• সুদীপ্তা চক্রবর্তী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ঋতুদার বকুনিগুলোও মিস করি: সুদীপ্তা

celebs

Advertisement

ঋতুদাকে মিস করি প্রচন্ড। দ্যাটস ফর শিওর। বিভিন্ন ভাবে মিস করি। ঋতুদার ছবি মিস করি পর্দায়, দর্শক হিসেবে। ঋতুদার সঙ্গে কাজ করার আর সুযোগ হল না, এটা ভাবলেই কষ্ট পাই। ব্যক্তিগত জীবনেও মিস করি। সকাল বেলা ৬টা-সওয়া ৬টা নাগাদ ফোন কল, সেটা মিস করি। বা কোনও কিছু ভুলভাল করেছি আর কি…, হয় কোনও ছবিতে বাজে অভিনয় করেছি না হলে এমন কোনও কাজ অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছি যেটা আমার নেওয়া উচিত হয়নি। অথবা কোনও ইন্টারভিউতে এমন কথা বলেছি যেটা আমার বলা উচিত হয়নি। এমন কিছু ঘটালেই একটা বকুনি আসত। সেই বকুনিগুলো মিস করি।

পেশাগত এবং ব্যক্তিগত জীবনে যখন একটু কঠিন সময় আসে, মানে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছি, সেই সময় মিস করি একটা মানুষকে। যাকে ফোন করলেই প্রথমে একটা ইলাবরেট ডিসকাশন হত। রিজনিং করে করে আর কি…এবং তার পর একটা প্রোবাবল সলিউশন আসত। নিশ্চিত ভাবে আসত। কোনও না কোনও রকমের একটা সমাধানসূত্র। সেটা মিস করি, সেই জায়গাটা মিস করি। আর কাউকে সে ভাবে পাইনি, অথবা খুঁজিনি। কোনও একটা হবে।

আর অভিনেত্রী হিসেবে ভাল স্ক্রিপ্ট মিস করি। আমি নিজে ঋতুদাকে বলেছি একাধিক বার, তুমি কিন্তু ভাল চিত্রপরিচালক। তার থেকেও অনেক ভাল চিত্রনাট্যকার। ওই রকম চিত্রনাট্য হাতে পেলে, মানে অন্য কোনও পরিচালককে দিয়ে দিলেও বোধহয় সে একটা দারুণ ছবি বানিয়ে ফেলতে পারবে যে কোনও সময়। এত সুন্দর চিত্রনাট্য ভাবাই যায় না। প্রত্যেকটা চরিত্র খুব সুন্দর ভাবে সাজানো, খুব সুন্দর ভাবে আঁকা। প্রত্যেকটার ব্যাকড্রপ আলাদা। ব্যাকগ্রাউন্ড আলাদা। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা আলাদা, ভাষা আলাদা, সেন্স অব হিউমার আলাদা। মানে এতগুলো আলাদা রকমের মানুষকে একটা মানুষ কী ভাবে সৃষ্টি করতে পারে এত সুন্দর করে, সৃষ্টি তো অনেকেই করেন। যে কোনও নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার সবাই করেন। কিন্তু এত সুন্দর করে ছবিগুলো আঁকা চরিত্রের, কী করে যে সম্ভব হত আমি জানি না।


‘ওর মধ্যে যে কতগুলো সত্ত্বা কাজ করত, এটা যে কী করে একটা মানুষের মধ্যে সম্ভব আমি জানি না।’

অভিনেত্রী হিসেবে মনে হয় ও রকম চিত্রনাট্য আর পাব না। ঋতুপর্ণ অ্যাজ আ হোল যে আর পাব না, সেটা বেশ ব্যথা দেয়। ঋতুদা এমন একটা মানুষ ছিল, ঋতুদা চলে যাওয়ার সময় কয়েক হাজার মানুষের মনে হয়েছিল আমার খুব কাছের মানুষ চলে গেল। এইটা একটা অদ্ভুত জিনিস। একটা মানুষ তো গুটিকতক মানুষেরই কাছের মানুষ হন। বাকিরা দূর থেকে দেখেন। বিশেষ করে ঋতুপর্ণ ঘোষ যে জায়গায় ছিলেন সেই জায়গা থেকে বাকিদের তো দূর থেকেই দেখার কথা। কিন্তু আমার কী রকম মনে হয়েছিল, বহু মানুষ একই সময় মনে মনে ভাবছে যে আমার খুব কাছের মানুষকে হারালাম। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার ছিল ঋতুদার। সে কখনও ভাই, কখনও দাদা, কখনও বোন, কখনও মা, কখনও বন্ধু, কারও গার্জিয়ান, কারও ছেলে, কারও হয়তো বান্ধবীও। ওর মধ্যে যে কতগুলো সত্ত্বা কাজ করত, এটা যে কী করে একটা মানুষের মধ্যে সম্ভব আমি জানি না। সম্ভব তো বটেই। সেটা তো তিনি নিজের জীবনে দেখিয়ে দিলেন, এটাও সম্ভব। এটা একটা অন্য ব্যাপার। সে জন্যই তো ঋতুপর্ণ ঘোষ একটাই হয়, এক বারই হয়। বার বার হয় না।

আরও পড়ুন, আমার মধ্যেও তো একটা ঋতু বেঁচে আছে!

