হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। ‘পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ’ বা খুব কাছ থেকে সরাসরি নিশানা করছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ও কংগ্রেস নেতা গৌরব গগৈকে। তার পরেই অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মাকে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমি ছবির কাউবয়দের বেশে। হাতে রিভলভার। সঙ্গে লেখা, ‘ভিটে, মাটি, জাতি প্রথমে।’
প্রবল সমালোচনার মুখে মুছে দেওয়া হলেও অসম বিজেপির হ্যান্ডল থেকে পোস্ট হওয়া এই ভিডিয়ো নিয়েই আপাতত সরগরম অসম তথা জাতীয় রাজনীতি। বেশ কিছু দিন ধরেই অসমের ‘মিয়াঁ’ তথা উদ্বাস্তু হয়ে অসমে আসা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানা বিতর্কিত মন্তব্য করতে দেখা যাচ্ছে হিমন্তকে। পাশাপাশি গৌরব গগৈ ও তাঁর স্ত্রী এলিজ়াবেথ কোলবার্নের পাকিস্তান-যোগ নিয়ে এ দিনও সরব হয়েছেন তিনি। ভিডিয়োয় গৌরবকে পাকিস্তান হাইকমিশনে বসে থাকতে দেখা গিয়েছে।
ভিডিয়োটি নিয়ে কংগ্রেসের পাশাপাশি সরব হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূলও। এক দিকে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপালের বক্তব্য, “বিজেপির হ্যান্ডল থেকে সংখ্যালঘুদের পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে হত্যার ইঙ্গিতবাহী ভিডিয়ো পোস্ট করা হয়েছে। এটা ট্রোলিং নয়। গণহত্যার আহ্বানের মতো। এ নিয়ে বিচার বিভাগের পদক্ষেপ করা উচিত।” অন্য দিকে তৃণমূলের সাংসদ মহুয়া মৈত্র বিষয়টিকে সরাসরি আন্তর্জাতিক দরবারে নিয়ে যেতে উদ্যোগী হয়েছেন। মালয়েশিয়া সফরে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভিডিয়োটি পোস্ট করে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র সমাজমাধ্যমে ট্যাগ করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে। লিখেছেন, “ইসলাম মালয়েশিয়ার সরকারি ধর্ম। সে দেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ মুসলিম। দেখুন ভারতের এক বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী কী ভাবে মুসলিমদের নিশানা করছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে এর ব্যাখ্যা চান।” এ ভাবে অন্য দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ট্যাগ করে পোস্ট নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন নেটনাগরিকদের একাংশ। কিন্তু তাতে বিজেপির অস্বস্তি কমছে না।
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এখনও এ নিয়ে অসম বিজেপি বা হিমন্তের দফতর মুখ খোলেনি। প্রতিবেশী ভোটমুখী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেও এ নিয়ে বিজেপি নেতারা মন্তব্য করতে রাজি নন। এক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন হিমন্ত। এ বারে অবশ্য তিনি এখনও আসরে নেই। পশ্চিমবঙ্গে সহকারী পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ত্রিপুরার নেতা বিপ্লব দেবকে। হিমন্তের ভিডিয়ো প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বক্তব্য, “বিষয়টি আমার জানা নেই। তাই এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করব না।” রাজনীতিকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘মিয়াঁ’ মুসলিম বলতে হিমন্ত মূলত বঙ্গভাষী মুসলিমদের চিহ্নিত করেন। তাঁদের যেমন অসমের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তেমনই তাঁদের বিপাকে ফেলাই যে তাঁর উদ্দেশ্য তা হিমন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
এর পরেই দেখা গিয়েছে এই ভিডিয়ো। যাতে হিমন্ত সরাসরি ‘মিয়াঁ’ মুসলিমদের নিশানা করেছেন বলে দাবি করছেন বিরোধীরা। রাজনীতিকদের মতে, এর প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে পড়তে পারে। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, নানা কারণে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশ এখন তৃণমূলের উপরে ক্ষুব্ধ। কিন্তু প্রতিবেশী রাজ্যে হিমন্তের কার্যকলাপের ফলে সেই ভোট তৃণমূলের ভাঁড়ারই ফের পূর্ণ করতে পারে, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে বিষয়টি নিয়ে তৃণমূলের তৎপরতাও সহজবোধ্য।
তৃণমূল সাংসদ সুস্মিতা দেবের মতে, “এটাই বিজেপির আসল চরিত্রের প্রতিফলন। আদালত ও অন্য প্রতিষ্ঠান কি ঘুমিয়ে রয়েছে?” ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের প্রশ্ন, “একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কি এমন কথা বলতে পারেন? প্রধানমন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি এগুলি শুনতে পাচ্ছেন না?”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)