×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৯ জুলাই ২০২১ ই-পেপার

বিনোদন

মৃত্যু নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা, এই বিখ্যাত ভিলেনকে প্রাপ্য সম্মানই দেয়নি বলিউড

নিজস্ব প্রতিবেদন
০৩ অগস্ট ২০২০ ০৯:০০
কেরিয়ারে একটা খলনায়কের চরিত্র না পেলে জাতে ওঠা যায় না। ননফিল্মি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এলেও, আজকাল এ কথার গুরুত্ব বোঝেন সব অভিনেতাই। তাই নায়ক হতে এসেও বার বার খলনায়কের চরিত্র বেছে নিয়েছেন অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান থেকে রাজকুমার রাও, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকিরা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বলিউডে খলনায়কের সংজ্ঞাও বদলে গিয়েছে। শুধুমাত্র নায়কের হাতে মার খাওয়ার জন্য আর ছবিতে খলনায়ক রাখা হয় না। বরং ছবির গল্পই আবর্তিত হয় তাঁদের ঘিরে। অভিনেতা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার সমান সুযোগ পান তাঁরাও।
Advertisement
কিন্তু একটা সময় ছিল যখন সিলভার স্ক্রিনে মাত্র কয়েকটা দৃশ্যেই দেখা যেত খলনায়ক। আর তাতেই বুকে কাঁপুনি ধরে যেত। তাঁদের সাজগোজ, হাঁটাচলা, চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিত রাতের ঘুমও। সত্তর ও আশির দশকে যাঁদের পর্দায় দেখে দর্শকদের এমন অবস্থা হতো, তাঁদের অন্যতম হলেন মানিক ইরানি। কিন্তু বলিউড তাঁকে মনে রাখেনি।

পার্সি পরিবারে জন্মেছিলেন মানিক। তাঁর পরিবার, ছোটবেলা এমনকি পরবর্তী জীবন সম্পর্কেও বিশেষ কিছু জানা নেই কারও। মায়ানগরীর কেউ কেউ অমিতাভ বচ্চনের স্টান্ট ডাবল হিসেবে চেনেন তাঁকে। দর্শক তাঁকে চেনেন কয়েকটি ছবির দৌলতে। কিন্তু চেহারা এবং স্ক্রিন প্রেজেন্সে নায়কদের টক্কর দেওয়ার রীতি মানিকের হাত ধরেই চালু হয়েছিল বলিউডে।
Advertisement
ছ’ফুটের বেশি লম্বা, স্বাস্থ্যবান মানিক স্টান্টম্যান হিসেবে বলিউডে যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তী কালে কখনও খলনায়ক, কখনও বা খলনায়কের ডানহাত হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেন। তবে এর পাশাপাশি একাধিক ছবিতে পরিচালকের সহযোগী হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি, যার মধ্যে অন্যতম হল আমির খান অভিনীত ‘দিওয়ানা মুঝসা নেহি,’ মিঠুন চক্রবর্তীর ‘জিন্দগানি’ এবং অনিল কপূরের ‘সাহেব’।

১৯৭৪ সালে ‘পাপ অউর পূণ্য’ ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে পা রাখেন মানিক ইরানি। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘কালিচরণ’, ‘ফরিস্তে’, ‘খলফ,’ ‘ফেইথ’, ‘মস্ত কলন্দর’, ‘ত্রিনেত্র’, ‘চোর পে মোর’, ‘হম সে না টকরানা’, ‘নাকা বন্দি’, ‘বাপ নম্বরি বেটা দশ নম্বরি,’ ‘তকদির কা তামাশা,’ ‘রোটি কি কীমত,’ ‘পুরানি হাভেলি’, ‘তুফান’, ‘ইনসাফ’, ‘দাদাগিরি’, ‘মর্দ’ এবং ‘মিস্টার নটবরলাল’ ছবিতে অভিনয় করেছেন।

‘মিস্টার নটবরলাল’ ছবিতে বোবা খুনির চরিত্রে অভিনয় করেন মানিক। ছবিতে নিজের চরিত্রটি এমন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি যে, সেই সময় রাস্তাঘাটে তাঁকে দেখলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভয়ে মুখ ঢাকত। মানিকের সুন্দর-সুঠাম চেহারা দেখে নায়করা পর্যন্ত হিংসে করতেন।

