Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৯ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

হায় ভগবান

আমির খানের অভিনয় অসাধারণ। কিন্তু নায়কের জন্য টিকিট কিনলে অ্যাক্টিভিস্ট ফ্রি। লিখছেন গৌতম চক্রবর্তীরাজকুমার হিরানির ‘পিকে’ বছরের অন্যতম বুদ্ধ

২২ ডিসেম্বর ২০১৪ ০০:০১

রাজকুমার হিরানির ‘পিকে’ বছরের অন্যতম বুদ্ধিমন্ত, জমাটি ও মজাদার ছবি। কিছু দুর্বলতা অবশ্য আছে। বুদ্ধিমান পরিচালক কি আর মাঝে মাঝে রং নম্বরে ফোন লাগান না? গল্প ইলাস্টিকের মতো টেনে বাড়িয়ে সিক্যুয়েল তৈরির স্বপ্ন দেখেন না?

দুর্বলতার কথা পরে। সারসত্য একটিই: জমজমাট এই ছবির অন্যতম অস্ত্র আমির খান। ভিন্গ্রহের স্পেসশিপ থেকে রাজস্থানের মরুভূমিতে নেমে এসেছেন তিনি। সে গ্রহে কেউ জামাকাপড় পরে না, সকলে নগ্ন থাকে। আমিরের গলায় সবুজ পান্নার মতো রিমোট, কিছুক্ষণ পরেই মরুভূমির এক ডাকাত ছিনিয়ে নেয় সেটি। তার পরই সি কে মুরলিধরনের ক্যামেরায় আদিগন্ত মরুভূমি, লাইন ধরে এগিয়ে যাচ্ছে মালগাড়ি। নগ্ন আমির ছুটতে থাকেন, ডাকাত ততক্ষণে মালগাড়িতে। তার কাঁধের ট্রানজিস্টরটি আমিরের কাছে রয়ে যায়। এই ভিন্গ্রহী এখানকার ভাষা, সামাজিক প্রথা কিচ্ছু বোঝে না। শুধু নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। আবেগহীন এই নগ্নতার অভিনয়েই তো আমিরি চাল! ছবি যত এগোয়, সত্য কথাটি টের পাওয়া যায়। মানুষ এই পৃথিবীতে নিরাবরণ, নগ্ন হয়েই আসে। তারপর একে একে নিজস্ব ভাষা, ধর্ম, জাতপাত, সামাজিক প্রথার আবরণে ঢাকা পড়ে যেতে থাকে।

Advertisement





অতএব ভিন্গ্রহী পিকে কনফিউজ্ড। সব জায়গায় শুনেছে, ভগবান জানেন তার রিমোট কোথায়। ইচ্ছা করলে একমাত্র তিনিই ফেরত দিতে পারেন সেটি। সেই ভগবান কে? কোথায় থাকেন? মন্দির, মসজিদ, গির্জা সর্বত্র হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায় ভিন্গ্রহী। মন্দিরে তাঁকে খুঁজতে গেলে বড় বড় পুরোহিতরা প্রায় তোলা আদায়ের ঢঙে প্রণামী আদায় করেন। গির্জায় তিনি থাকেন ঠিকই, কিন্তু সেখানে নারকেল, ধূপকাঠি নিয়ে ঢুকলে সবাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। গির্জায় ঈশ্বরপুত্রকে ওয়াইন নিবেদন দেখে ভিন্গ্রহী মসজিদেও সেই ভঙ্গিতে ঢুকতে যায়। ফল অনুমেয়। সকলে লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে। বাসে এক পুরুষ জানায়, সাদা শাড়ি মানে বিধবা! অতঃপর গির্জায় বিয়ের জন্য সাদা পোশাকে অপেক্ষারত কনেকে পিকে-র জিজ্ঞাসা: বর কবে মারা গেলেন? ধর্ম এবং সামাজিক প্রথা নিয়ে এ ছবি পদে পদে অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে ফ্যাতাড়ুগিরি করে গিয়েছে।

অতঃপর ভিন্গ্রহী সারসত্য বুঝে যায়। ঐশ্বরিক ধর্ম আর সংগঠিত ধর্মব্যবসা একেবারে আলাদা। ঈশ্বরের কাছে পৌঁছাতে মানুষ ‘রং নাম্বার’কে আশ্রয় করে। জনপ্রিয় সন্ন্যাসী তপস্বী মহারাজ (সৌরভ শুক্ল) রামের জন্মভূমিতে, কৃষ্ণের জন্মভূমিতে যে মন্দির বানাবেন, সেখানে চাঁদা দেওয়াটাই ধর্ম ভাবে। পিকে-র যুক্তি: ভয় থেকে মানুষ ভগবানের জন্ম দেয়। এক সায়েন্স কলেজে পরীক্ষার দিন সে পানের পিক লাগিয়ে একটি কালো পাথর রাখে। বিজ্ঞানের ছাত্ররা সবাই পয়সা ছোড়ে, পাথর জাগ্রত হয়ে ওঠে। একদা শিবরাম চক্রবর্তীর ছোট গল্প জানিয়েছিল, এ ভাবেই ‘দেবতার জন্ম’ হয়। রাজু হিরানি মেজাজে সেই ঘরানার উত্তরসূরি। কিন্তু মেজাজ থাকলেও সিনেমা হয়নি। ওই দৃশ্যে পিকে-র রানিং কমেন্ট্রি ছবির গতিকে ক্ষুণ্ণ করেছে। পাথর ঘিরে ভিড় জমছে, চায়ের দোকান বসেছে দেখানোই যথেষ্ট।

পিকে-র বার্তা কি আর ওইটুকু! সে প্রশ্ন তোলে, যে দেশে এত শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, সেখানে কেন লোকে শিবমন্দিরে দুধ ঢালে? তাকে দেখেই কেউ কেউ প্রশ্নটাকে এগিয়ে নিয়ে যায়: অমুক বাবাজি যদি হাত ঘুরিয়ে সোনা আনতে পারেন, দেশে এত দারিদ্র কেন? বোরখা পরা একটি মেয়ে বলে, আমাদের খোদা এত ছোট মনের নন যে মেয়েদের স্কুলে যেতে দেবেন না। যে দেশে সন্ন্যাসী নিত্যানন্দ সেক্স স্ক্যান্ডালে জড়ান, কাঞ্চীর শঙ্করাচার্যকে নিয়ে আদালতে মামলা গড়ায়, কোনও কোনও মাদ্রাসায় উগ্রপন্থী প্রচার চলে, সেখানে এই সব সংলাপে যে হাততালি পড়বে, সন্দেহ নেই।



হাততালি বক্স অফিসে মূল্যবান, কিন্তু শিল্পের চৌহদ্দিতে অর্থহীন। শিবের মাথায় দুধ ঢালা এবং অপুষ্টি-আক্রান্ত শিশু আলাদা বিষয়। একটি দিয়ে অন্যটির মোকাবিলা করা যায় না। ব্যাপারটা এত দূর গুলিয়েছে যে, কৃষ্ণ, কালী, গণেশ ইত্যাদির মূর্তি তৈরি করে যারা দশ-বিশ টাকায় বেচছে, ছবিতে তাদের নিয়েও ঠাট্টা। যে বহুরূপী শিব সেজেছে, তাকে নিয়েও রঙ্গ। এই গরিব লোকগুলি ধর্মব্যবসায়ী? আমির, রাজকুমারেরা নতুন কোনও কথা বলছেন না। গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর অনেকেই নাস্তিক ছিলেন। মধ্যযুগেও সন্ত কবীর লিখে গিয়েছেন, ‘তিনি কাবায় থাকেন না, কৈলাস পর্বতেও নয়। তাঁকে পেতে দূরে যাওয়ার দরকার নেই। ধোবিঘাটে, কাঠমিস্ত্রির ঘরে গেলেই চলবে।....পুরাণ আর কোরান দুই-ই শুধু কথার পরে কথা।’ ধর্মের যুক্তিতেই ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে কথা বলা যায়। কিন্তু এই দুনিয়ায় শোনে কে! হাততালি কুড়োনোর জন্য ‘সত্যমেব জয়তে’ মার্কা বার্তা প্রদানই এ ছবির অন্যতম দুর্বলতা।

বরং বার্তা প্রদান যেখানে নেই, সেখানেই রাজকুমার হিরানির উইট সোনা ফলিয়েছে, হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরিয়েছে। ভিন্গ্রহী পিকে নিজের জামাকাপড় জোগাড় করে কী ভাবে? ডান্সিং কার থেকে। মরুভূমির নির্জনে একটি গাড়ি চাকার ওপরে নাচছে। জানলায় এক পুরুষ ও মহিলার পোশাক। সেটিই পিকে-র ডান্সিং কার। ভিন্গ্রহী জেনেছে, গাঁধীর ছবিওয়ালা কাগজ দোকানে দিলে খাবার কিনতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন পোস্টার থেকে গাঁধীর ছবি জমায় সে। কিন্তু দোকানে কিছু মেলে না। এ বার সে বোঝে, সব ছবি সমান মূল্যবান নয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ছাপ মারা কাগজে গাঁধীর ছবিই মূল্যবান।

যৌনতা নিয়ে ভারতীয় ইনহিবিশনকেও চমৎকার ঠাট্টা করেছে এই ছবি। পিকে মানুষের হাতে হাত রেখে তার ভাষা, চিন্তা শুষে নেয়। ছেলেদের হাতে হাত রাখলে দোষ নেই, মেয়েদের হাতে হাত রাখলে সবাই রে রে করে ছুটে আসে।

