Advertisement
২৭ নভেম্বর ২০২২

কালো টাকা সাদা করার আরও একটি প্রকল্প ঘোষণা করল মোদী সরকার

কালো টাকায় গরিব কল্যাণ, ফের কালো আয় ঘোষণার জানলা খুলল কেন্দ্রযেন রবিনহুড! শুরুতে হুঙ্কার ছিল, কালো টাকার কারবারিদের শেষ দেখে ছাড়বেন তিনি। অথচ নোট বাতিলের কুড়ি দিন পরে সেই কালো টাকা সাদা করার আরও একটি প্রকল্প ঘোষণা করল নরেন্দ্র মোদীর সরকার। যা করা ছাড়া উপায় নেই বলে আগেই বলছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

নিজস্ব সংবাদদাতা
নয়াদিল্লি ও কলকাতা শেষ আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০১৬ ০৩:৫৭
Share: Save:

যেন রবিনহুড!

Advertisement

শুরুতে হুঙ্কার ছিল, কালো টাকার কারবারিদের শেষ দেখে ছাড়বেন তিনি। অথচ নোট বাতিলের কুড়ি দিন পরে সেই কালো টাকা সাদা করার আরও একটি প্রকল্প ঘোষণা করল নরেন্দ্র মোদীর সরকার। যা করা ছাড়া উপায় নেই বলে আগেই বলছিলেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তা মানছেন অর্থ মন্ত্রকের কর্তারাও।

প্রধানমন্ত্রী বিলক্ষণ জানেন, কালো টাকা নিয়ে এত সুর চড়ানোর পরে তা সাদা করতে দেওয়া বেসুরো ঠেকে। তাই তার সঙ্গে কৌশলে গরিব-কল্যাণ জুড়ে দিয়েছেন তিনি। সোমবার আয়কর আইন সংশোধনের যে বিল সংসদে পেশ হল, তাতে রয়েছে, জমা পড়া কালো টাকার একটি অংশ ব্যবহার হবে গরিবের উন্নয়নে। অনেকটা ধনীদের কাছে টাকা কেড়ে গরিব মানুষকে বিলিয়ে দেওয়ার রবিনহুডের গল্পের মতো।

বাতিল নোট জমা দেওয়ার সময়ই যদি কেউ তা কালো টাকা বলে ঘোষণা করেন, তবে আয়ের উৎস জানতে চাওয়া হবে না। কিন্তু কর, জরিমানা ও সারচার্জ হিসেবে গুনতে হবে ৫০%। যার মধ্যে ১০% সারচার্জের নাম দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ সেস। এ ছাড়া, বাকি টাকার অর্ধেক চার বছর জমা রাখতে হবে প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ জমা প্রকল্পে। ওই সময়ে তা তোলা যাবে না। মিলবে না সুদও। আর সেস ও জমা প্রকল্পে রাজকোষে আসা টাকাই কাজে লাগানো হবে সেচ, পরিকাঠামো, প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শৌচাগার নির্মাণের কাজে।

Advertisement

রাজস্ব সচিব হাসমুখ অধিয়া বলেন, ‘‘আয়ের উৎস জানতে চাওয়া হবে না। সম্পদ কর বা অন্যান্য কর আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। যাঁদের বিরুদ্ধে বিদেশি মুদ্রা পরিচালন আইন, আর্থিক নয়ছয় আইন, ড্রাগ পাচার বা বেনামি সম্পত্তি আইনে মামলা চলছে, তাঁরা অবশ্য ছাড় পাবেন না।’’ সব মিলিয়ে এই প্রকল্প সফল হবে বলেই তিনি আশাবাদী।

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, ১০ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত পুরনো পাঁচশো-হাজারের নোটে জমা পড়েছে ও বদলানো হয়েছে ৮.৪ লক্ষ কোটি টাকা। যা ওই দুই নোটে থাকা মোট অঙ্কের ৬০%। কেন্দ্র জানিয়েছে, যাঁরা ইতিমধ্যে টাকা জমা দিয়েছেন, তাঁরাও সদ্যঘোষিত প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। কেন্দ্র ঘোষণা করেছিল, ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরনো নোট জমা দেওয়া যাবে। সরকারি সূত্রের খবর, এই প্রকল্পের সময়সীমাও ৩০ ডিসেম্বর হবে। বিল পাশের পরে বিজ্ঞপ্তি জারির সময় তারিখ নির্দিষ্ট ভাবে ঘোষণা হবে।

