কেব্ল লাইনের ব্যবসা থেকে শুরু, তার পর টলিউডের ‘সর্বেসর্বা’! ‘গুপি শুটিং’-এর প্রবক্তা, ইন্ডাস্ট্রিতে কী কী অবদান স্বরূপ বিশ্বাসের
তৃণমূল আমলের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই, একটা সময়ে এটাই ছিল স্বরূপ বিশ্বাসের পরিচয়। কিন্তু, সময় যত এগিয়েছে, নিজের ‘গুণ’-এ টলিউডে নিজস্ব জায়গা করে নিলেন স্বরূপ। হলেন টলিপাড়ার ‘সর্বেসর্বা’। ফেডারেশনের সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত হলেন স্বরূপ। তাঁর আমলে শুরু হল টলিপাড়ায় একের পর এক নিয়ম। কখনও শোনা গেল ‘ব্যান কালচার’-এর কথা। কখনও আবার শোনা গেল ‘গুপি শুটিং’-এর মতো শব্দবন্ধ।
২০১১ সালের আগে থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী ছিলেন স্বরূপ। তবে কোনও পদ পাননি। মূলত টালিগঞ্জ অঞ্চলে কেব্ল লাইনের ব্যবসা ছিল তাঁর। শোনা যায়, অটো ইউনিয়নের সঙ্গে নাকি যুক্ত ছিলেন তিনি। এ ছাড়া সুরুচি সঙ্ঘ ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। এই ক্লাবের পুজোকে এত কাল সাধারণ মানুষ অরূপ বিশ্বাসের পুজো বলেই চিনতেন। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাধারণত এই পুজো দিয়েই উদ্বোধন শুরু করতেন। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে স্বরূপের দাদা পেলেন মন্ত্রিত্ব। প্রভাব বাড়ল স্বরূপের।
২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পরে টলিপাড়ার ‘রং’ও বদলে যায়। সেখানেই ফেডারশনের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হন স্বরূপ। মূলত টলিপাড়ার টেকনিশিয়ানদের হিতার্থে নানা ধরনের জনমোহিনী প্রকল্প আনেন। পাশাপাশি একগুচ্ছ নিয়মে বেঁধে দেন ইন্ডাস্ট্রিকে। ছবি হোক কিংবা ওটিটি, প্রয়োজন থাকুক কিংবা না থাকুক— একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক টেকনিশিয়ান নিয়েই কাজ করতে হবে প্রত্যেক পরিচালক বা প্রযোজককে।
নিয়ম যেমন ছিল, তেমনই সেই নিয়ম ভেঙেও ছিলেন কেউ কেউ। এ যেন ‘বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো’। ২০২৪ সাল, পরিচালক রাহুল মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ আনেন স্বরূপ। রাহুল নাকি ‘গুপি শুটিং’ করেছেন। যদিও তাঁর আগে ‘গুপি শুটিং’-এর অর্থ সে ভাবে জানা ছিল না টলিউডের। স্বরূপের অভিযোগ ছিল, রাহুল কাউকে কিছু না জানিয়েই বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েক জন কলাকুশলীকে নিয়ে শুটিং করে এসেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে সুর চড়ান স্বরূপ। তার পরেই টলিপাড়ার পরিচালক-প্রযোজকরা একজোট হন। শুরু হয় কর্মবিরতি।
টেলিভিশন থেকে সিনেমা কিংবা ওটিটি, তিন মাধ্যমের প্রযোজক-পরিচালকেরা একজোট হন। বেনজির পরিস্থিতি তৈরি হয় টলিপাড়ায়। তালিকায় ছিলেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, দেব-সহ অনেকেই। ছোটপর্দার পরিচালক সৃজিত রায়ের কাজেও কোপ পড়ে সেই সময়ে। সেটে তৈরি হয়ে অপেক্ষায় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা, কাজে আসেননি কলাকুশলীরা। টলিপাড়া তখন রাতারাতি বিভক্ত হল দুই ভাগে। এক দিকে পরিচালক-প্রযোজকেরা, অন্য দিকে কলাকুশলীরা। ‘দাদা’র নির্দেশ ছাড়া কলাকুশলীরা তখন একচুল এ দিক ও দিক করতে রাজি ছিলেন না।
