Advertisement
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

চেন্নাই এক্সপ্রেসে শ্রীজাত

কমল হাসন চা বানিয়ে দিচ্ছেন। ইলায়ারাজা গল্প করছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে। চেন্নাইতে এমনই অভাবিত সব অভিজ্ঞতা হল শ্রীজাত-র। শুনলেন ইন্দ্রনীল রায়।তমলুকে যাচ্ছি এবিপি আনন্দ-র জন্য ভোটের প্রোগ্রাম করতে। এমন সময় দেখি উষাদি (উত্থুপ)-র ফোন। ‘‘তুমি কী করছ? দু’দিনের জন্য চেন্নাই যেতে পারবে? একটা হিন্দি ছবি হচ্ছে ওখানে। দু’টো গান লিখে দিতে হবে,’’এক নিশ্বাসে বললেন উষাদি।

কমল হাসন ও ইলায়ারাজা-র সঙ্গে শ্রীজাত

কমল হাসন ও ইলায়ারাজা-র সঙ্গে শ্রীজাত

শেষ আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০১৬ ০০:০৩
Share: Save:

তমলুকে যাচ্ছি এবিপি আনন্দ-র জন্য ভোটের প্রোগ্রাম করতে। এমন সময় দেখি উষাদি (উত্থুপ)-র ফোন। ‘‘তুমি কী করছ? দু’দিনের জন্য চেন্নাই যেতে পারবে? একটা হিন্দি ছবি হচ্ছে ওখানে। দু’টো গান লিখে দিতে হবে,’’এক নিশ্বাসে বললেন উষাদি।

Advertisement

আমি আমতা আমতা করে বললাম, উষাদি, এখানে প্রচুর ব্যস্ততা, ভোটও প্রায় শেষ হওয়ার মুখে। আজকাল তো মিউজিক ডিরেক্টররা সুর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেন। আপনি ওঁদের বলুন সেটা করতে। আমি গান লিখে পাঠিয়ে দেব। শুনে উষাদি বললেন, ‘‘আসলে এই মিউজিক ডিরেক্টর একটু ওল্ড ফ্যাশনড। গীতিকারকে সামনে বসিয়ে গানটা বানাতে চান।’’ উষাদির ভয়েস ক্রমশ ব্রেক করছে, এমন সময় জিজ্ঞেস করলাম, ঊষাদি, মিউজিক ডিরেক্টর কে? ‘‘শ্রীজাত, মিউজিক ডিরেক্টর ইলায়ারাজা। আর ছবির হিরো কমল হাসন।’’ ব্যস। কল ড্রপ।

কল ড্রপ কী! দু’টো নাম শুনে আমার তো হাত থেকে ফোন ড্রপ।

ইলায়ারাজা। কমল হাসন।

Advertisement

তাঁদের জন্য গান লিখব আমি? উষাদি ইয়ার্কি মারলেন না তো! এ সব ভাবতে ভাবতে দেখি চেন্নাইয়ের ০৪৪ কোড নম্বর থেকে ফোন। দু’দিনের জন্য চেন্নাই যাওয়ার টিকিটে আমার পুরো নাম জানার জন্য ফোন করেছে কমল হাসনের অফিসের এক কর্মী।

আর কিছু না ভেবে সোমবার সকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেশ ছেড়ে উড়ে গেলাম জয়ললিতার দেশে। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা নিয়ে যাওয়া হল রাজকমল পিকচার্সের স্টুডিয়োতে। সেখানে একটা দোতলার ঘরে দেখলাম বসে আছেন দু’জনে। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন তাঁরা।

কমল হাসন। ইলায়ারাজা।

আমার তো হাত-পা কাঁপছে। একজন ভারতের অন্যতম সেরা সঙ্গীত পরিচালক। এ আর রহমানও যাঁকে গুরু মনে করেন। আর অন্যজন তো আমাদের অতি প্রিয় অভিনেতা। উনিই তো ‘সাদমা’র লাস্ট সিনে স্টেশনে কেঁদে ওঠা মানুষটি। ‘সাগর’‌য়ে উনিই না ঋষি কপূরের কাছে হেরে গিয়েছিলেন। ওই তো ‘আপ্পু রাজা’, ওই তো ‘হিন্দুস্থানি’।

নমস্কার পর্বের পর বসলাম। ইলায়ারাজা সুরটা শোনালেন। কমল হাসন ধীরে ধীরে নিজস্ব ভঙ্গিতে সিচুয়েশনটা বোঝালেন আমাকে। এটা আদতে একটা হিন্দি ছবি। ছবিতে এক বাঙালির চরিত্রে অভিনয় করছেন কমলজি। চরিত্রের নাম প্রণব কুন্ডু। তাঁর স্ত্রীর চরিত্রের নাম অনসূয়া কুন্ডু। ওঁদের দু’জনের একটা সিচুয়েশনের গান, যেখানে দশ শতাংশ বাংলা কথা রয়েছে। বাকি গানটা হিন্দিতে।

