• জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সংস্কার চাই, মমতাকে বলবেন আমলারা

nabanna

দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর আগে মুখ্যমন্ত্রীকে একগুচ্ছ পরামর্শ দিতে চান রাজ্যের শীর্ষ আমলারা। বোঝাতে চান, আপাতত দানধ্যান পাশে সরিয়ে সংস্কারের পথে নামতে হবে রাজ্যকে।

মুখ্যসচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এ রাজ্যের বেশ কয়েক জন সচিব মুখ্যমন্ত্রীর জন্য একটি ‘আলোচনা পত্র’ তৈরি করেছেন। রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি, শিল্পে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক ভাবে ভাবমূর্তির প্রশ্নে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে রাজ্য— তা তাঁকে খোলাখুলি জানানো হবে। পাশাপাশি, পাঁচ দফা সংস্কার কর্মসূচি নিয়েও মুখ্যমন্ত্রীকে প্রস্তাব দেবেন সচিবরা।

নবান্নের এক কর্তা জানান, দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফেরার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাই নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর আগামী পাঁচ বছরের জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করতে মুখ্যসচিবকে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেই কাজটাই সেরে রেখেছেন মুখ্যসচিব। নবান্নের এক বরিষ্ঠ আমলার কথায়, ‘‘রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মানুষ ঢেলে ভোট দিয়েছেন। রাজ্যে আগামী দু’বছর কোনও ভোট নেই। ফলে সংস্কারের জন্য কিছু সাহসী পদক্ষেপ করতে হবে সরকারকে। একমাত্র তা হলেই ফিরতে পারে রাজ্যের ভাবমূর্তি।’’

কী সেই সংস্কার?

নবান্নের আমলারা মনে করছেন, আপাতত তিনটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে সরকারের সামনে। রাজ্যের আর্থিক হাল ফেরানো, পে-কমিশনের জন্য বাড়তি অর্থের সংস্থান করা এবং বিনিয়োগ টেনে কর্মসংস্থান বাড়ানো। এই তিনটি চ্যালে়ঞ্জ মোকাবিলার জন্য অন্তত পাঁচটি সাহসী পদক্ষেপ জরুরি।

সেগুলি কী?

এক), আগামী দু’বছর নতুন কোনও প্রকল্প ঘোষণা না করা, যাতে সরকারি খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে। দুই), পে-কমিশনের বাড়তি বোঝা বহনের জন্য মূল্যযুক্ত কর (ভ্যাট)-এর হার এক বা দুই শতাংশ হারে বাড়ানো। তিন), বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে লোকসান কমানো এবং আয়ের পথ তৈরি করা। চার), জমি অধিগ্রহণ নিয়ে কেন্দ্রীয় আইন তৈরি হলে রাজ্যেরও নিজস্ব আইন তৈরি করা। এতে শিল্প মহলের কাছে বার্তা যাবে যে সরকার বিনিয়োগ টানতে বদ্ধপরিকর। পাঁচ), তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য ঘুরপথে কিছু নীতিগত অবস্থান নেওয়া।

কেন এই পাঁচ দফা সংস্কারই রাজ্যের বেহাল দশা কিছুটা হলেও ঘোচাতে পারে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন আমলাদের একাংশ। তাঁরা জানাচ্ছেন, গত পাঁচ বছরে সামাজিক উন্নয়ন এবং পরিকাঠামো নির্মাণে গুচ্ছ প্রকল্প তৈরি হয়েছে। রাস্তা থেকে হাসপাতাল নির্মাণ, কিষাণ মান্ডি থেকে আইটিআই, পর্যটন কেন্দ্র থেকে পানীয় জল, বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর মতো যে সব কাজ হয়েছে, তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা  দরকার। কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, সবুজ সাথী, খাদ্যসাথীর মতো প্রকল্পগুলি চালু রাখতে বছরে খরচ আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। তাই আগামী দু’বছর নতুন কোনও প্রকল্প ঘোষণা না করে সরকার যাতে পুরনোগুলো রক্ষায় নজর দেয়, সে দিকে নজর দেওয়া উচিত মুখ্যমন্ত্রীর।