আরও পড়ুন:
শুটিংয়ে গড়ে ১২০ জন কলাকুশলী নিয়ে কাজ করতে হবে। তার কম লোক নিয়ে শুটিং হলেই সেটিকে ‘গুপি শুটিং’-এর আওতায় ফেলা হত। তবে টলিপাড়ায় এত জন কলাকুশলী নিয়ে ছবি করা বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়ায় স্বাধীন ছবির পরিচালকদের কাছে। ফলে বাংলায় স্বতন্ত্র ছবির সংখ্যা কমতে শুরু করল। অভিযোগ ওঠে, বাংলা থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করেছেন বিদেশের প্রযোজকেরা। এমনকি মুখ ফেরায় মুম্বইয়ের প্রযোজনা সংস্থাগুলিও।
ফেডারেশনের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওয়েব প্ল্যাটফর্ম ‘চরকি’ কলকাতা থেকে চলে গেল। স্বরূপ ওরফে ফেডারেশনের দাবি, বাংলাদেশ হল ‘বিদেশ’। তাই এখানকার টেকনিশিয়ানরা তাদের হয়ে কাজ করার জন্য চার গুণ বেশি অর্থ নেবেন। ‘চরকি’ সেই টাকা দিতে রাজি হয়নি। স্বরূপের একগুচ্ছ নিয়মের কারণে বাংলা সিনেমাও ধীরে ধীরে পড়ল আর্থিক ক্ষতির মুখে। যার পরিমাণ নাকি প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।
তবে শুধু বাইরের পরিচালক-প্রযোজকেরাই নন, স্বরূপের সঙ্গে সমস্যা শুরু হয় টলিপাড়ার পরিচালকদেরও। তাঁর বিরুদ্ধে এক সময় সুর চড়ান পরমব্রত, অনির্বাণ, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়েরা। পরে অবশ্য সমাজমাধ্যমে ক্ষমা চাইতে হয় কৌশিক-পরমব্রতদের। কারণ, টলিপা়ড়ায় নাকি অলিখিত ফতোয়া জারি করা হয় যে, ফেডারশনের কাছে ক্ষমা না চাইলে, মিলবে না কাজ!
বিদ্রোহী পরিচালকদের মধ্যে অনেক আগেই ক্ষমা চেয়ে নেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। তার প্রায় বছর ঘোরার পরে সমাজমাধ্যমে ক্ষমা চান পরমব্রত। যদিও ২০২৬ সালে সরকার বদলের পরে তিনি বলেন, ‘‘সদ্যোজাত সন্তানের মুখ চেয়ে ক্ষমা চাইতে হয় আমাকে।’’ তবে ক্ষমা চাননি অনির্বাণ ভট্টাচার্য বা ঋদ্ধি সেন। যার ফলে গত দু’বছর ধরে তেমন কাজও পাননি তাঁরা। ইন্ডাস্ট্রি পরিচিত হয় ‘ব্যান কালচার’-এর সঙ্গে।
আরও পড়ুন:
যদিও এই ‘নিষিদ্ধ’ প্রথার প্রতিবাদ করেছিলেন প্রযোজক-অভিনেতা তথা তৃণমূলের সাংসদ দেব। শুধু প্রতিবাদই করেননি, প্রায় দু’বছরের মাথায় অনির্বাণকে নিয়ে ছবি করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ছবির নাম ‘দেশু ৭’। স্বরূপের ফতোয়া না মেনে নিজের ছবিতে অনির্বাণকে নেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে স্বরূপের কাছে অনির্বাণের হয়ে ক্ষমাও চান দেব।
যদিও তাতে চিড়ে ভেজেনি। মন গলেনি স্বরূপের। সেই সময়ে ফেডারেশনের সভাপতি যুক্তি দেন, “আমাদের, অর্থাৎ ফেডারেশনে এসে সরাসরি কেউ কিন্তু কিচ্ছু জানাননি। কে বা কারা অনির্বাণকে সমর্থন জানাচ্ছেন, সেটা কিন্তু সংবাদমাধ্যমের মারফত জানছি।” নিজের কাজ প্রসঙ্গে খোদ অনির্বাণ যদিও নীরব ছিলেন বরাবর। সে কথাও জানাতে ভোলেননি তৎকালীন ফেডারেশন সভাপতি।
