×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৭ মার্চ ২০২১ ই-পেপার

বিনোদন

দুরারোগ্য ক্যানসারও দমিয়ে রাখতে পারেনি, মনের জোরেই শুটিংয়ে ফিরেছেন এই অভিনেত্রী, কী ভাবে?

নিজস্ব প্রতিবেদন
কলকাতা ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৬:১৮
দুরারোগ্য অসুখ এক সময় স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল তাঁর জীবনের পথ। লড়াই করলেও ফিরতে পারবেন কি না সে চিন্তা কুরে কুরে খাচ্ছিল পরিবার-পরিজন সকলকেই। দিনরাত বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিজের মেক আপ ভ্যান, শুটিং ফ্লোর, স্বামী ও ছেলের কথাই ভাবতেন নব্বইয়ের দশকে পুরুষহৃদয়ে কাঁপন ধরানো এই অভিনেত্রী।

যদিও তাঁর তীব্র প্রাণশক্তি ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মেনেছে ক্যানসার। মনের জোর ও সাহসকে অবলম্বন করে ক্যানসার জয়ীদের তালিকায় এখন উঠে এসেছে তাঁর নামও। তিনি সোনালি বেন্দ্রে। যাঁর দুরন্ত কামব্যাক বেঁচে থাকার রসদ জোগাতে পারে বিশ্বের সব ক্যানসার আক্রান্তকেই।
Advertisement
হাই গ্রেড মেটাস্টেসিস ক্যানসার শরীরে বাসা বেঁধেছে। এ কথা প্রকাশ্যে এল ২০১৮-য়। নিজেই টুইট করে জানালেন তা। খবর আসতেই পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছিল সোনালি বেন্দ্রের। নিউ ইয়র্কে উড়ে গিয়েছিলেন সত্বর। চিকিৎসা চলাকালীনই প্রথম ক্যানসারের খবর কী ভাবে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে দুরমুশ করে দিয়েছিল, সে কথাও জানিয়েছিলেন এক টিভি শো-য়ে। “ক্যানসার হয়েছে শুনে আমি সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। শুধু কেঁদেছি। আর ভেবেছি, কেন আমার সঙ্গেই এমনটা হল?”

১৯৭৫-এর ১ জানুয়ারি মুম্বইয়ের এক মরাঠা পরিবারে জন্ম হয় সোনালির। ছোটবেলা থেকেই নাচ-গান ও অভিনয়ের প্রতি অদম্য টান ছিল তাঁর। মুম্বইয়ের কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় ও ঠাণের হলি ক্রস কনভেন্ট থেকে স্কুলের পাঠ শেষ করে মুম্বইয়ের রামনারায়ণ রুজা কলেজ থেকে স্নাতক হন।
Advertisement
স্কুল শেষ করার পর থেকেই মডেলিং করতে শুরু করেন সোনালি। কেরিয়ার মডেলিং দিয়ে শুরু হলেও এই সময়ই টুকটাক কিছু বিজ্ঞাপনী ছবিতেও কাজের অফার আসতে থাকে।

তাঁর ক্যামেরার সামনে সপ্রতিভ আচরণ, অভিনয় দক্ষতার জেরে মাত্র ১৯ বছর বয়সেই চিত্রপরিচালক কে রবিশংকরের নজরে আসেন তিনি। ১৯৯৪-তে মুক্তি পায় ‘আগ’। সেখানে গোবিন্দা ও শিল্পা শেট্টির সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেন সোনালি। এই ছবিই তাঁকে এনে দিল সেরা নতুন মুখের পুরস্কার। এর পর পরই আসতে থাকে বলিউডি ও দক্ষিণী নানা ছবির অফার।

১৯৯৬-এ মাইকেল জ্যাকসন যখন ভারতে আসেন, তখন তাঁকে স্বাগত জানাতে বলিউডের পক্ষ থেকে ভার দেওয়া হয় সোনালিকে। তত দিনে ‘রক্ষক’, ‘ইংলিশ বাবু দেশি মেম’, ‘আপনে দম পর’, ‘সপুত’-এর মতো ছবি। প্রতিটি ছবির টাইটেল কার্ডেই নতুন এই নায়িকার নাম যোগ করত আলাদা আবেদন।

‘‘নব্বইয়ে সোনালি বেন্দ্রে মানেই যেন এক আলাদা আবেদন! ‘নরাজ’, ‘জখম’, ‘অঙ্গারে’ এ সব চবি তো চলতই সোনালির নামে। সবেতেই যে সে নায়িকা ছিল এমন নয়, কিন্তু তাঁর অভিনয়ের প্রসাদগুণে অনেক তাবড় অভিনেত্রীর সঙ্গেও পাল্লা দিতে পারতেন। এক সহজাত সৌন্দর্যও ছিল, যা নয়নাভিরাম।’’— সোনালি বেন্দ্রের অভিনয় নিয়ে এখনও মুগ্ধ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।

১৯৯৯-এ দুই তামিল ছবি ‘কধালার ধিনাম’ ও ‘কান্নোদু কানবাথেলাম’-এ অভিনয় করেও দক্ষিণী ছবির দুনিয়ায় বেশ নাম করেন। এর পর ২০০০-এ ‘চল মেরে ভাই’-তে তাঁর ক্যামিও চরিত্রটিও সিনেমাপ্রেমীদের মন কাড়ে। ‘হমারা দিল আপকে পাশ হ্যায়’ ছবির জন্য সেরা সহঅভিনেত্রীর পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হন।