আমলাদের একাংশ জানাচ্ছেন, এখন রাজ্য-বাজেটের ৫৮ হাজার কোটি টাকা খরচ হয় পরিকল্পনা খাতে। পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে ব্যয় হয় ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। ফলে খরচে নিয়ন্ত্রণ আনাই হবে সরকারের প্রথম পদক্ষেপ। এর পরেই থাকবে সরকারি কর্মচারীদের পে-কমিশনের টাকা জোগাড় করার বিষয়টি। এমনিতেই ৫০ শতাংশ মহার্ঘভাতা বকেয়া থাকায় রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বড় অংশ ক্ষুব্ধ। এই অবস্থায় সচিবদের একাংশ বলছেন, কেন্দ্র নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করায় রাজ্যের উপরেও নতুন পে-কমিশন লাগু করার চাপ থাকবে। এক কর্তা বলেন, ‘‘নতুন পে-কমিশন হলে আগামী বছর বেতন-পেনশন খাতেই খরচ বাড়বে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এটা তুলতে গেলে ভ্যাটের হার, বিদ্যুতের উপর সারচার্জ বাড়াতেই হবে।’’ তাঁরা মনে করেন, যে হেতু সামনে কোনও ভোট নেই, তাই করের হার বাড়ালেও সরকারের জনপ্রিয়তার ভাটা পড়বে না।

তবে খরচ নিয়ন্ত্রণে আনা বা সরকারি কর্মীদের বেতন বাড়ানোটাই নতুন সরকারের একমাত্র কাজ হতে পারে না বলে মনে করেন প্রশাসনের কর্তারা। তাঁদের মতে, তাঁর সরকার যে রাজ্যে লগ্নি টেনে কর্মসংস্থান বাড়ানোকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে, এ বার শিল্পমহলকে সেই বার্তা দেওয়া উচিত মুখ্যমন্ত্রীর। আর সেটা করতে গেলে নতুন জমি অধিগ্রহণ আইন দ্রুত তৈরি করা প্রয়োজন। বিনিয়োগ টানার লক্ষ্যে এটাই হতে পারে নবান্নের প্রথম ইতিবাচক পদক্ষেপ। এক শীর্ষকর্তার কথায়, ‘‘সেপ্টেম্বরে লগ্নি সফরে আমেরিকা যেতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী। তার আগেই যাতে সরকার জমির আইন তৈরি করতে পারে, সে দিকে নজর থাকবে আমাদের।’’ 

তাঁর কথায়, ‘‘কর্মসংস্থানের একটি বড় ক্ষেত্র তথ্য-প্রযুক্তি। এই সেক্টরে বড় কয়েকটি সংস্থাকে যাতে রাজ্যে আনা যায়, সে জন্য কৌশলে সরকারের বর্তমান অবস্থানে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীকে সেই প্রস্তাবই দেব।’’

মুখ্যমন্ত্রীর কথা মতো আমলারা পরিকল্পনা-প্রস্তাব তৈরি করেছেন। তাঁকে তা জানানোও হবে। কিন্তু ২ টাকার চাল আর সাইকেল বিলির মতো পদক্ষেপ ছেড়ে তিনি কি সংস্কারের পথে হাঁটবেন? আপাতত এটাই প্রশ্ন। এক কর্তা বলেন, ‘‘পরিস্থিতি অনুযায়ী সরকারকে সঠিক পথ দেখানো আমলাদের কাজ। তিন লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দানধ্যানে ডুবে থাকার দিন যে আর নেই, আশা করি তা উনি বুঝবেন।’’

যদি না বোঝেন?

এক আমলার জবাব, ‘‘বুঝবেন নিশ্চই।’’ কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, পরের বছর থেকে ঋণের সুদ ও আসল শোধ করতেই কোষাগার থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা চলে যাবে। সরকার চালানোই তখন মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। তাঁর কথায়, ‘‘তাই এখন থেকেই কৃপণ জমিদারের ভূমিকা নিতে হবে মুখ্যমন্ত্রীকে।’’

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন