একই দিনে দেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্টকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ এবং সিনাই প্রদেশে তিন বিচারক খুনের ঘটনায় অশান্ত মিশর। কায়রো এই দু’টি ঘটনাকে আপাত সম্পর্কহীন বললেও, সিঁদুরে মেঘ দেখছে পিরামিডের দেশ।

২০১১-য় জেল ভাঙার অপরাধে মিশরের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মুরসিকে আজ মৃত্যুদণ্ড দিল দেশের এক অপরাধ-দমন আদালত। ক্ষমতায় থাকাকালীন বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতার এবং নির্যাতনের দায়ে তাঁকে ২০ বছরের হাজতবাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল আগেই। এ বার পেলেন সর্বোচ্চ শাস্তির আদেশ।

একই সাজা শোনানো হয়েছে মুরসির সঙ্গে আরও ১৩০ জনকে। যাদের অধিকাংশই মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রাক্তন নেতা-কর্মী তথা মুরসি সমর্থক। জেল-ভাঙার পাশাপাশি পুলিশের উপর হামলার অভিযোগেও দোষী সাব্যস্ত এরা। ২০১১-য় দেশের তিনটি জেল থেকে পালায় ২০ হাজারেরও বেশি কয়েদি। অভিযোগ, মুরসিই ছিলেন এর মূল চক্রী। পরে এই বিক্ষোভের জেরেই ক্ষমতাচ্যুত হন দেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক।

তবে মুরসি ও তাঁর সমর্থকদের এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিচারককে অবশ্যই দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের মতামত নিতে হবে বলে প্রশাসন সূত্রের খবর। আদালতের চূড়ান্ত রায় জানা যাবে ২ জুন।

কড়া নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই আজ আদালতে নিয়ে আসা হয় মুরসিকে। রায়দানের সময় মৃদু প্রতিবাদও করেন তিনি। তবে এই রায়কে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আদালত চত্বরেই বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন মুরসি-সমর্থকরা। মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা সংগঠন ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির সহ-প্রতিষ্ঠাতা দরাগ বলেন, ‘‘ন্যায়বিচারের নামে অরাজকতা চলছে দেশ জুড়ে। খুনি আদালতের এই রায় কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’’ পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক সাহায্যেরও আবেদন জানান তিনি।

দেশের সার্বিক পরিস্থিতি উত্তাল হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে সিনাই প্রদেশের একটি ঘটনাতেও। অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকবাজের হামলায় এখানে প্রাণ গিয়েছে তিন বিচারকের। গুরুতর আহত আরও তিন। মুরসিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই এই ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান মোতাবেক, আল-আরিস শহরে একটি বাসে হামলা চালায় দুষ্কৃতীরা। এখনও কোনও সংগঠন এই হামলার দায় না নিলেও, ইসলামিক স্টেটের দিকেই অভিযোগের আঙুল উঠছে। প্রশাসনের দাবি, সন্দেহের বাইরে নয় মুসলিম ব্রাদারহুডও।

হোসনি মুবারক ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরই ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসেন মুরসি। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। বিক্ষোভ সামাল দিতে মুসলিম ব্রাদারহুডকেই এগিয়ে দেন মুরসি। ২০১২-র ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদের বাইরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় মুরসি-সমর্থকদের। প্রাণ যায় এক সাংবাদিক-সহ ১০ জনের। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই মুরসিকে গত মাসে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয় কায়রোর এক আদালত।

মুরসি অবশ্য বরাবরই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ নস্যাৎ করে এসেছেন। তবু শেষরক্ষা হয়নি। ২০১৩-য় তাঁকে উৎখাত করে মিশরের সেনাবাহিনী। দেশের নয়া প্রেসিডেন্ট হন আব্দেল ফতাহ অল-সিসি। অভিযোগ, তার পর থেকেই মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা শুরু করে কায়রো। সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পাশাপাশি শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড় ও বিচার। সব মিলিয়ে গত দু’বছরে কয়েক হাজার ব্রাদারহুড কর্মীর মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে। আজ সেই তালিকায় মুরসিরও নাম যোগ হওয়ায়, সংগঠনের অস্বস্তি আরও বাড়ল বলেই মনে করা হচ্ছে।

মুরসির বিরুদ্ধে দেশের গোপন তথ্য পাচারের পাশাপাশি লেবাননের হিজবুল্লা, প্যালেস্তাইনের হামাস ও ইরানের ইসলামিক গার্ডের হয়ে দেশের বিরুদ্ধে চরবৃত্তির অভিযোগও রয়েছে। আজ এই মামলাতেও ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে অন্য একটি আদালত। মুরসির কী হবে, জানা যাবে পরবর্তী শুনানিতে।