Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৭ জুলাই ২০২২ ই-পেপার

URL Copied

দেশ

সোনার বিশাল বিষ্ণুমূর্তি, সিংহাসন, হিরে-পান্না... এই মন্দিরের গুপ্তসম্পদ হতবাক করে বিশ্বকে

নিজস্ব প্রতিবেদন
২০ এপ্রিল ২০২০ ১২:৪৫
মালয়লম ভাষায় ‘তিরুঅনন্তপুরম’ কথার অর্থ হল ভগবান অনন্তের পুর বা শহর। এই অনন্ত হলেন স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু। তাঁর আর এক রূপ ‘পদ্মনাভ’। তিনি এই রূপে অনন্তশয়ানে বিরাজ করছেন কেরলের রাজধানীর এক প্রাচীন মন্দিরে। সেই মন্দিরের নাম ‘পদ্মনাভস্বামী মন্দির’। দেবালয়ে বিগ্রহের অনন্তরূপ থেকেই কেরলের রাজধানীর নামকরণ হয়েছে।

ব্রহ্মপুরাণ, মৎস্যপুরাণ, বরাহপুরাণ, স্কন্দপুরাণ, পদ্মপুরাণ, বায়ুপুরাণ, ভাগবৎপুরাণ-সহ একাধিক প্রাচীন রচনায় এই দেবস্থানের উল্লেখ আছে। বিভিন্ন যুগে এর দায়িত্বে ছিল বিভিন্ন রাজপরিবার। গত কয়েকশো বছর ধরে মন্দিরের দায়িত্ব রয়েছে ত্রিবাঙ্কুরের রাজপরিবারের উপরে। আদিশেষ নাগের উপরে অনন্তশয়ানে বিষ্ণুর রূপ তাঁদের পরিবারের আরাধ্য দেবতা। বলা হয়, দ্রাবিড়ীয় এবং চেরা ঘরানায় নির্মিত এই মন্দিরে যা রাজঐশ্বর্য আছে, পৃথিবীতে ইতিহাস লেখা শুরু হওয়ার পরে সেই পরিমাণ সম্পদ আর কোথাও সঞ্চিত হয়নি।
Advertisement
জনশ্রুতি বা কিংবদন্তি যে আদৌ মিথ্যা নয়, তার প্রমাণ কিছুটা হলেও পাওয়া গিয়েছিল ২০১১ সালে। একটি জনস্বার্থ মামলা চলাকালীন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে খোলা হয়েছিল মন্দিরের সম্পদের ভাণ্ডার। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শাসক, বণিক এবং সাধারণ ভক্ত এখানে দেবতাকে অর্ঘ্য দিয়েছেন। এমনকি, প্রাচীনকাল থেকে যে বিদেশিরা এসেছেন, তাঁরাও অর্পণ করেছেন বন্দরনগরীর এই দেবালয়ে। সঞ্চিত সম্পদভাণ্ডার হার মানিয়েছে রূপকথা এবং কল্পনার পরিধিকে।

দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে মন্দির কর্তৃপক্ষ জানতেন, মন্দিরে ছ’টি গুপ্ত প্রকোষ্ঠ আছে। মন্দিরের পশ্চিম অংশে গর্ভগৃহের কাছে রয়েছে এই প্রকোষ্ঠগুলি। সুবিধের জন্য পরবর্তীকালে এদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’, ‘ই’ এবং ‘এফ’। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গুপ্তধন গণনার নির্দেশ দেওয়া হলে জানা যায়, রয়েছে আরও দু’টি প্রকোষ্ঠ। তাদের নাম দেওয়া হয় ‘জি’ এবং ‘এইচ’।
Advertisement
প্রকোষ্ঠ বলা হলেও এগুলি আদপে ঘর। যেগুলির মেঝে থেকে ছাদ অবধি পূর্ণ ঐশ্বর্যে। অন্য ঘরগুলি খোলা হলেও দ্বিতীয় প্রকোষ্ঠ বা ভল্ট বি-র দরজা খোলা হয়নি গত কয়েকশো বছর ধরে। মনে করা হয়, এর ভিতরে যা সম্পদ আছে, তা গুনতে গেলে যে কোনও একক-ই কম পড়তে পারে। পাশাপাশি, ‘জি’ এবং ‘এইচ’ প্রকোষ্ঠও বন্ধ রয়েছে কয়েকশো বছর ধরে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে অন্য প্রকোষ্ঠের সঙ্গে খোলার চেষ্টা করা হয় ভল্ট বি-কেও। ধাতব গ্রিল, কাঠের দরজা খোলা সম্ভব হয়। তার পরে ছিল একটি লোহার দরজা। সেটা খোলা সম্ভব হয়নি। ঠিক হয়, খবর দেওয়া হবে এক জন কর্মকারকে। কিন্তু তার আগেই সুপ্রিম কোর্ট এই ভল্ট খোলার ব্যাপারে স্থগিতাদেশ দেয়। এই প্রকোষ্ঠের ওই লোহার দরজায় ভীষণদর্শন সাপের মূর্তি খোদাই করা আছে। প্রচলিত বিশ্বাস, ভিতরের সম্পদ পাহারা দিচ্ছে এক যক্ষী। দরজা খুললে অভিশাপ অনিবার্য।

‘সি’, ‘ডি’, ‘ই’ এবং ‘এফ’, এই চারটি প্রকোষ্ঠ বছরের নির্দিষ্ট সময়ে খোলা হয়। সেখান থেকে ধনসম্পদ এবং প্রয়োজনীয় জিনিস কাজে লাগানো হয় ধর্মীয় উৎসবে। ২০১১-র ৩০ জুন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে খোলা হয় এর প্রথম প্রকোষ্ঠ অর্থাৎ ভল্ট ‘এ’। সেখানে ঢোকার জন্যেও লোহার এবং কাঠের দু’টি দরজা ভাঙতে হয়। তার পর ঘরে ঢুকে সরাতে হয় পাথরের ভারী ফলক। দেখা যায়, নীচে অন্ধকারে নেমে গিয়েছে গুপ্ত সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে নেমে খোঁজ পাওয়া যায় গুপ্তধনের। সংখ্যায় এক লক্ষের বেশি কোটি কোটি টাকার অমূল্য সম্পদ রাখা ছিল এই গুপ্তকক্ষে।

সব প্রকোষ্ঠে মাটি ও ধাতুর পাত্র, ঝুড়ি ভরে ভরে রাখা ছিল ধনঐশ্বর্য। কী কী ঐশ্বর্য পাওয়া গিয়েছে এই মন্দির থেকে, তার সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ্যে আসেনি। তবে অনুমান করা হয়েছে শুধু ভল্ট ‘ই’ এবং ‘এফ’ থেকে পাওয়া গিয়েছে ৪০ রকমের জিনিস। ‘সি’ এবং ‘ডি’ নামের ঘরে পাওয়া গিয়েছে ৬১৭ রকমের জিনিস।  (প্রতীকী ছবি)

বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী সম্পদের বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল সংবাদমাধ্যমে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য যে জিনিসগুলি ছিল, তা দীর্ঘদিন সংবাদ শিরোনামে ছিল। তার মধ্যে অন্যতম হল শ্রীবিষ্ণুর চার ফুট উঁচু এবং তিন ফুট চওড়া সোনার মূর্তি। সারা বিগ্রহে খোদাই করা আছে অসংখ্য হিরে ও দামী রত্ন।

এই বিগ্রহকে বিশেষ অনুষ্ঠানে পরানোর জন্য আছে সনাতনী পোশাক ‘আঁখি’। সম্পূর্ণ সোনার তৈরি মোট ১৬টি পাল্লার এই পোশাকের ওজন ৩০ কেজি। দেবতার অঙ্গভূষণ হিসেবে রয়েছে ১৮ ফুট লম্বা সোনার হার। আছে সোনার তৈরি ধানের ছড়া, যার ওজন ৫০০ কেজি। সোনার ওড়না আছে, যার ওজন ৭৬ কেজি। মধ্যযুগের সোনার মুদ্রা আছে ৬০০ কেজি ওজনের। (প্রতীকী ছবি)

আছে মোট ১২০০টি সরপ্পলি। দক্ষিণের এই ঐতিহ্যবাহী সোনার হারে বসানো থাকে দামি পাথর। অস‌ংখ্য বস্তা আছে, যার মধ্যে ছিল মুঠো মুঠো সোনার জিনিস, নেকলেস, কোমরের বিছে। গয়নায় বসানো হয়নি এ রকম হিরে, চুনি, পান্না, পোখরাজ এবং অন্যান্য রত্নপাথর আছে অগণিত। আছে সোনার তৈরি প্রমাণ মাপের সিংহাসনও। (প্রতীকী ছবি)

পাওয়া গিয়েছে সোনার তৈরি নারকেলের খোল। যার গায়ে বসানো আছে চুনি আর পান্না। গয়না এবং মূল্যবান জিনিসের পাশাপাশি এই মন্দিরে রাখা আছে মুদ্রার বিরল ও অমূল্য ভাণ্ডার। প্রাচীন রোমান সভ্যতা থেকে শুরু করে অষ্টাদশ শতকের নেপালিয়নের সমসাময়িক মুদ্রা সেখানে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের নানা সময়কালের মুদ্রা রাখা আছে মন্দিরের কোষাগারে। খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দের সোনার মুদ্রা আছে, যার ওজন প্রায় ৮০০ কেজি। (প্রতীকী ছবি)

অন্তত তিনটি সোনার মুকুট আছে। যাদের সারা গায়ে খোদাই করা আছে হিরে আর মূল্যবান পাথর। সোনার তৈরি বিগ্রহের বসার চেয়ার আছে কয়েকশো। পাওয়া গিয়েছে কয়েকশো সোনার পাত্র। (প্রতীকী চিত্র)

চের, পাণ্ড্য, পল্লব, চোল-সহ বিভিন্ন রাজবংশ মূল্যবান অর্ঘ্য দিয়েছে পদ্মনাভস্বামীকে। এ ছাড়া মেসোপটেমিয়া, জেরুজালেম, গ্রিস, রোম এবং পরে ইউরোপের বিভিন্ন উপনিবেশ থেকে শাসক ও বণিকরা এই মন্দিরে দেবার্ঘ্য দিয়েছেন। কয়েক হাজার বছর ধরে সঞ্চিত হয়েছে মন্দিরের গুপ্তধন ভাণ্ডার। প্রাচীন ভারতে এই মন্দির পরিচিত ছিল ‘সোনার মন্দির’ হিসেবে।

প্রাচীন মহাকাব্য শিলাপ্পটিকরম-এ বলা হয়েছে চের-রাজা চেনকুট্টুবান সোনা ও মূল্যবান রত্ন ভেট পাচ্ছেন সোনার মন্দির থেকে। ধরে নেওয়া হয় এই মন্দির আসলে পদ্মনাভস্বামীর মন্দিরই।

বহিরাগত শত্রুর আক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতেও বহু রাজপরিবার এই মন্দিরের দুর্ভেদ্য কোষাগারে সঞ্চিত রেখেছে তাদের ঐশ্বর্য। পরে হয়তো শত্রুর আক্রমণে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে রাজবংশ। কিন্তু তাদের সম্পদ গচ্ছিত ও নিরাপদ রয়ে গিয়েছে ভগবান পদ্মনাভর আশ্রয়ে। কয়েক হাজার বছর ধরে এ ভাবেই তিলে তিলে সংরক্ষিত হয়েছে প্রাচীন এই মন্দিরের ঐশ্বর্য।
(ছবি: শাটারস্টক এবং সোশ্যাল মিডিয়া)