বারবার মুলতুবির কারণে সোমবার লোকসভায় স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক হল না। কারণ বিরোধী সাংসদেরা পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা দাবি করে বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বের প্রথম দিনে সরব হওয়ার স্পিকারের বিরুদ্ধে তাঁদেরই আনা অনাস্থা প্রস্তাব পেশ হল না লোকসভায়।
বিরোধী সদস্যদের নিরবচ্ছিন্ন বিক্ষোভের কারণে প্রথমে দুপুর ১২টা, তার পর বিকেল ৩টে এবং তার পরদিনের মতো সভা মুলতবি করে দেওয়া হয়। সভা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিজেপি সাংসদ জগদম্বিকা পাল শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং বিড়লার বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবটি গ্রহণ করে সভায় বিতর্কের সুযোগ দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় সভা মুলতুবি করে দেন তিনি। বিরোধীদের আচরণকে ‘অপরিণত এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে বর্ণনা করেন জগদম্বিকা। তিনি বলেন, ‘‘সরকার এবং চেয়ার (দায়িত্বপ্রাপ্ত স্পিকার) উভয়ই প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু বিরোধীরাই বাধা সৃষ্টি করছে।’’
প্রসঙ্গত, বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাবের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার বিড়লা নিজে লোকসভা পরিচালনা করছেন না। গত ১০ ফেব্রুয়ারি দুপুরে, বাজেট অধিবেশনের প্রথম পর্বে লোকসভার সচিবালয়ে স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের নোটিস জমা দিয়েছিলেন কংগ্রেসের মুখ্য সচেতক কে সুরেশ। সমাজবাদী পার্টি বা এসপি, ডিএমকে, শিবসেনা (ইউবিটি), এনসিপি (শরদ)-সহ কয়েকটি বিরোধী দল স্পিকারের বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাতদুষ্ট আচরণে’র অভিযোগ তুলে অনাস্থা প্রস্তাবের নোটিসে সই করেছিল। কিন্তু সেই নোটিসে তৃণমূলের কোনও সাংসদের সই ছিল না। সে দিন সকালে লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, কংগ্রেসের উদ্যোগে স্পিকারের বিরুদ্ধে যে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হচ্ছে তাতে তৃণমূলের সাংসদদের সই করতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু তার আগে বিজেপি-বিরোধী মঞ্চ ‘ইন্ডিয়া’-ভুক্ত দলগুলির যৌথ বিবৃতি দাবি করেন অভিষেক।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক জানিয়ে দেন, সে প্রক্রিয়া মানলে তবেই তৃণমূল তাতে সই করবে। এর পরে শনিবার স্পিকারের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব সমর্থনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল তৃণমূল। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, লোকসভার বাজেট অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদজ্ঞাপন পর্বে বিরোধী দলনেতা রাহুল-সহ বিরোধী দলের বিভিন্ন সাংসদকে বক্তৃতা করতে দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি আট জন সাংসদকে একতরফা ভাবে নিলম্বিত (সাসপেন্ড) করেছেন স্পিকার বিড়লা। ভারতের সংসদীয় ইতিহাস বলছে, অতীতেও লোকসভার স্পিকারকে অপসারণের জন্য চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কোনও বারই তা সফল হয়নি। এ বারের সংসদীয় পাটিগণিতের হিসাবে স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাশ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই।
সংবিধানের ৯৪(সি) অনুচ্ছেদের আওতায় লোকসভার স্পিকারকে পদ থেকে সরানো যেতে পারে। তবে এর জন্য লোকসভার সাংসদদের ভোটাভুটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে স্পিকারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ হওয়া প্রয়োজন। তার আগে ওই প্রস্তাবের জন্য একটি লিখিত নোটিস জমা দিতে হয়। সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী, ওই নোটিস দিতে হয় প্রস্তাবের অন্তত ১৪ দিন আগে। স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা নোটিস আনতে হলে লোকসভার অন্তত দু’জন সাংসদের স্বাক্ষর থাকতে হয়। তবে সর্বোচ্চ কত জনের স্বাক্ষর থাকতে পারে, তার কোনও ঊর্ধ্বসীমা নেই (এ বার এখনও পর্যন্ত বিড়লার বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবে ১২০ জন সাংসদ সই করেছেন)। নোটিসের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরে সেটি গৃহীত হলে আলোচনার জন্য সময় নির্ধারিত হয়। প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার পর থেকে বিবেচনাধীন থাকা পর্যন্ত সময়ে নিম্নকক্ষের কার্যক্রম সাধারণত স্পিকার পরিচালনা করেন না। তাঁর পরিবর্তে ডেপুটি স্পিকার অধিবেশন পরিচালনা করেন। ডেপুটি স্পিকারও অনুপস্থিত থাকলে রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত কোনও সাংসদ নিম্নকক্ষ পরিচালনা করেন।