তবে শুধু অনির্বাণই নন, স্বরূপের রোষের মুখে পড়তে হয় বাংলাদেশের খ্যাতনামী অভিনেতা শাকিব খানকেও। কলকাতায় ‘প্রিন্স’ ছবির শুটিং করতে চেয়েছিলেন শাকিব। শেষমেশ সেই শুটিং তাঁকে তিন গুণ টাকা দিয়ে করতে হয়েছিল বলে খবর। টেকনিশিয়ানদের নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের তিন গুণ বেশি দিতে হয় বলে অভিযোগ প্রযোজক শিরিন সুলতানার। যদিও প্রথমে স্বরূপ নাকি দেড় গুণ পারিশ্রমিক চেয়েছিলেন, তাতে রাজিও হন প্রযোজক। অভিযোগ, তার পরেই নাকি তিন গুণ বেশি পারিশ্রমিকের দাবি করে বসেন তিনি।
এখানেই শেষ নয়। দুই দেশের কাজ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে স্বরূপই নাকি প্রযোজককে প্রস্তাব দেন শাকিবের সঙ্গে বৈঠক করার। রাজি হন শাকিব। নির্দিষ্ট দিনে শাকিবকে নিয়ে সুরুচি সঙ্ঘে উপস্থিত হন প্রযোজক। তখন স্বরূপ নাকি অন্য কাউকে দিয়ে খবর পাঠান যে, তিনি জরুরি বৈঠকে ব্যস্ত। ফিরিয়ে দেন শাকিবকে! এখানেই শেষ নয়। শিরিনের আরও অভিযোগ, “এর পরেই স্বরূপবাবু হঠাৎ একদিন ফোন করে জানান, তিন গুণ বেশি পারিশ্রমিক দিতে হবে টেকনিশিয়ানদের। না হলে কাজ বন্ধ।”
২০২৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে পালাবাদল হয়েছে। নতুন সরকার এসেছে। ২০২৫ সালেই ফেডারশনের সভাপতি হিসাবে কার্যকাল শেষ হয়েছিল স্বরূপের। তবু ‘দায়িত্ব’ সামলাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু, সরকার বদলের পরে নিজের পদ থেকে ইস্তফা দেন স্বরূপ। তার কিছু দিন পরেই গ্রেফতার হলেন।
শুধু স্বরূপের কর্মজীবনই নয়, পদহীন হওয়ার পরে আতসকাচের নীচে আসে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও। তিনি ইস্তফা দেওয়ার পরে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করেন তাঁর স্ত্রী জুঁই বিশ্বাস। সম্প্রতি টালিগঞ্জের নব নির্বাচিত বিধায়িকা পাপিয়া অধিকারী ফেডারেশনকে ভেঙে কনফেডারেশনের ঘোষণা করেন। তাঁকে পুষ্পস্তবক দিয়ে সম্বর্ধনা জানান জুঁই।
এক মহিলা রূপটানশিল্পীর অভিযোগের ভিত্তিতে ৪ জুন নিউ আলিপুর থানা গ্রেফতার করে স্বরূপকে। অভিযোগকারিণী এর আগেও স্বরূপের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিলেন রিজেন্ট পার্ক থানায়। সমাজমাধ্যমে এসে উগরে দিয়েছিলেন ক্ষোভ। নতুন রাজ্য সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরে বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ বৈঠক করেছিলেন কলাকুশলীদের সঙ্গে। সেই সময়েও তিনি জানিয়েছিলেন যে, গত দু’বছর ধরে তিনি কাজ পাননি। এ কথা মেকআপ গিল্ডের সম্পাদক বাপি মালাকারকে জানিয়েছিলেন।
কোনও সাড়া না পেয়ে বাপির নামে ওই রূপটানশিল্পী লিখিত অভিযোগ জানান স্বরূপের কাছে। এর পরেই নাকি ক্রমাগত খুনের হুমকি পেতে থাকেন অভিযোগকারিণী। তাঁকে আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ভয়ও দেখানো হয় বলে অভিযোগ তাঁর। আপাতত তদন্ত চলছে স্বরূপের ‘কীর্তি’র।