×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২০ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

বিনোদন

ধারাবাহিক শেষ হতেই পর্দার স্ত্রীকে বিয়ে, শ্যুটিংয়ে ঘুমের মধ্যেই প্রয়াত হন ‘মিস্টার যোগী’

নিজস্ব প্রতিবেদন
০৪ মার্চ ২০২১ ১১:৩৮
সবথেকে বেশি নজর কেড়ে নিত তাঁর উজ্জ্বল, বাদামি একজোড়া চোখ। বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয়ে দূরদর্শনের দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। পরে কিছু ছবিতেও তাঁকে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু দর্শকদের মনে মোহন গোখলে রয়ে গিয়েছেন তীক্ষ্ণ নাক এবং টোলপড়া গাল নিয়ে ‘মিস্টার যোগী’ হিসেবেই।

পুণে শহরে মোহনের জন্ম ১৯৫৩ সালের ৭ নভেম্বর। কলেজজীবন থেকেই তিনি অভিনয়ে আগ্রহী ছিলেন। ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করে নেন মরাঠি নাটকের জগতে। নাটকে অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কৃতও হয়েছিলেন তিনি। নাটকের দলে থাকতে থাকতেই সুযোগ আসে টেলিভিশনে অভিনয়ের।
Advertisement
দূরদর্শনে প্রথম কাজ ‘শ্বেতাম্বর’ সিরিজে। এর পর ১৯৮৯ সালে ‘মিস্টার যোগী’ ধারাবাহিকে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ। ধারাবাহিকে তাঁর চরিত্রের নাম ছিল যোগেশ ঈশ্বরলাল পটেল। সেখান থেকেই বিদেশি কায়দায় পরিচয় দিতেন ‘মিস্টার যোগী’ বলে। গুজরাতি নাট্যকার মধু রাইয়ের লেখা ‘কিম্বল রেভেনসউড’ নাটক অনুসারে তৈরি হয়েছিল ধারাবাহিকটি।

ধারাবাহিকে আমেরিকা থেকে বিয়ের পাত্রী পছন্দ করতে ভারতে এসেছিলেন যোগী। ১২টি রাশির ১২ জন তরুণীর সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছিল। কিন্তু শেষ অবধি তিনি বিয়ে করেন অন্য এক তরুণীকে। মোপেড চালাতে দেখে তাঁকে পছন্দ হয়েছিল যোগীর। ঘটনাচক্রে সেই তরুণীকে বাস্তবেও বিয়ে করেছিলেন তিনি।
Advertisement
ধারাবাহিকে যোগীর স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন শুভাঙ্গী সঙ্গভী। সে সময় তাঁরা প্রণয়ের সম্পর্কে ছিলেন। যোগীর কাছে কাছে থাকবেন বলে শুভাঙ্গী রোজই আসতেন সেটে। কাজ করতেন প্রোডাকশনে। তাঁর অভিনয় করার কথা ছিলই না। কিন্তু শেষ অবধি শিকে ছিঁড়ল তাঁর ভাগ্যেই।

কেতন মেহতা চেয়েছিলেন ধারাবাহিকের নায়িকা মোপেড চালাবেন। কিন্তু যে তরুণীকে ভাবা হয়েছিল, সেই শেরনাজ পটেল শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ান। কারণ তিনি মোপেড চালানো শিখে উঠতে পারেননি। বিকল্প হিসেবে পরিচালকের পছন্দ হয় প্রোডাকশনের কাজ করা মোহনের প্রেমিকাকেই।

তবে সুযোগটা নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন শুভাঙ্গী। তাঁর মনে হয়েছিল, এর ফলে মনে হতে পারে তিনি মোহনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভাঙিয়ে সুযোগ পেয়েছেন। তবে শেষ অবধি তিনি সম্মত হন। পরে জানিয়েছিলেন, জীবনের সেই পর্বটা ছিল খুব উপভোগ্য।

মিস্টার যোগীর চরিত্র ছিল পণপ্রথার ঘোরতর বিরোধী। তবে তিনি শেষ অবধি কাকে বিয়ে করবেন, সেটা ছিল রহস্য। দর্শকরা চমকে গিয়েছিলেন ধারাবাহিকের শেষে পৌঁছে। ১৯৮৯ সালের ২ ডিসেম্বর শেষ হয়েছিল ধারাবাহিকটি। তার ৮ দিন পরে ১০ ডিসেম্বর বিয়ে করে নিয়েছিলেন মোহন এবং শুভাঙ্গী।

