Advertisement
E-Paper

গায়ক তামাঙের উত্থানই ইন্ধন জুগিয়েছিল গুরুঙের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনে, পাহাড়ের রাজনীতি থেকে মুছে গিয়েছিলেন ঘিসিং

প্রশান্তের ‘ইন্ডিয়ান আইডল’ জয়ের পর মুম্বইয়ের এক রেডিয়ো জকির মন্তব্যকে ঘিরে জ্বলে ওঠে গোর্খা জাত্যাভিমান। তাঁর জয় শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যই ছিল না, তা পাহাড়বাসী গোর্খা জনগোষ্ঠীর আত্মসম্মানের প্রতীক হয়ে ওঠে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:৫৫
প্রশান্ত তামাঙের উত্থান উস্কে দিয়েছিল গোর্খা জনগোষ্ঠীর জাত্যাভিমান, যার ফলস্বরূপ পাহাড়ের রাজনীতিতে সুবাস ঘিসিংকে পিছনে ফেলে উঠে এসেছিলেন বিমল গুরুং।

প্রশান্ত তামাঙের উত্থান উস্কে দিয়েছিল গোর্খা জনগোষ্ঠীর জাত্যাভিমান, যার ফলস্বরূপ পাহাড়ের রাজনীতিতে সুবাস ঘিসিংকে পিছনে ফেলে উঠে এসেছিলেন বিমল গুরুং। গ্রাফিক্স - আনন্দবাজার ডট কম

নেপালি গায়ক তথা অভিনেতা প্রশান্ত তামাঙের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বিনোদনজগৎ। এত অল্প বয়সে তাঁর মৃত্যু, অনেকে বিশ্বাসই করতে উঠতে পারেননি। কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল থেকে রাতারাতি বিনোদনজগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠা প্রশান্তের কাহিনি যেন রুপোলি পর্দার বাস্তব চিত্রায়ন। সেই প্রশান্ত কেবল পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের বিনোদনজগতের কাছেই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন না, থাকবেন একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম অনুঘটক হিসাবে। যদিও সরাসরি কোনও দিন রাজনীতি করেননি তিনি, কিন্তু অদ্ভুত ভাবে তাঁকে কেন্দ্র করেই উত্তাল হয়েছিল বাঙালির প্রিয় দার্জিলিং। তাঁর সাফল্যকে ঘিরেই আন্দোলিত হয়েছিল গোটা গোর্খা সমাজ। উঠে এসেছিল দীর্ঘ দিনের গোর্খাল্যান্ডের দাবিও। সেই দাবির আন্দোলনে তলিয়ে গিয়েছিলেন একদা গোর্খা অস্মিতার অন্যতম চরিত্র সুবাস ঘিসিংও। অপর দিকে জন্ম হয়েছিল এক নতুন নেতা বিমল গুরুঙের।

২০০৭ সালে ‘ইন্ডিয়ান আইডল ৩‌’-এর মঞ্চে বিজয়ী হয়ে গোটা দেশের নজর কেড়েছিলেন দার্জিলিঙের ছেলে প্রশান্ত। তাঁর জয় শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যই ছিল না, তা পাহাড়বাসী গোর্খা জনগোষ্ঠীর আত্মসম্মানের প্রতীক হয়ে ওঠে। মুম্বইয়ের বিনোদনজগতে এক পাহাড়ি যুবকের এই উত্থান গোর্খা সমাজের মধ্যে এক ধরনের আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করেছিল। অনেকেই এই ঘটনাকে এখনও ‘গোর্খা আইডেন্টিটি’র স্বীকৃতি হিসাবে দেখেন।

প্রশান্তের ‘ইন্ডিয়ান আইডল’ জয়ের পর মুম্বইয়ের এক রেডিয়ো জকির মন্তব্যকে ঘিরে জ্বলে ওঠে গোর্খা জাত্যাভিমান। ওই রেডিয়ো জকি মশকরা করে বলেছিলেন, “এ বার থেকে বাড়ি এবং অফিসের দারোয়ানদেরও গানের আসরে গান গাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।” ওই মন্তব্যকে ঘিরে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়। গোর্খা সমাজ উত্তাল হয়ে প্রশ্ন তোলে, ‘দেশ তাদের কী চোখে দেখে?’ সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পাহাড়ে গোর্খা অস্মিতাকে ঘিরে প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত হতে শুরু হয়। নেতৃত্বে বিমল গুরুং। দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পং এলাকার গোর্খা জনজাতিকে নিয়ে তিনি শুরু করেন গোর্খাল্যান্ডের আন্দোলন। বিমল-প্রতাপে গোর্খা রাজনীতির অন্যতম চরিত্র জিএনএলএফ প্রধান সুবাস ঘিসিং হয়ে পড়েন কোণঠাসা। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী যাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই সুবাস ঘিসিং একসময় পাহাড় ছাড়তে বাধ্য হন।

