানে মমতা জানতে চান— ‘‘আপনারা জল পাচ্ছেন তো?’’ জনতার একাংশ জবাব দেন— ‘‘না।’’ কিছুটা থমকে মমতা বলেন, ‘‘চিন্তা নেই। কিছু কাজ বাকি আছে। শীঘ্রই জল আসবে।’’ যদিও দুর্গাপুর ব্যারাজ থেকে নলবাহিত জল বড়জোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রকল্পের ইতিমধ্যেই উদ্বোধন করে দিয়ে গিয়েছেন জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের বিদায়ী মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়। সেই উদ্বোধনী মঞ্চে ‘‘জল খাবেন, ভোট দেবেন। জল খাবেন না, ভোট দেবেন না’’ বলে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন সুব্রতবাবু। এ দিন মমতা ফের সেই প্রসঙ্গ তোলায় স্ভাস্থলেই প্রমাদ গনেন কিছু স্থানীয় তৃণমূল নেতা। পরে তাঁরা বলেন, ‘‘নেত্রী জলের ব্যাপারটা না তুললেই পারতেন।’’ ঘটনাচক্রে এ দিই বাঁকুড়ায় সভা করতে এসে কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গাঁধী প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘২০১২ সালে ইউপিএ সরকার এই জল প্রকল্পের টাকা বরাদ্দ করলেও রাজ্য সরকার কেন এতদিনেও মানুষকে সেই জল খাওয়াতে পারল না?’’
প্রথম দফায় জঙ্গলমহলের তিন কেন্দ্রে ভোট কাল সোমবার। রাজ্যের দ্বিতীয় দফার ভোট আগামী ১১ এপ্রিল। জেলার বাকি ন’টি কেন্দ্রে ভোট হবে ওই দিন। তারই প্রচারে এদিন বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস, সোনামুখী, ছাতনা ও বড়জোড়া কেন্দ্রে চারটি সভা করেন তৃণমূলনেত্রী। গত বিধানসভা ভোটে ইন্দাস বিধানসভা কেন্দ্রে হাজার খানেক ভোটে জিতেছিলেন গুরুপদ মেটে। যদিও লোকসভা ভোটের নিরিখে এই কেন্দ্রে অনেকটাই এগিয়ে তৃণমূল। তারপরেও অবশ্য স্বস্তিতে নেই শাসকদল। বিধায়কের সঙ্গে দলের ব্লক সভাপতির বিরোধের পাশাপাশি গোঁজ কাঁটাও রয়েছে। এই অবস্থায় স্বাভাবিক কারণেই এই আসন ধরে রাখতে মরিয়া তৃণমূল নেতৃত্ব। তিনদিন আগে ইন্দাসে মুকুল রায় ও দেব সভা করে গিয়েছেন। ভোটের আগে দলের সর্বোচ্চ নেত্রীকে দিয়ে সভা করিয়ে দ্বন্দ্ব সামলে ফাঁক ফোকর বোজানো তারই ইঙ্গিত বলে রাজনৈতিক মহলের অভিমত।
এ দিন ইন্দাসের শাসপুরের এই সভায় উপছে পড়েছিল ভিড়। তৃণমূল নেত্রীকে একবার চোখে দেখার জন্য সভার পাশে বড় বড় গাছেও উঠে বসেছিলেন যুবকেরা। যতবার মমতা বিরোধীদের উদ্দেশে সুর চড়িয়েছেন ততই হাততালি পড়েছে সভাস্থলে। এই ভিড়ের চাপে ইন্দাস থেকে আকুই, দীঘলগ্রাম রাস্তায় দু’ঘণ্টা ধরে যান চলাচল ব্যাহত হয়। এর আগে গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে ইন্দাসে সভা করেছিলেন মমতা। এখানে দলে দ্বন্দ্ব থাকলেও তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক তথা প্রার্থী গুরুপদ মেটে, গৌতম বেরা, স্নেহেশ মুখোপাধ্যায়ের পাশাপাশি রবিউল হোসেন সকলেই কোমর বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
তবে মমতাকে কাছে পেয়ে এ দিন সভায় বেশ কয়েকটি পোস্টার নিয়ে এলাকার একটি খেলার মাঠ দখল করে নেওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয়েরা দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। সোনামুখী স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অস্থায়ী কর্মীরা তাঁদের বেতন কম বলে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি করেন।