সিচুয়েশনটা বলতে একটা কথাই বারবার করে বললেন কমলজি,‘‘শ্রীজাত, কিপ ইট সিম্পল।’’ সিম্পলিসিটি, সরলতা ছাড়া জীবনের পুরোটাই বৃথা — এই কথা বারবার করে বললেন কমলজি। সিম্পল সুরের কথা বলতে নিজেই তুললেন এস ডি বর্মনের কথা, আড্ডা হল সলিল চৌধুরীর সুর নিয়ে, যা অসম্ভব কমপ্লিকেটেড কিন্তু শুনলে মনে হয় সিম্পল! গান কত সরল হতে পারে এটা বোঝাতে নিজের গলায় শোনালেন ‘ফুলো কি রং সে’।

আমি তখন আর গান লেখার কথা ভাবছিই না। হাঁ করে দেখছি কমল হাসনের পারফর্ম্যান্স। এর মধ্যে অনেক দামি কথাও বললেন দু’জনে। ওঁরা দু’জনেই কর্নাটকি মিউজিক আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভক্ত। আমি জিজ্ঞেসও করলাম, কমলজি, আপনি রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনেন? ‘‘আরে! কেন শুনব না? আমার কত বাঙালি বন্ধু আছে। রাজাজি (ইলায়ারাজা) তো কথা বুঝতে পারেন না কিন্তু প্রায়ই স্টুডিয়োতে দেখি ইন্সট্রুমেন্টালে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনছেন। শুধু খারাপ লাগে একটা ব্যাপার ভেবে। কর্নাটকি মিউজিক বা রবীন্দ্রসঙ্গীত শুধু প্রাদেশিক হয়েই থেকে গেল। গোটা ভারত জানলই না,’’ বলেন কমলজি।

এ সব শুনতে দারুণ লাগছিল কিন্তু গানটাও তো লিখতে হবে। আমি ওঁদের কাছে দু’ঘণ্টা সময় চাইলাম। সেই মতো আমাকে একটা ফাইভ স্টার হোটেলে নিয়ে যাওয়া হল। গান লিখে ফোন করলাম ওঁদের। সন্ধেবেলা সিটিং হল অন্য একটা হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল সুইটে। এর মধ্যেই কমলজি আমাকে কিশোরকুমারের কত গল্প শোনালেন। কিশোরকুমারকে নকল করে দেখালেন, যেটা একবাক্যে অস্কার উইনিং পারফর্ম্যান্স। একটা দুর্দান্ত অ্যানেকডোটও শেয়ার করলেন।

গল্পটা এমন: কিশোরকুমার একটা জায়গায় প্রোগ্রাম করতে গিয়েছেন, যেখানে সর্বক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছে ৩০ জন মানুষ। ঘুমালেও তারা জানলার বাইরে থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে কিশোরকুমারকে। দেড় দিন এমন করে কাটানোর পর কিশোরকুমার বললেন শোয়ের আগে উনি অন্তত আধ ঘণ্টা একা থাকতে চান। সঙ্গে চান একটু চা,লঙ্কার আচার আর লেবু। কর্মকর্তারা সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যবস্থা করলেন। কিশোরকুমার চায়ের ভিতর আচার আর লঙ্কা কুচিকুচি করে কেটে ঢেলে দিলেন। আর জানালার বাইরে দর্শককুলকে দেখিয়ে খেয়েও ফেললেন সেটা।

কমলজি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ও রকম কেন করলেন আপনি? তাতে কিশোরজি উত্তর দিয়েছিলেন, আরে চা খাওয়ার আগেও দেখি ঘরের বাইরে জানলা দিয়ে ১০০ জন আমাকে দেখছে। তাই ভাবলাম এই তিনটে জিনিস আনাই। ওই চা-টা খেয়ে সে দিন আমার কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু ওই ১০০ জনের কথা ভাবো? কিশোরকুমার ও রকম চা খায় ভেবে, ব্যাটাগুলো তো বেশ কিছু দিন ওই চা খাবে। গল্পটা বলেই শিশুর মতো হেসে ফেলেন কমলজি।

এর মধ্যে দেখলাম আমার গান পছন্দ হয়েছে ওঁদের। এর পর শুরু হল আড্ডা। দেড় দিন ধরে এই দুই প্রবাদপ্রতিম মানুষকে কাছ থেকে দেখে একটাই কথা বলব, এই অভিজ্ঞতা যে আমার কোনও দিন হতে পারে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। এমনিতে পৃথিবীর যে শহরের পাশে সমুদ্র থাকে, সে শহরে এসে আমি সমুদ্র দেখব না এমনটা হয় না। কিন্তু এই প্রথমবার চেন্নাই এসে, আমার আর সমুদ্র দেখতে ইচ্ছা করছে না। চোখের সামনে ইলায়ারাজা। চোখের সামনে কমল হাসন।

আমার সাগর দর্শন যে হয়ে গেল।

পুনশ্চ: পরে জানলাম আমি যে গানটা লিখলাম সেটার প্লেব্যাক করবেন কমল হাসন নিজেই। আমি আর কিছু বলতে পারছি না। আমাকে মাফ করবেন প্লিজ।

আরও দেখুন
জানি তুমি অনন্য

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.