সেই সময়েই দার্জিলিং পাহাড়ে রাজনৈতিক ভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছিলেন বিমল গুরুং ও তাঁর দল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। পৃথক রাজ্য গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে পাহাড় উত্তাল। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও বঞ্চনার প্রশ্নে গোর্খা জনগোষ্ঠীর আলাদা পরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে গুরুং নিজেকে আন্দোলনের মুখ হিসাবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে— গোর্খারা শুধু পর্যটনশিল্পের শ্রমিক নন, তাঁদের একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা রয়েছে। জাতীয় স্তরে প্রশান্তের সাফল্য আর পাহাড়ে বিমলের দুর্বার আন্দোলনে যেন রুদ্ধ গোর্খা কণ্ঠ প্রাণ পেয়েছিল।

সেই প্রেক্ষাপটে প্রশান্ত হয়ে ওঠেন এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক প্রতীক’। রাজনৈতিক মঞ্চে তিনি সরাসরি সক্রিয় না হলেও তাঁর জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি আন্দোলনের আবেগের দিকটিকে আরও জোরালো করে তোলে। বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ের সভা-সমাবেশে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে, কখনও কখনও তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গোর্খা ঐক্যের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এতে আন্দোলনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের আবেগের সেতুবন্ধন আরও মজবুত হয়।

অপর দিকে গোর্খা সমাজকে বিমল বুঝিয়েছিলেন, শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়, প্রশান্ত মারফত যে সাংস্কৃতিক গর্ব গোর্খাদের মধ্যে এসেছে, তা-ই হতে পারে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের বড় প্রাণশক্তি। তাই গোর্খা ভাষা, গান, পোশাক ও শিল্পীদের সামনে এনে একটি বৃহত্তর পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা চলে। প্রশান্তের মতো জনপ্রিয় শিল্পীর সাফল্যের ফলে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন শুধু প্রশাসনিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গোর্খা ভাবাবেগ ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে পরিণত হয়।

এই ভাবে প্রশান্ত এবং বিমল দু’জনেই নিজেদের নিজস্ব ক্ষেত্রে থেকে গোর্খা জাতিসত্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন—এক জন সংস্কৃতির মাধ্যমে, অন্য জন রাজনীতির মাধ্যমে। তাঁদের সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ যতই সীমিত হোক না কেন, গোর্খা সমাজের আত্মমর্যাদা, পরিচয় ও অধিকারের প্রশ্নে দু’জনের ভূমিকা পরস্পরের সম্পূরক বলেই মনে করেন পাহাড়ের বহু মানুষ। গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের ইতিহাসে তাই এই দুই নাম আবেগ ও বাস্তবতার দুই ভিন্ন ধারাকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছিল। সেই একটি সুতোই ছিঁড়ে গেল রবিবার সকালে। শোকবার্তায় বিমল লিখেছেন, ‘‘গোর্খা সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করা, গোর্খাল্যান্ডের কণ্ঠস্বর রাস্তা থেকে সংসদে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশান্ত তামাং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই পরিবর্তনের গর্ভ থেকে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা পার্টির জন্ম হয়েছিল, যা পাহাড়ের রাজনীতিকে একটি নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে।’’

গোর্খা জনগোষ্ঠীর কাছে প্রশান্ত ছিলেন এক অহঙ্কারের নাম, যিনি উস্কে দিয়েছিলেন এক প্রান্তিক জাতির অবদমিত আকাঙ্ক্ষাকে। তাই আবার এমন কোনও নতুন ধ্রবতারার সন্ধানের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে গোর্খা জনগোষ্ঠীকে।

Bimal Gurung Prashant Tamang Gorkhaland Movement Gorkhaland Politics
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy