Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

দেশ

দেশ ২০২০ ।। এমন বছর আগে আসেনি ।। ১২ মাস ।। ১২ ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদন
২৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:০০
কোনও বছরই আগের বছরের মতো হয় না। কিন্তু ২০২০ সালটা শুধু আলাদা নয়, ভয়ঙ্কর রকমের আলাদা হয়ে রইল। এমন বছর সত্যিই আসেনি। চিন থেকে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস সারা পৃথিবীর মতো ছারখার করে দিয়ে গেল এ দেশকেও। জীবন জীবিকা শিক্ষা স্বাস্থ্য খেলা বিনোদন— সব কিছুতেই লন্ডভন্ড অবস্থা। করোনার পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুতর ঘটনাও ঘটে গিয়েছে গোটা বছরে। এই চিত্র-প্রতিবেদনে আনন্দবাজার ডিজিটাল বেছে নিল বছরের প্রত্যেকটা মাসের একটা করে সেরা ছবি। সেই মাসের ছবি। সেই মাসের-কথা বলা ছবি।

সংসদে বিল জমা পড়ার সময় থেকেই বিতর্ক মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। কিন্তু সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরোধিতায় কনকনে ঠান্ডায় দলে দলে সংখ্যালঘু মহিলা ঘর থেকে বেরিয়ে একটানা সাড়ে ৩ মাস দিল্লির রাস্তায় পড়ে থাকবেন, কেউ কল্পনা করেননি। বছরের শুরুতে সারা দেশের আলোচনা এবং তর্কবিতর্কের কেন্দ্র ছিল শাহিনবাগ। কিশোরী থেকে তরুণী, মধ্যবয়স্কা থেকে অশীতিপর বৃদ্ধা, এমনকি দুধের শিশুকে আঁকড়ে রাখা মায়েরা, রাতের পর রাত খোলা আকাশের নীচে অবস্থান চালিয়ে যান। সিএএ, এনআরসি (জাতীয় নাগরিক পঞ্জি), এনপিআর (জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জি) বিরোধী শাহিনবাগ আন্দোলনের রেশ ছড়িয়ে পড়ে তাকে দেশের অন্যান্য প্রান্তেও। ২০১৯-এর ১৪ নভেম্বর থেকে ২০২০-র ২৪ মার্চ পর্যন্ত এই অবস্থান বিক্ষোভ চলে। করোনা আবহে উঠে যেতে বাধ্য হন আন্দোলনকারীরা।
Advertisement
একাধিক বার হামলা বা হামলার চেষ্টা হয়েছে শাহিনবাগে। শাহিনবাগের আদলে রাজধানীর অন্যত্রও অবস্থান ঘিরে চলছে বিতর্ক। বিতর্ক কখনও কখনও উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে। এ সবের মধ্যে আচমকা উত্তর-পূর্ব দিল্লি হয়ে ওঠে জতুগৃহ। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি, টানা ছ’দিন তাণ্ডব চলে রাজধানীতে। ৫৩ জন প্রাণ হারান যাঁদের মধ্যে পুলিশকর্মীও আছেন। দিল্লি যখন জ্বলছে, তার মধ্যেই গুজরাত সফরে আসেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

৩০ জানুয়ারি ভারতে প্রথম করোনা রোগীর হদিশ মেলে কেরলে। ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৩ দাঁড়ায়। ৪ মার্চ একদিনে নতুন সংক্রমণ ধরা পরে ২৩ জনের শরীরে। ২৪ মার্চ কোভিডে ম়ৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয় ১০। ওই রাতেই পরদিন থেকে দেশ জুড়ে ২১ দিনের লকডাউন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তার পর আরও তিন দফায় লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। শেষমেশ ১ জুন থেকে ধীরে ধীরে শুরু হয় আনলক পর্ব। তখন দেশে মোট সংক্রমণ ১ লক্ষ ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে। মৃত্যু সাড়ে ৫ হাজারের কাছাকাছি।
Advertisement
আচমকা লকডাউন ঘোষণা। বিপাকে পড়ে যান রোজগারের সন্ধানে ভিন্ রাজ্যে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকরা। রাতারাতি রোজগার বন্ধ। যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় বাড়ি ফেরারও উপায় ছিল না। হাঁটাপথেই কয়েকশো কিলোমিটার পেরিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন দলে দলে শ্রমিক। কখনও দুর্ঘটনার কবলে, কখনও চিকিৎসা না পেয়ে, কখনও আবার খিদে সহ্য করতে না পেরে অনেকের মৃত্যু হয়। আত্মহত্যার পথও বেছে নেন কেউ কেউ। এ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও সরকারি তথ্য নেই। তবে সমাজকর্মী তেজেশ জিএন এবং জিন্দল গ্লোবাল স্কুল অব ল-র গবেষক কণিকা শর্মা-সহ কয়েকজন গবেষক একটি সমীক্ষা প্রকাশ করে দাবি করেছেন, লকডাউনের সময় ৯৭১  জন পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এঁদের মধ্যে কেউই করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হননি।

