Advertisement
E-Paper

কান টেনেই মন টানছে রেডিওর গল্পের আসর

হাওড়া থেকে যাদবপুরের বাসে হাতেগোনা লোক। রবিবারের ফাঁকা রাস্তা। চালক এফএম-এর চ্যানেল বদলাতে বদলাতে থামলেন একটিতে। এসি বাসের সাউন্ড সিস্টেম থেকে তখন ভেসে আসছে জান্তব শব্দ। ‘‘সেপ্টোপাসের খিদে!’’ অস্ফুটে বলে উঠলেন ষাটোর্দ্ধ বৃদ্ধ। মোবাইলে কথা বলছিলেন।

সুজিষ্ণু মাহাতো

শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০১৬ ০৩:৪৮

হাওড়া থেকে যাদবপুরের বাসে হাতেগোনা লোক। রবিবারের ফাঁকা রাস্তা। চালক এফএম-এর চ্যানেল বদলাতে বদলাতে থামলেন একটিতে। এসি বাসের সাউন্ড সিস্টেম থেকে তখন ভেসে আসছে জান্তব শব্দ।

‘‘সেপ্টোপাসের খিদে!’’ অস্ফুটে বলে উঠলেন ষাটোর্দ্ধ বৃদ্ধ। মোবাইলে কথা বলছিলেন। ফোনের ও পারে থাকা সঙ্গীকে বললেন, ‘‘দাঁড়াও ভাই, খুব ভাল একটা গল্প শোনাচ্ছে রেডিওতে। আগেও শুনেছি। আর একবার শুনি।’’ তাঁর পাশে বসে এক তরুণীও কান থেকে আইপডের ইয়ারপ্লাগ খুলে মন দিলেন সত্যজিতের অমর সৃষ্টিতে।

শহর কলকাতার এই ছবিটা এখন গোটা দেশেই। হিসেব বলছে, ডিজিটাল যুগে বই কিনে পড়ার ঝোঁক কমছে। আবার সেই হিসেবই বলছে, এফএম রেডিওতে গল্প শোনার চাহিদা ক্রমবর্ধমান। কলকাতার একটি রেডিও স্টেশনের শুরু করা রবিবারের রহস্য রোমাঞ্চ গল্পের সিরিজের বিপুল সাফল্যের পরে শহরের একাধিক এফএম স্টেশনেই বসছে গল্প বলার আসর। অক্ষর নয়, শব্দ হয়ে ফিরে আসছেন সত্যজিৎ-সুনীল থেকে হেমেন্দ্রকুমার রায়-শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।

কিন্তু ভিস্যুয়াল মিডিয়ার যুগে রেডিওর এই রমরমার কারণ কী? রবিবাসরীয় রহস্য গল্পের সুপারহিট আসর যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত, সেই এফএম চ্যানেলের কলকাতা স্টেশনের প্রোগ্রামিং হেড ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘বাংলা ভাষায় এত সমৃদ্ধ সাহিত্য রয়েছে, আমরা সেটাই নতুন আঙ্গিকে, নতুন শব্দপ্রয়োগে তুলে ধরেছি। আর সেটা যে দর্শকেরা পছন্দ করেছেন তা ২৮ জুন অনুষ্ঠানটা আট বছরে পা দেওয়া থেকেই প্রমাণিত।’’ ফ্রেন্ডস এফএম-এর স্টেশন হেড জিমি টাংগ্রিও বলছেন, গল্পের চাহিদাটা ছিলই। সেই পালে হাওয়া দিয়েছে স্মার্ট উপস্থাপনা। জিমি জানালেন, ‘‘আমাদের চ্যানেলেও আমরা গল্প বলার অনুষ্ঠান শুরু করেছি। ‘ম্যাড আওয়ার্স’ নামে সেই অনুষ্ঠানে বলা হয় নানা সম্পর্কের কাহিনি। নতুন প্যাকেজিংয়ে নতুন ভাবে এই গল্প বলার অনুষ্ঠান সকলেই খুব পছন্দ করছেন।’’ তাই উপস্থাপনার এই বিবর্তনই যে জনপ্রিয়তার চাবিকাঠি, তা নিয়ে একমত তিনিও।

বিবর্তনটা অবশ্য এক দিনে হয়নি। ইতিহাস বলছে, শোনার অভ্যাস ভারতের সংস্কৃতিরই অঙ্গ। প্রাচীন কালে বেদ শুনে শুনেই মনে রাখতেন পণ্ডিতেরা। একই কথা প্রযোজ্য রামায়ণ, মহাভারতের মতো মহাকাব্য থেকে শুরু করে পাঁচালি, ব্রতকথার ক্ষেত্রেও। রেডিওতেও গল্প পাঠের ধারা বহুদিনের। টেলিভিশন জনপ্রিয় হওয়ার আগে বেতার-নাটক ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল পশ্চিমে। হালে সেই সব পুরনো নাটক উদ্ধার ও ডিজিটাইজ করার কাজ শুরু হয়েছে। ১৯৩৮ সালে মার্কিন রেডিও-তে এইচ জি ওয়েলসের উপন্যাস অবলম্বনে ‘ওয়ার অব ওয়ার্ল্ডস’ নাটক করেছিলেন অরসন ওয়েল্স! শুনে এত জ্যান্ত লেগেছিল মানুষের যে, সকলে আতঙ্কিত হয়ে ভেবেছিল প্রলয় উপস্থিত!