শুধু হিন্দি ও তামিল নয়, ২০০১-এ তেলুগু ছবির ডেবিউ করেন সোনালি। তেলুগু ফিল্ম-ইতিহাসে এই ‘মহেশ বাবু’ ছবিটি আজও বিখ্যাত।

শুধু বড়পর্দাই নয়, টেলিদুনিয়াতেও সোনালি ঢুকে পড়েন ২০০১-এ। এক বেসরকারি চ্যানেলের নাচের রিয়েলিটি শো সঞ্চালনার কাজ দিয়েই শুরু হয় তাঁর টেলিদুনিয়ার ডেবিউ। এর পর গান ও নানা প্রতিভার ট্যালেন্ট হান্ট শো-এর সঞ্চালক ও বিচারক হিসেবে সোনালিকে দেখা গিয়েছে।

মাঝে ২০০২-এ বহু দিনের বন্ধু পরিচালক গোল্ডি বেহলকে বিয়ে করেন সোনালি। ২০০৪-এ জন্ম নেয় তাঁদের পুত্রসন্তান। এই সময় সংসার সামলে ছেলেকে একটু বড় করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন সোনালি। পরে ২০১২-তে অক্ষয় কুমারের বিপরীতে ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বই দোবারা’ ছবিতে কামব্যাক করেন সোনালি। তার পর থেকে ২০১৭ রপর্যন্ত ফিল্ম ও টেলিফিশন নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন এই জনপ্রিয় নায়িকা। রোমান্স, অ্যাকশন এবং কমেডি মিলিয়ে ইতিমধ্যেই প্রায় পঞ্চাশটিরও বেশি বলিউডি ছবিতে অভিনয় করে ফেলেছেন সোনালি।

বাধ সাধল ক্যানসার। ২০১৮-র পর জীবনের এই কঠিন অধ্যায়েও এতটুকু মনোবল হারাননি তিনি। পাশে পেয়েছিলেন গোটা পরিবারকেই। নিউ ইয়র্কে চিকিত্সা চলাকালীন সোনালির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন একাধিক বলিউড তারকা। কখনও প্রিয় বন্ধু সুজান খান বা গায়ত্রী জোশীর সঙ্গে ছবি শেয়ার করেছিলেন সোনালি। কখনও বা অনুপম খের, প্রিয়ঙ্কা চোপড়াদের দেখা গিয়েছে সোনালির সঙ্গে। তাঁর হার না মানা মানসিকতাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন সকলে।

ক্যানসারের কেমোথেরাপি কেড়ে নিয়েছিল সোনালির মাথার চুল। কিন্তু সে অবস্থাতেও প্রকাশ্যে এসেছেন তিনি। নিজেকে লুকিয়ে রাখেননি। বরং সাহস দিয়েছেন অন্যদেরও। তাঁকে দেখে যাতে অন্য ক্যানসার আক্রান্তেরা সাহস সঞ্চয় করতে পারে, সেই চেষ্টাই করেছেন প্রতিদিন। সোনালির এমন ভূমিকাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন সকলে।

পুরোপুরি সুস্থ না হলেও একটু ভাল হতেই শুটিং ফ্লোরেও ফিরেছেন তিনি। ‘অনেক কিছু ঘটে যাওয়ার পর সেটে ফিরলাম।… কাজে ফিরতে পেরে ভাল লাগছে। ফিরতে পেরে কেমন লাগছে সেটা বলে বোঝাতে পারব না। কাজেই তো ফিরতে চেয়েছিলাম।…’ ফিরে এসেও রাখঢাক না করেই সোশ্যাল সাইটে লিখেছেন এ কথা।

এমনকি কোমরের নীচে জল ভরা একটি ট্যাঙ্ক নিয়ে বিভিন্ন ব্যায়াম করার ছবি ও ভিডিয়ো সোশ্যাল ওয়ালে শেয়ার করেছেন সোনালি। কষ্টকর এই অ্যাকোয়া থেরাপি নিয়েও কিছুই লুকোননি। এই সময় পরিবারের সঙ্গে কাটানো কিছু মুহূর্তও ভাগ করেছেন ভক্তদের সঙ্গে। নিজেই বার বার তাঁদের সাহস জুগিয়েছেন। নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে ভয় পেতে বারণ করেছেন।

সময়মতো চিকিৎসার পাশাপাশি সোনালির এমন মনের জোর ও সাহসই তাঁকে এই বড় যুদ্ধ জয় করতে সাহায্য করেছেন বলে মনে করেন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ  সোমনাথ সরকার। ফের টিভি ও রুপোলি পর্দায় ফের দাপিয়ে ফিরে আসুন সোনালি এমনই আকাঙ্ক্ষা তাঁর তামাম ভক্তকুলের। অন্য দিকে ক্যানসার রোগীরাও তাঁর এই কামব্যাক ইনিংস দেখে নিচ্ছেন সাহস ও মনের জোরের পাঠ।

Tags: সোনালি বেন্দ্রেক্য়ানসার