২০ মে সুন্দরবনের সাগর দ্বীপের কাছে উপকূলে আছড়ে পড়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আমপান (প্রকৃত উচ্চারণ উমপুন)। প্রায় ১৩৩ কিলোমিটার গতিবেগের ওই ঝড়ে কার্যত লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল কলকাতা, দুই ২৪ পরগনা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বড় এলাকা। ২৮ লক্ষ ৬ হাজার বাড়ি ধুলিসাৎ হয়ে যায়। নষ্ট হয় ১৭ লক্ষ হেক্টর জমির ফসল। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ক্ষতি হয় বিপুল। বহু জায়গায় রাস্তা, সেতু, পানীয় জল সরবরাহের প্রকল্প, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। আমপানের তাণ্ডবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, বাড়ির দেওয়াল ভেঙে পড়ে পশ্চিমবঙ্গে কমপক্ষে ৮৬ জন প্রাণ হারান। কলকাতাতেই মৃত্যু হয় ১৯ জনের। ঝড়ের দাপটে শহর জুড়ে প্রায় ১০ হাজার গাছ উপড়ে পড়ে।

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা লঙ্ঘন করে ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে আসা নিয়ে ৫ মে প্রথম বার প্যাংগংয়ের তীরে চিনা বাহিনীর সঙ্গে সঙ্ঘর্ষ বাধে ভারতীয় জওয়ানদের। তার পর ১০ মে ফের একপ্রস্থ গোলমাল। তাতে দু’পক্ষের অনেকে আহত হন। সেই নিয়ে দু’দেশের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলাকালীন ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় ফের টানা ছ’ঘণ্টা ধরে সঙ্ঘর্ষ চলে। ২০ জন ভারতীয় জওয়ান প্রাণ হারান। চিনের তরফেও কমপক্ষে ৪০ জন প্রাণ হারিয়েছে বলে নানা সূত্রে খবর। কিন্তু গালওয়ানে তাদের কত জন সেনা প্রাণ হারান, তা আজ পর্যন্ত খোলসা করেনি চিন। তার পর থেকে দফায় দফায় আলোচনা হলেও, লাদাখ ঘিরে এখনও পর্যন্ত তিক্ততা কাটেনি দুই দেশের।

দেশে প্রথম আনলক পর্ব শুরু হয় ১ জুন। দ্বিতীয় দফায় ১ জুলাই থেকে। এই একমাসে কোভিড সংক্রমণ প্রায় তিন গুণ হয়ে গিয়েছে। মৃত্যু বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। দ্বিতীয় দফার আনলকেও স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। তবে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে সরকারি এবং বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলি খোলার অনুমতি দেয় কেন্দ্র। অফিস খোলার অনুমতি মেলে। যানবাহনের উপর নিষেধাজ্ঞা কমে। জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা ছাড়া রাত ১০টা থেকে সকাল ৫টা পর্যন্ত সকলের জন্য নাইট কার্ফু জারি হয়। সর্বাধিক ৫০ জনের জমায়েতে বিয়েবাড়ির অনুমতি দেওয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্ট রায় আগেই হয়ে গিয়েছিল। মাঝে করোনা আবহে থমকে গিয়েছিল পরিকল্পনা। শেষমেশ ৫ অগস্ট অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতে রামমন্দিরের শিলান্যাস করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত। মন্দির শিলান্যাসের দিনটিকে স্বাধীনতা দিবসের সঙ্গে তুলনা করেন প্রধানমন্ত্রী। ৩ বছরের মধ্যে মন্দিরের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। শুধুমাত্র মন্দিরের বাজেটই রাখা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। মন্দির সংলগ্ন ২০ একর জমিতে ১০০০ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ হবে বলে রামজন্মভূমি ট্রাস্টের তরফে বলা হয়েছে।