পরে এই একই গল্প থেকে ‘হোয়াটস ইয়োর রাশি’ ছবি তৈরি করেন আশুতোষ গোয়ারিকর। ১২টি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রিয়ঙ্কা চোপড়া। ‘মিস্টার যোগী’-র ছাড়া ছোট পর্দায় আরও বেশ কিছু ধারাবাহিকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘মিট্টি কে রং’, ‘যুগান্তর’, ‘লেখু’, ‘ভারত এক খোঁজ’, ‘যাত্রা’ এবং ‘আহট’।

মোহন অভিনয় করেছেন গুজরাতি, মরাঠি, হিন্দি এবং ইংরেজি ছবিতেও। তাঁর অভিনীত হিন্দি ছবিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘স্পর্শ’, ‘আদাত সে মজবুর’, ‘মোহন জোশী হাজির হো’, ‘হোলি’, ‘মির্চ মশালা’ এবং ‘হিরো হীরালাল’। তাঁর একটি মাত্র ইংরেজি ছবি হল ‘ডক্টর বাবাসাহেব অম্বেডকর’। ওই ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন মহাত্মা গাঁধীর ভূমিকায়।

ধারাবাহিক, ছবির পাশাপাশি চলছিল নাটকও। ‘ঘাসিরাম কোতোয়াল’, ‘মহাপুর’, ‘ডক্টর তুমহি সুধা’ তাঁর অভিনীত নাটকের মধ্যে অন্যতম। নাটকের সূত্রেই শুভাঙ্গীর সঙ্গে তাঁর আলাপ। কেতন মেটার ‘ভবানী ভবাই’ নাটকে এবং সাই পরাঞ্জপের ‘স্পর্শ’ ছবিতে মোহনের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন কলেজছাত্রী শুভাঙ্গী। শুভাঙ্গী নিজেও নাটকে আগ্রহী ছিলেন।

পরে এক সাক্ষাৎকারে শুভাঙ্গী জানান, অভিনয়ের মতো ব্যক্তিগত জীবনেও মোহন ছিলেন পরিমিত। খুব কম কথা বলতেন। এমনকি বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন খুব স‌ংক্ষিপ্ত পরিসরে। বিয়ের পরে স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় নাটকে অভিনয় চালিয়ে যান মোহন। বিজয় তেন্ডুলকরের বিখ্যাত নাটক ‘ঘাসিরাম কোতোয়াল’-এ স্ত্রীর উৎসাহেই অভিনয় করেন তিনি। পরে অডিটোরিয়ামে দর্শকাসনে বসে স্বামীর অভিনয় দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন শুভাঙ্গী।

প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও মোহন যোগ্য মর্যাদা পাননি। আক্ষেপ, তাঁর মেয়ে সখী গোখলের। সখী নিজেও একজন অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্য, মোহন অর্থের জন্য অভিনয় করতেন না। বরং অভিনয়কে ভালবেসে তিনি এই পেশায় এসেছিলেন। চেয়েছিলেন, নাটক এবং ছবি পরিচালনা করবেন। একটা মরাঠি নাটক নিয়ে দীর্ঘ দিন মহড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ অবধি নাটকের পৃষ্ঠপোষক সরে দাঁড়ান। এই ঘটনায় খুবই ভেঙে পড়েছিলেন মোহন। সেই ঘটনা এখনও মনে আছে সখীর।

তাঁর বাবা বলিউডের কোনও ‘দলের’ অংশ ছিলেন না। তাই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ পাননি। অনুযোগ সখীর। মোহন খুব খুশি হয়েছিলেন কমল হাসনের ‘হে রাম’ ছবিতে শ্রী অভয়ঙ্করের ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে। কিন্তু সেই কাজ শেষ অবধি অধরাই থেকে যায়।

১৯৯৯ সালে ‘হে রাম’ ছবির শ্যুটিংয়ের সময় চেন্নাইয়ে ঘুমের মধ্যেই মারা যান মোহন গোখলে। পরে শ্রী অভয়ঙ্করের ভূমিকায় অভিনয় করেন অতুল কুলকার্নি।

দূরদর্শনের যে কয়েক জন কুশীলব এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে মোহন গোখলে অন্যতম। অভিনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে এবং গান শুনতে ভালবাসতেন। তাঁর স্ত্রী এবং মেয়ের অভিযোগ, প্রতিভার উপযুক্ত স্বীকৃতি না পেয়েই তাঁকে চলে যেতে হয়েছে।