শোনা যায়, এক বার সুনীল শেট্টির কাছে কাজ চাইতে গিয়েছিলেন মানিক। কিন্তু ছবিতে সুযোগ দেওয়ার বদলে মানিককে স্টান্ট ডিরেক্টর হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন সুনীল। তার পর একাধিক ছবিতে অ্যাকশন দৃশ্যের পরিচালনা করেছেন মানিক।

শুধু তাই নয়, ১৯৭৮ সালে যে ছবির হাত ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষ পৌঁছে যান অমিতাভ বচ্চন, সেই ‘ডন’ ছবিতে অমিতাভের স্টান্ট ডাবল ছিলেন মানিক। ছবিতে যত মারপিটের দৃশ্য ছিল, তাতে অমিতাভের বেশে আসলে মানিকই ছিলেন। ‘ডন’ ছবির মারপিটের দৃশ্যগুলি অত্যন্ত জনপ্রিয়। তার জন্য সমালোচকরা প্রশংসায় ভরিয়ে দেন অমিতাভকে। কিন্তু মানিককে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও কৃতিত্ব দেওয়া হয়নি বলে মনে করেন অনেকেই।

‘কালিচরণ’ ছবিতে মানিককে দেখে এত পছন্দ হয়েছিল যে, ১৯৮৩ সালে ‘হিরো’ ছবিতে তাঁকে সুযোগ দেন পরিচালক সুভাষ ঘাই। সেই ছবির সূত্রেই ‘বিল্লা’ নামে পরিচিতি পান মানিক। আজও পিতৃপ্রদত্ত নামের চেয়ে বিল্লা হিসেবেই তাঁকে চেনেন দর্শক।

কিন্তু তার পরেও সে ভাবে বলিউডে সুযোগ পাননি মানিক। শোনা যায়, খলনায়কের চরিত্র পেলেও নায়কদের সঙ্গে টক্কর দিতে কড়া অধ্যাবসায় ছিল মানিকের। নিয়মিত জিমে যেতেন তিনি। তা দেখে নিজেদের বদলে ফেলতে শুরু করেন সঞ্জয় দত্ত, সানি দেওলরাও। শরীরচর্চা করে তাঁরাও সুঠাম দেহ তৈরি করতে শুরু করেন।

এর ফলে ধীরে ধীরে পেশীশক্তি প্রদর্শনের জন্য খলনায়কের প্রয়োজন ফুরোতে থাকে বলিউডে। তাই তথাকথিত ‘মাচো ভিলেনদের’ জন্য ছবির অফার কমতে শুরু করে। তাই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করতে চাইলেও, মানিকের সেই ইচ্ছে পূরণ হয়নি।

এক দিকে একের পর এক কাজ হাতছাড়া হয়ে যাওয়া, সেইসঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের ওঠাপড়া, দুইয়ে মিলে ক্রমশ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয় মানিককে। একমাত্র সন্তানের মৃত্যু মেনে নিতে না পেরে মদ্যপানের নেশা পেয়ে বসে এই অভিনেতাকে। সারা ক্ষণ নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন তিনি। ১৯৯২ সালে ‘দিদার’ ছবিতে শেষ বার দেখা গিয়েছিল তাঁকে।

এর কয়েক বছর পর মানিকের মৃত্যু হয়। তবে ঠিক কবে তিনি মারা যান, তা আজও জানা যায়নি। তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। শোনা যায়, স্টান্ট করতে গিয়ে একটি ছবির সেটেই তাঁর মৃত্যু হয়। কেউ কেউ আবার বলেন, আত্মঘাতী হয়েছিলেন মানিক। মদ্যপানই তাঁকে শেষ করে দিয়েছে, এমন কথাও শোনা যায়। তবে নিশ্চিত ভাবে কিছুই জানা যায়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের স্মৃতি থেকে যেমন মুছে গিয়েছেন মানিক, বলিউডও তাঁকে ভুলে গিয়েছে।