দৈনিক নতুন কোভিড সংক্রমণের সংখ্যায় অগস্টেই আমেরিকা আর ব্রাজিলকে ছাপিয়ে যেতে থাকে ভারত। সেপ্টেম্বরের প্রত্যেকটা দিনই দৈনিক সংক্রমণে ভারত ছিল শীর্ষে। ১৭ সেপ্টেম্বর দেশে একদিনে ৯৭ হাজার ৮৯৪ জন মানুষ করোনায় আক্রান্ত হন। দৈনিক সংক্রমণের নিরিখে ভারতে এখনও পর্যন্ত এটাই সর্বোচ্চ। তার আগে ৭ সেপ্টেম্বর মোট সংক্রমণে ব্রাজিলকে টপকে ২ নম্বরে উঠে আসে ভারত। মোট সংক্রমণে এখনও বিশ্বে শীর্ষে আমেরিকা, দ্বিতীয় স্থানে ভারত।  

কোভিডের ধাক্কায় বন্ধ হয়েছে একের পর এক টুর্নামেন্ট। কিন্তু জনপ্রিয়তা এবং ব্যবসা— ২ দিকে থেকেই দেশের খোলাধুলোয় শীর্ষে থাকা আইপিএল শেষ পর্যন্ত সময়ের পরে হলেও হল। নেতৃত্বে বোর্ড প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়।মাঠভর্তি দর্শক, হইহুল্লোড় ছাড়া আইপিএল-এর কথা ভাবতেই পারতেন না কেউ। কিন্তু ২০২০ সেই ছবিকেও পাল্টে দিল। দুবাই, আবু ধাবি এবং শারজা-তে এ বছর আইপিএল আয়োজিত হয়। অতিমারি পরিস্থিতিতে স্টেডিয়াম ছিল দর্শকশূন্য। টিভি, মোবাইল এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমেই ক্রিকেট-প্রেমের সাধ মেটাতে হয়েছে সকলকে। গুগল ইন্ডিয়ায় সবচেয়ে বেশি সার্চ হয়েছে আইপিএল-ই। করোনাভাইরাস এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও আইপিএল-এর থেকে পিছিয়ে। এ বারে পঞ্চমবারের জন্য আইপিএল-এ জয়ী হয় মুম্বই ইন্ডিয়ান্স।

কোভিড পর্বে প্রথম কোনও রাজ্যে পূর্ণাঙ্গ ভোট হল। নির্বাচন কমিশন থেকে যুযুধান দলগুলো, সবার কাছেই কোভিড ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে কোভিড-বিধি ভাঙার অভিযোগ উঠলেও সব মিলিয়ে নির্বিঘ্নেই মিটেছে ভোটপর্ব। ফের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন নীতীশ কুমার। তবে তাঁর দল আসন সংখ্যায় নেমে এসেছে তিন নম্বরে। জেডিইউ যেখানে ৪৩ আসনে জিতেছে, সেখানে জোট শরিক বিজেপি ৭৪টি আসন পেয়ে একধাক্কায় নিজেদের ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে নিয়েছে। লালুপুত্র তেজস্বীর নেতৃত্বে আরজেডি এ বারও একক বৃহত্তম দল ৭৫ আসন পায়।

বছরের শুরুতে মোদী সরকারের বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল শাহিনবাগ আন্দোলন। কৃষক আন্দোলন মাথাব্যথা হয়ে উঠল বছর শেষে। নয়া কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছেন কৃষকরা। প্রথমে পঞ্জাবের মধ্যেই আন্দোলন সীমিত ছিল। শেষমেশ দিল্লির দরজায় চলে আসে। হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ থেকেও বহু কৃষক এসে এতে যোগ দিয়েছেন। দফায় দফায় আলোচনা হয়েছে কেন্দ্র আর কৃষক প্রতিনিধিদের। কিন্তু কোনও সমঝোতা-সূত্র বেরোয়নি। দিল্লি-পঞ্জাব এবং দিল্লি-সিঙ্ঘু সীমানায় এখনও বসে আন্দোলনকারী কৃষকরা।