কিছু দিন আগে দিলীপদার সঙ্গে দেখা হল। ওড়িশায় শুটিং করতে গিয়ে। দিলীপদা ছিলেন ঋতুদার ডান হাত। সেটা যাঁরা ঋতুদাকে চিনতেন, সকলে জানেন। সকালবেলা চোখ খোলা থেকে রাতের বেলা চোখ বন্ধ পর্যন্ত সারা ক্ষণ ঠিক পাশেই যিনি থাকতেন তাঁর নাম দিলীপদা। ন্যাচারালি ঋতুদা চলে যাওয়ার পর দিলীপদা ওড়িশায় ফিরে গিয়েছেন। উনি ওঁর বিশ্বাস থেকে, ওঁর জায়গা থেকে আমাকে যা বললেন শুনে ভারী অদ্ভুত লাগল। সারা পৃথিবীর মানুষ যাঁকে চেনেন, যাঁর এত গুণগ্রাহী, সাধারণ মানুষ যাঁকে এত উঁচু আসনে বহাল করে রাখেন, দিলীপদার মতো একটা লোক যাঁকে হয়তো কেউ চিনবেনও না, জানবেনও না। তাঁর অস্তিত্বের কথা সাধারণ দর্শক, শ্রোতা, পাঠক হয়তো জানেন না, দিলীপদারও ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত সবটাই ঋতুদাকে ঘিরে ছিল। দাদা বলতে অজ্ঞান। দাদাও দিলীপ বলতে অজ্ঞান।


ঋতুপর্ণ পরিচালিত ‘বাড়িওয়ালি’ ছবির দৃশ্যে সুদীপ্তা এবং কিরণ খের।

সেই দিলীপদা আমাকে বলছিলেন, ঋতুদা চলে যাওয়ার পরে যখন দেশের বাড়িতে ফিরে যান, কয়েক রাত ভাল করে ঘুমতে পারেননি। চারপাশে শুধু দাদাকেই দেখতেন। তার পর লোকাল পুরোহিতের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে জানতে পারেন, ঋতুদার ঠিকঠাক ভাবে পারলৌকিক ক্রিয়া করা প্রয়োজন। না হলে দিলীপদাকে ছেড়ে ঋতুদা যাচ্ছেন না কিছুতেই। তার পর সেই পুরোহিতের কথামতো ওদের বাড়ির সামনের বাগানে পিণ্ডদান করে রাতের বেলা একটা নির্দিষ্ট সময়ে বলেছিলেন পুরোহিত, সে সময় আর পিছন ঘুরে তাকাতে বারণ করেছিলেন। পিছন ফিরে না তাকিয়ে ঘরে চলে যান দিলীপদা। তার পর থেকে দিলীপদা খানিকটা শান্তি পেয়েছেন।

আরও পড়ুন, একার লড়াই চালাতেন ঋতুপর্ণ, যে লড়াইয়ের পরে আলো আসে

এ বার হতে পারে এটা অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার। সেই সম্ভাবনাটা আমি বাতিল করে দিচ্ছি না। কিন্তু যেটা বলছি, ঋতুদার আত্মীয় বলতে তো শুধুই চিঙ্কুদা, ইন্দ্রনীল ঘোষ। আর্ট ডিরেক্টর। ঋতুদার প্রায় সব ছবিতেই যিনি শিল্প নির্দেশক ছিলেন। এখন আরও অনেক ছবির শিল্প নির্দেশক। খুব কাছের সম্পর্ক বলতে তো চিঙ্কুদা এবং ওঁর স্ত্রী। আর তো কেউ ছিল না। অথচ দিলীপদার ওপরে এই জিনিসটা হয়েছে শুনে আমি অবিশ্বাস করিনি। বরং ভেবেছি, সত্যিই এক একটা মানুষের জীবনে আর একটা মানুষের কী ভাবে অবদান থেকে যায়…। হতে পারে দিলীপদা তাঁর কুসংস্কার বা অন্ধ বিশ্বাস থেকে এটা বিশ্বাস করেছিলেন যে দাদা তাঁকে ছেড়ে যাচ্ছেন না এবং পারলৌকিক ক্রিয়া করার পরই দাদার অতৃপ্ত আত্মা তৃপ্ত হয়ে ফাইনালি তাঁকে ছেড়ে গেলেন। হয়তো সম্পূর্ণ এটা তাঁর মনে মনে গড়া একটা ভাবনা। কিন্তু অদ্ভুত, দিলীপদা মানুষটা হঠাত্ করে ইররেলিভেন্ট হয়ে গেলেন। দিলীপদার জীবনটাও ফাঁকা হয়ে গেল। অথচ দিলীপদা না থাকলে ঋতুদাই যে কী ভাবে থাকত, তা কল্পনার বাইরে। ঋতুদাকে নিয়ে অবিচুয়ারিতে আমরা অনেক কথা বলি। কিন্তু দিলীপদার কথা হয় না। তাই মনে হল, এই সুযোগে দিলীপদার কথা বলি। দিলীপদার জীবনটাও খালি হয়ে গেল। ভাবলে খুব কষ্ট হয়।

(সেলেব্রিটি ইন্টারভিউ, সেলেব্রিটিদের লাভস্টোরি, তারকাদের বিয়ে, তারকাদের জন্মদিন থেকে স্টার কিডসদের খবর - সমস্ত সেলেব্রিটি গসিপ পড়তে চোখ রাখুন আমাদের বিনোদন বিভাগে।)

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন