থেমেও থামলেন না লালকৃষ্ণ আডবাণী।
‘জরুরি অবস্থা আবার ফিরতে পারে’ বলে এক সাক্ষাৎকারে তাঁর মন্তব্য ঘিরে গত কালই তোলপাড় শুরু হয়েছিল জাতীয় রাজনীতিতে। শুধু বিরোধী-মহলে নয়, বিজেপির অন্দরেও জল্পনা শুরু হয় যে, আডবাণীর মন্তব্যের লক্ষ্য হলেন তাঁর একদা ভাবশিষ্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই বিতর্কে জল ঢালতে গিয়ে আজ অন্য এক সাক্ষাৎকারে আডবাণী যা বললেন, তাতে মাথাচাড়া দিল নতুন বিতর্ক।
নরেন্দ্র মোদীর শাসনকে অনেকে যে ‘ওয়ান ম্যান শো’ বলছেন, আজকের সাক্ষাৎকারে সেই প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে আডবাণীর জবাব, ‘‘আমি বরাবর ‘ওয়ান ম্যান শো’-এর বিরোধী। অহঙ্কার একনায়কতন্ত্রের জন্ম দেয়। অটলবিহারী বাজপেয়ী
এত বড় মাপের নেতা হওয়া সত্ত্বেও কেউ তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করতে পারেননি।’’
শুধু এখানেই নয়, নয়া প্রজন্মের নেতাদের নিয়েও আক্ষেপ করেছেন আডবাণী। তাঁর মতে, অতীতের নেতারা ক্ষমতায় আসার পরেও যতটা বিনয়ী থাকতেন, আজকের নেতাদের মধ্যে তার অভাব রয়েছে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, তার মানে কি আজকের নেতাদের মধ্যে ‘বিনয়’ নামের বস্তুটির অস্তিত্বই নেই? জবাবে আডবাণী বলেন, ‘‘এটা সাংবাদিকদের বিশ্লেষণ।’’ তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘‘ক্ষমতায় যারা আসে, তারা ক্ষমতা হারাতে চায় না। ঠিক যেমন যার টাকা আছে, সে টাকা খোয়াতে চায় না।’’
স্বাভাবিক ভাবে বিরোধীরা তো বটেই, বিজেপির নেতারাও মনে করছেন, আগের মতো এ ক্ষেত্রেও ধোঁয়াশা জিইয়ে রেখে ফের মোদীকেই নিশানা করলেন আডবাণী। ভেঙে বলতে গেলে, মোদী-অমিত শাহ জুটির কর্তৃত্ব নিয়ে নিজের অসন্তোষই উস্কে দিলেন তিনি।
অথচ এই সাক্ষাৎকারেরই গোড়ায় প্রবীণ নেতাকে বলা হয়, জরুরি অবস্থার কথা তুলে নিয়ে তিনি মোদীকে বিঁধেছেন বলে অনেকে মনে করছেন। আডবাণী তখন বলেন, ‘‘কোনও ব্যক্তির নাম করে আমি কিছু বলিনি। নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে বলার প্রশ্নই ওঠে না। আমি কংগ্রেসের কথা বলতে চেয়েছি। ওই ঘটনায় কংগ্রেস এখনও ক্ষমা চায়নি। জরুরি অবস্থার জন্য সনিয়া ও রাহুল গাঁধীর মতো কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত।’’
আক্রমণের অভিমুখ গাঁধী পরিবারের দিকে ঘুরে যাওয়ায় তখনও পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, দল তথা সঙ্ঘের চাপে নিজের কথা বুঝি ফিরিয়েই নিলেন লৌহপুরুষ। জরুরি অবস্থা নিয়ে আডবাণীর মন্তব্যকে সমর্থন করে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল আজ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। সেই বৈঠকও বাতিল করে দেন আডবাণী। দলের অন্দরের খবর, এখানেও কাজ করেছে সঙ্ঘের চাপ— পাছে ভুল বার্তা যায়। কিন্তু সাক্ষাৎকার এগোতেই দেখা যায়, মাথাচাড়া দিচ্ছে নয়া বিতর্কের সম্ভাবনা।
পরপর দু’দিন আডবাণীর দুই খোঁচায় বিহারের বিজেপি-বিরোধী জোটের দুই প্রবীণ নেতা কিন্তু উজ্জীবিত। লালু প্রসাদ বলেছেন, ‘‘এই মন্তব্যেই প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, দেশে কী ভাবে সরকার চালানো হচ্ছে। দেশে জরুরি অবস্থার মতোই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’’ লালুর সঙ্গে সুর মিলিয়ে নীতীশ কুমার বলেছেন, ‘‘আডবাণীজির বক্তব্যকে ভাল করে বোঝার সময় এসেছে।’’ এর সঙ্গে ললিত মোদী কাণ্ড নিয়েও বিজেপিকে বিঁধেছেন নীতীশ। বলেছেন, ‘‘আর্থিক অপরাধে জড়িত এক ব্যক্তিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে সরকার। আমার রাজ্যে ১০ বছরের রাজত্বে কোনও অপরাধীকে বাঁচানোর চেষ্টা করিনি।’’
জরুরি অবস্থা জারির ৪০ বছর পূর্তি নিয়ে শীঘ্রই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রচারে নামার তোড়জোড় করছিল বিজেপি। এই পরিস্থিতিতে প্রথমে ললিত মোদী কাণ্ড, তার পর আডবাণীর লাগাতার মন্তব্যে সেই প্রচারের ধার ভোঁতা হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিজেপির অন্দরেই।