কালো টাকার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী নোট বাতিলের নিদান দিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু সরকার বুঝতে পারছিল যে, আইনের চোখে ফাঁকি দিয়ে কালো টাকা সাদা করার চেষ্টা চলছে। অনেক ক্ষেত্রে তা হচ্ছেও। কখনও আঙুলে কালি, কখনও সরাসরি নোট বদল বন্ধ করে তা আটকানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু বিস্তর ফাঁকফোকর রয়ে যাচ্ছিল তারপরেও। যেমন, অভিযোগ উঠছিল, অনেকে কালো টাকা সাদা করতে তা কিছু গরিবের জন-ধন অ্যাকাউন্টে জমা করছেন।

বিশেষজ্ঞদের অনেকের প্রশ্ন ছিল, কেউ তো দাবি করতেই পারেন যে, হাতে থাকা নগদ টাকা তাঁর আয়ের। তিনি আগেই কর মিটিয়েছেন। কিংবা ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার পরে এর পর তিনের পাতায় চলতি বছরের আয়ের অংশ হিসেবে দেখিয়ে তা মেটাবেন। সে ক্ষেত্রে বড়জোর ৩০% কর দিয়ে পার পাবেন তিনি। তাহলে আর আগের বার কর-জরিমানা মিলিয়ে ৪৫% গুনে স্বেচ্ছায় কালো টাকা ঘোষণার যৌক্তিকতা থাকবে কী ভাবে? সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা স্বেচ্ছা আয় ঘোষণা প্রকল্পে ৪৫% কর-জরিমানা মিটিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছিল কেন্দ্র। তাতে জমা পড়েছিল প্রায় ৬৫ হাজার কোটি।

অর্থ মন্ত্রকের শীর্ষ কর্তারাও বলছেন, এ ছাড়া উপায় ছিল না। তাঁদের দাবি যে, বিশেষজ্ঞদেরও পরামর্শ ছিল, কালো টাকাকে নতুন নোটে ফের কালো করার উপায় খুঁজতে না দিয়ে বরং মোটা কর-জরিমানা গুনে সরকার তা সাদা করার সুযোগ দিক। তাতে রাজস্ব বাড়বে। তা গরিব-কল্যাণে ব্যবহার করা যাবে। তা ছাড়া, কালো টাকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জন-ধন অ্যাকাউন্টে হাত দেওয়াও সহজ নয়। কারণ, তাতে গরিবদের হেনস্থা করার দায়ে পড়তে হতে পারে সরকারকে।

কর বিশেষজ্ঞ নারায়ণ জৈনের মতে, নিজে থেকে কালো টাকা জানানোই এখন সুবিধাজনক। অন্যান্য কর বিশেষজ্ঞদের মতেও, স্বেচ্ছায় কালো টাকা ঘোষণার প্রকল্প সফল করতেই ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ৭৫%-৮২.৫% করের খাঁড়া।

বিরোধীরা অবশ্য বলছেন, বাস্তবে আগের থেকে কিছুটা বেশি কর-জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার আরও একটি জানলা খুলে দিল সরকার। তা-ও আবার এত হুঙ্কারের পরে। আর দিল্লি দরবারের অনেকে বলছেন, এই অভিযোগ আঁচ করেই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ যোজনা। বলা হয়েছে, সেখানকার টাকা খরচ হবে সেচ, পরিকাঠামো, শৌচাগারে। দাবি করা হয়েছে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য, ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠা। যাতে চট করে এর বিরোধিতা করা কঠিন হয়।

নোট নাকচের পর ভোগান্তি নিয়ে মোদীকে নিয়মিত কাঠগড়ায় তুলছেন বিরোধীরা। পাল্টা হিসেবে কার্যত গরিব-ধনীর মেরুকরণ শুরু করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, এই লড়াই ধনীদের কালো টাকার বিরুদ্ধে। জনসভা থেকে ‘মন কি বাত’— সর্বত্র আমির-গরিবের ভেদাভেদ সামনে এনেছেন প্রধানমন্ত্রী। শূন্য এটিএম আর ব্যাঙ্কে লম্বা লাইন নিয়ে মানুষের ক্ষোভ বাড়তে না দিয়ে চেষ্টা করেছেন তাঁদের পাশে টানার। বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, তিনি সবই করছেন গরিবদের জন্য। এই প্রচারকেই এ দিন সংসদের উঠোনে এনেছেন মোদী। প্রমাণ করতে চেয়েছেন, কালো টাকার কারবারিদের সিন্দুকের ধন তিনি খরচ করতে চান গরিবদের উন্নয়নে।

এক বিরোধী নেতা বলছিলেন, নিজের নাম খোদাই করা স্যুট পরার পরে ‘স্যুট-বুটের সরকার’ বলে কটাক্ষ শুনেছেন মোদী। এখন ধনীদের কালো টাকায় গরিবের শৌচাগার করার প্রকল্প আনছেন তিনি!

রবিনহুড জঙ্গলে থাকতেন। রাজনীতির প্যাঁচও গভীর জঙ্গলের রাস্তার থেকে কম ঘোরালো নয়।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.