টিভি অফিসে কন্ডোমের প্যাকেট দেখে তার প্রশ্ন: এটা কার? কেউ স্বীকার করে না। এ বার প্রশ্ন: টাকা হলে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে, কন্ডোমের বেলায় কেন নয়? টিভি চ্যানেলের কর্তা বোমান ইরানি তাকে বোঝান, সেক্স এই দুনিয়ায় ব্যক্তিগত বিষয়। তাই কন্ডোমের প্যাকেট কেউ সরাসরি নিতে চায় না। অতঃপর মোক্ষম প্রশ্ন, ‘সে কি? এখানে সেক্স ব্যক্তিগত? তা হলে সবাই ব্যান্ড পার্টি বাজিয়ে বিয়ে করতে যায় কেন?’ সামাজিক সংস্কার নিয়ে এই সব মজাদার সিকোয়েন্স ও সংলাপ রাজকুমার হিরানির চিত্রনাট্যেই ঘটে থাকে।

সৌরভ শুক্ল এবং বোমান ইরানি চমৎকার। রাজকুমার হিরানির ছবি, ফলে একটি ক্যামিও চরিত্রে ‘মুন্নাভাই’ সঞ্জয় দত্ত স্বয়ং। স্বল্প পরিসরে সুশান্ত সিংহ রাজপুতকেও ভাল লাগে। পাশাপাশি রয়েছেন আর এক জন। আমিরের বিপরীতে তিনি বিরাট কোহলির মতোই চমৎকার, আগ্রাসী ব্যাটিং করেছেন। তিনি এই ছবির নায়িকা অনুষ্কা শর্মা। আমিরের নিষ্পলক দৃষ্টি এবং তাঁর চোখের উজ্জ্বল, ছটফটে চাউনিতে তৈরি হয়েছে সঘন রসায়ন। শান্তনু মৈত্রের সুরারোপিত ‘নাঙ্গা পাঙ্গা দোস্ত’ বা ‘লাভ ইজ আ ওয়েস্ট অব টাইম’ গানে মেলোডি চমৎকার। কিন্তু নতুনত্ব নেই।



রাজকুমারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব অবশ্য অন্যত্র। এখানে ভিন্গ্রহী মানে ‘ইটি’ বা ‘কোই মিল গ্যয়া’র জাদুশিশু নয়। হলিউডি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে’-র মতো দুনিয়া ধ্বংসে উদ্যত যুদ্ধবাজও নয়। এই ছবি দেখাল, ভিন্গ্রহী মাত্রেই সুপারম্যান নয়। অন্য কেউ তার রিমোটটিকে চক্ষুদান করতেই পারে।

ছবির শেষটা ইলাস্টিকের মতো টেনে বাড়ানো। মরুভূমিতে একাকী বসে অনুষ্কা বোঝে, পিকে তাকে ভালবাসে। পিকে বাসের পিছনে কুয়াশায় ছুটতে ছুটতে মিলিয়ে যাচ্ছে, এখানে শেষ করলেই চমৎকার হত। কিন্তু তার পরও অবান্তর সব দৃশ্য। পিকে-র কাহিনি নিয়ে অনুষ্কা বই লিখল, তার স্বামী ও বাবা সেখানে পাশাপাশি বসে। চমৎকার! ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলে হাততালি কুড়োব, কিন্তু স্বামী এবং বাবার হাততালিতে মেয়েদের সুখী হওয়ার পিতৃতন্ত্রকে মেনে নেব।

এহ বাহ্য! শেষে আবার স্পেসশিপ এসে নামল, সিক্যুয়েল তৈরির জন্যই যেন রণবীর কপূর নেমে এলেন। রাজকুমার হিরানির পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন নেই, কিন্তু তাঁর সম্পাদনা আরও যথাযথ হওয়া উচিত ছিল।

আর স্পেসশিপ দেখাতে হবেই বা কেন? ছেলেভুলোনো আকর্ষণ তৈরির জন্য? পিকে-রা স্পেসশিপ থেকে নামে না, প্রতিটি যুক্তিবাদী মানুষের মনেই থাকে। পুণে ফিল্ম ইন্সটিটিউটের প্রাক্তন ছাত্র রাজকুমার হিরানি প্রয়োজনে একটি বাংলা ছবির কথা মনে করে দেখতে পারেন। তপন সিংহের ‘গল্প হলেও সত্যি’। কুয়াশায় রবি ঘোষ আসেন, একটি পরিবারের বিভিন্ন স্তরে জমাট হয়ে-থাকা সামাজিক সংকট দূর করে ফের কুয়াশায় মিলিয়ে যান। তিনি স্পেসশিপ থেকে নেমেছিলেন কি না, মানুষবেশে ঈশ্বর কি না, সে সব প্রশ্ন অবান্তর। এখানেই সিনেমার মায়া, শিল্পের জাদুবাস্তবতা।

রাজকুমার হিরানির ছবিতে অ্যাক্টিভিজ্ম আছে, কিন্তু জাদু নেই। ফলে লেটার মার্কস দেওয়া গেল না!

আনাচে কানাচে

‘ব্যোমকেশ’ রাজপুত সিংহ: কলকাতায় দিবাকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবির পোস্টার লঞ্চে সুশান্ত

আরও পড়ুন

Advertisement