বেশ কয়েক বছর ধরেই কেপটাউনের জলের ভাঁড়ারে টান পড়েছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে কেপ টাউন পুরসভা ঘোষণা করেছিল, ১২ই মে, ২০১৮ থেকে শহরের কোনও কল দিয়ে আর জল পড়বে না।  কর্মসূত্রে বছর তিনেক এ দেশে রয়েছি। মনে হল, ভিন্‌ দেশি হলেও, এক জন কেপটাউনবাসী হিসেবে এই লড়াইয়ে শামিল হওয়া আমার কর্তব্য। 

আমার কর্মক্ষেত্র কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয় মনে করল, দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এই জল বাঁচাও আন্দোলনে আমাদের বিশেষ ভূমিকা নেওয়া উচিত। সমস্ত বিভাগের মতো আমাদের রসায়ন বিভাগেও বিশেষ বৈঠক ডাকা হল যে, এই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে কী ভাবে জলের ব্যবহার কমানো যায়। বিভাগীয় প্রধান থেকে শুরু করে সাফাইকর্মী, সবাইকে আহ্বান জানানো হল এই বিষয়ে নিজস্ব মতামত ও নতুন ধারণা দেওয়ার জন্য। ভারতীয় অভিজ্ঞতা থেকে আমি টয়লেটে ফ্লাশের বদলে বালতি ও মগের ব্যবহারের কথা বললাম, যেটা পশ্চিমের দেশগুলোর মতো এখানেও তেমন প্রচলিত নয়। রসায়ন পরীক্ষাগারগুলিতে যে সব যন্ত্রে জলের ব্যবহার হত, সেগুলো রাতারাতি পরিবর্তন করে জলবিহীন যন্ত্রের আমদানি করা হল।

বাড়িতে স্নানের সময়ে একটা বড় গামলায় দাঁড়িয়ে শাওয়ার ব্যবহার করতাম যাতে স্নানের জলটাও ধরা থাকে এবং পরে সেটা টয়লেটে ব্যবহার করা যায়। ব্যবহার করা জামাকাপড় জমিয়ে রেখে সাত-দশ দিন অন্তর এক বার ওয়াশিং মেশিনে পরিষ্কার করতাম। ওয়াশিং মেশিনে ব্যবহৃত জলও বড় ড্রামে সংগ্রহ করে সেই জল আমরা টয়লেটে ব্যবহার করতে শুরু করলাম। বাসন ধোয়ার কাজে জলের ব্যবহার কমাতে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ডিশওয়াশারের সাহায্য নিতাম, যার সাহায্যে তিন-চার দিনের জমানো বাসনপত্র মাত্র ১০-১২ লিটার জলে পরিষ্কার করা যায়। আমি ও আমার স্ত্রী চেষ্টা করতাম দু’জনের সংসারে মোট জলের ব্যবহার যেন ৫০ লিটারের মধ্যে থাকে, যা কিনা কেপ টাউন পুরসভা নির্ধারিত জল-ব্যবহারের ঊর্ধ্বসীমার অর্ধেক। 

কেপ টাউনবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাপনেও পরিবর্তন চোখে পড়ত। যে শহর গ্রীষ্মের ছুটির দিনগুলোয় অনেকটা সময় সুইমিং পুলে কাটাত, দেখা গেল সেই শহরেই বাড়ির বা আবাসনের পুলগুলো পুরোপুরি ঢাকা দিয়ে দেওয়া হল, যাতে জল বাষ্পীভূত না হয়ে যায়। যে কেপ টাউনবাসী একটা প্রিয় আরামের বিষয় ছিল, কাজের শেষে বাড়িতে ফিরে বাথটবে গা ভিজিয়ে শুয়ে থাকা, তারাই স্বেচ্ছায় বাথটব ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দিল। তার প্রমাণ পেলাম বাজারে গিয়ে। দেখলাম বিক্রির অভাবে বাথ ফোম, বাথ শ্যাম্পু ইত্যাদি বাথটবে ব্যবহারের সামগ্রীর দাম কমে প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে! 

ঠান্ডা পানীয়র পুরনো প্লাস্টিক বোতলে পাইপ লাগিয়ে মাত্র এক লিটার জলে ২০-২৫ বার হাত ধোয়া, টয়লেট ব্যবহারের পরে প্রত্যেকবার ফ্ল্যাশ না করে ‘লু-ক্লক’-এর ব্যবহার ইত্যাদি নিত্যনতুন পন্থার প্রয়োগ হতে শুরু হল বাড়িতে বাড়িতে। স্কুল-কলেজ, অফিস, শপিংমলে  জলবিহীন টয়লেট এবং টয়লেটে ‘গ্রে-ওয়াটার’ অর্থাৎ ব্যবহৃত বা পানের অযোগ্য জলের ব্যবহার শুরু করা হল।  গ্যারেজগুলো গাড়ি পরিষ্কারের কাজে জলের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করল। আন্তর্জাতিক পর্যটকেরাও যাতে এই লড়াইতে শামিল হতে পারেন, সে জন্য কেপ টাউনগামী সমস্ত উড়ানে জলসঙ্কট পরিস্থিতি ও জল ব্যবহারের বিধিনিষেধ ঘোষিত হল। ছোট-বড় সমস্ত হোটেলে বাথটব, সুইমিং পুল ইত্যাদির ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হল।

শপিংমলগুলোতে গিয়ে দেখলাম, জলের কলগুলো খুলে নেওয়া হয়েছে। তার বদলে রয়েছে হ্যান্ড-স্যানিটাইজ়ার। কোনও কোনও শপিং মলে এটাও দেখলাম যে তারা জেট-টয়লেট চালু করেছে, যা কিনা সাধারণ শৌচাগারের থেকে ৭০-৮০% বেশি জলের সাশ্রয় করে। কেপ টাউন পর্যটনের বিশেষ আকর্ষণ, সমুদ্র সৈকত। বেড়াতে গিয়ে দেখলাম সেখানেও জলবিহীন টয়লেট। সমুদ্র-স্নানের পর গা-ধোয়ার কলগুলোও খুলে নেওয়া হয়েছে। একটি নামকরা রেস্তরাঁয় কফি খেতে গিয়ে দেখলাম কাগজের কাপে কফি দেওয়া হল, উদ্দেশ্য অবশ্যই কাপ ধোওয়ার জল বাঁচানো।                              

লেখক কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিনাল কেমিস্ট্রি ও ড্রাগ ডিসকভারি নিয়ে গবেষণারত