বাংলাতেও আকাশবাণীতে দশক পাঁচ-ছয় আগে ‘গল্পদাদুর আসরের’ মতো অনুষ্ঠান গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। গল্পদাদু হিসেবে যিনি সবার পরিচিত, সেই পার্থ ঘোষের মনে পড়ছে, ‘‘অনুষ্ঠানটি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে দেশে-বিদেশে ছোট-বড় সকলে ভিড় করে আমাকে দেখতে আসতেন।’’ কিন্তু তখন না-হয় বিনোদনের হরেক উপাদান ছিল না। কিন্তু এখন এই ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ-স্কাইপের যুগে রেডিওর গল্প লোকে শুনছে কেন? পার্থবাবুর মতে, ‘‘আসলে গল্পের মাধ্যমে যতটা কাছে পৌঁছে যাওয়া যায় অন্য কোনও ভাবে তা যায় না।’’ তাই নতুন আঙ্গিকে, নতুন শব্দবিন্যাসে নানা সাহিত্যকর্ম থেকে শুরু হয়েছিল বেতার-নাটক করার উদ্যোগ। সেটা ১৯৭৫ সাল। তৎকালীন আকাশবাণীর নাটকের মুখ্য প্রযোজক জগন্নাথ বসু জানাচ্ছেন, আকাশবাণীর জন্য ‘সেপ্টোপাসের খিদে’ নতুন করে লিখে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ। এ ছাড়া মতি নন্দীর কোনি, স্টপারের মতো উপন্যাসের নাট্যরূপ দেওয়া হয়েছিল। ‘‘সঙ্গে ছিল কোনির সাঁতার কাটার শব্দ, স্টপারের বল ড্রিবল প্র্যাকটিসের শব্দ। এই নতুন শব্দবিন্যাসই ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটা এক্সপেরিমেন্ট’’, বলছেন জগন্নাথবাবু।

সেই সময় আঙ্গিক বদলাচ্ছিল বিবিধ ভারতীও। বিজ্ঞাপনদাতা আয়োজিত দু’টি বেতার-নাটকের অনুষ্ঠান, ‘বোরোলীনের সংসার’ আর ‘পি থ্রি রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ’ও তুমুল জনপ্রিয় হয় তখন। শুধু বেতারনাটক নয়, আকাশবাণীতে ধ্রুপদী সাহিত্য পাঠের আসরও বসত নিয়মিত। আজকের গল্প বলার ধারায় প্রকৃত পূর্বসূরি সেটাই।

দেশের বহু শহরেই আজকাল কাহিনিভিত্তিক অনুষ্ঠান হচ্ছে এফএম স্টেশনে। তার মধ্যে ইডিয়ট বাক্সের স্মৃতিসফর তিনটি সিজন পার করে চতুর্থ সিজনে পড়েছে। একটি চ্যানেল ২০১০ সালে কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করে তৈরি করেছে রামায়ণের রেডিও সিরিজ, যাতে কণ্ঠ দিয়েছেন নাসিরুদ্দিন শাহ, ওম পুরী, অনুপম খেরের মতো অভিনেতা। কলকাতার একটি চ্যানেলের ভৌতিক গল্পের সিরিজ এতটাই জনপ্রিয় যে তার প্রথম সিরিজের গল্পগুলি বই হয়েও বেরিয়েছে। সম্প্রতি দিল্লির একটি রেডিও চ্যানেলের সঞ্চালক সায়েমা রহমানের গলায় রেডিওতে শোনা গিয়েছে সাদাত হাসান মান্টোর গল্প। ‘বু’, ‘খোল দো’র মতো বিতর্কিত গল্পও বাদ পড়েনি। ইন্টারনেট থেকে সেগুলো শুনে সায়েমাকে লাহৌর থেকে চিঠি লিখেছেন মান্টোর নাতি মহম্মদ ফারুক। তিনি জানিয়েছেন, মান্টোর কন্যা, তাঁর মা নুজাত আরশাদকেও গল্প শুনিয়েছেন তিনি। সায়েমা আত্মবিশ্বাসী স্বরে যা বললেন, দেশ জুড়ে গল্প শোনার টানও একই কথা বলছে— ‘‘দিন যতই বদলাক, সাহিত্যের চাহিদা কখনও কমে না।’’

Story Telling Show Radio
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy