Advertisement
E-Paper

কিছু মায়া রয়ে গেছে ফোঁটায় ফোঁটায়

সব মিলিয়ে ভাইফোঁটার দিনটিকে বাঙালির যৌথতা উদ্‌যাপনের লগ্ন বলেই দেখতে ভাল লাগে। এই যৌথতা কারও ভাল লাগতে পারে, কারও না-ও লাগতে পারে। কিন্তু লতার মতো জড়িয়ে থাকাটাই তখন জীবনচর্যার অঙ্গ। লিখছেন ঋজু বসুখয়ের, সুপুরি, চন্দনবাটার গুঁড়োমাখা টিপ ভাইয়ের কপালে উঁচু হয়ে তাকিয়ে থাকে ড্যাবডেবিয়ে। পর পর বোনের কড়ে আঙুলটি ছুঁয়ে থাকার মুহূর্তে গুঁড়ো ঝরে ঝুরঝুরিয়ে। কিচকিচ করে ভ্রাতৃপ্রবরের চোখ।

শেষ আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০১৭ ১৭:৩৪
কার্টুন: দেবাশীষ দেব।

কার্টুন: দেবাশীষ দেব।

সোম-শুক্কুরবারে দইয়ের ফোঁটা চলতে পারে। নইলে চুয়া-চন্দনের ফোঁটার রীতি।

খয়ের, সুপুরি, চন্দনবাটার গুঁড়োমাখা টিপ ভাইয়ের কপালে উঁচু হয়ে তাকিয়ে থাকে ড্যাবডেবিয়ে। পর পর বোনের কড়ে আঙুলটি ছুঁয়ে থাকার মুহূর্তে গুঁড়ো ঝরে ঝুরঝুরিয়ে। কিচকিচ করে ভ্রাতৃপ্রবরের চোখ।

এ ছবিটা ভাবতে ভাবতে আজকের বহু পাকাচুলো, থুত্থুড়ে ভাইয়ের চোখও চিকচিক করে। খুব দূরে নয়, কয়েক দশক আগেও খুব একটা অলীক ছিল না এমন ভাইফোঁটা।

সাবেক কলকাতার মার্বেল প্যালেসে কম সে কম একুশজন বোনের ব্রিগেড হানা দিত সকাল-সকাল উপোস রেখে ফোঁটা দিতে। ভাইযের সংখ্যাও ততোধিক। নাগাড়ে ফোঁটাবৃষ্টির মুখোমুখি হয়ে কপালে ধারণ করার কাজটা সোজা ছিল না খুব! ভাইয়েরা তাই অনেকেই সঙ্গে গামছা রাখতেন। মাঝেমধ্যে গামছা লেপে ফোঁটাটুকু একটু সামলেসুমলে নেওয়া হতো। বোনেরাও ভারী সিরিয়াস মুখে ভাইয়ের কপালে আঙুলটি ছুঁইয়ে মন্তর পড়ে যেত অক্লান্ত।

চোরবাগানের মিত্তির-বাড়িতেও একই ধারা! বাড়ির মেয়েরা কেউ হয়ত তখন পাথুরেঘাটার ঘোষ-বাড়ির বউ। হাটখোলার দত্তবাড়ির ছেলে মামাতো ভাইটিও হয়ত হাজির মাকে সুদ্ধ মামার বাড়িতে। মা ও ছেলে, দু’জনেই গাড়িবোঝাই তত্ত্বের মতো উপহার নিয়ে ফিরলেন। এই দিদি-ভাই বা দাদা-বোনদের বাহিনীর এখন টুপটুপ করে পাতা ঝরার মরশুম। উপহারে আগ্রহ নেই, রসনায় মিতাহারী— কিন্তু আদরের ছোঁয়াটুকু চেটেপুটে নিতে মুখিয়ে থাকেন প্রবীণ হীরেন মল্লিক বা আস্তিক দত্ত।

শোভাবাজারের দেববাড়িতেও দিনভর ব্যস্ত রুটিন। বোন কৃষ্ণরানি সকাল-সকাল হাজির হবেন ভাইদের টানে। হেঁসেলের পাট ননদ-শাশুড়ির জিম্মায় থুয়ে বাড়ির বউরা তখন বাপের বাড়িতে। সন্ধেয় কিন্তু এই বৃহত্তর পরিবার একজোট হবে। অলককৃষ্ণ দেবের ভগ্নিপতি সুশীলকুমার দে-র নেতৃত্বে শ্যালক, শ্যালকের শ্যালক থেকে শালাজ, কাচ্চাবাচ্চারা সক্কলে মিলে একসঙ্গে মহাভোজ। সে-যুগেও এই দিনটিতে ফার্পোজ বা ট্রিংকাসে সদলে খাওয়াদাওয়া জমত বটে।

সব মিলিয়ে ভাইফোঁটার দিনটিকে বাঙালির যৌথতা উদ্‌যাপনের লগ্ন বলেই দেখতে ভাল লাগে। এই যৌথতা কারও ভাল লাগতে পারে, কারও না-ও লাগতে পারে। কিন্তু লতার মতো জড়িয়ে থাকাটাই তখন জীবনচর্যার অঙ্গ। বাঙালির কালীপুজোর গা ঘেঁষে নেপাল, উত্তর ভারত, গোয়া বা তামিলনাডুর হিন্দুসমাজও ভাইদুজ, ভাইটিকা বা কার্তিক দীপমের পার্বণে মাতে। বাঙালির ভাইফোঁটার মন্ত্রে যম-যমুনার সম্পর্কের স্মৃতির মতো নরকাসুর বিজয়ী কৃষ্ণ ও তাঁর বোন সুভদ্রাকে নিয়ে মিথও হানা দেয় একেলে প্রাত্যহিকতায়। কিন্তু তার বাইরে ভাইফোঁটার দিনটা আশ্চর্য ‘টাইম ম্যানেজমেন্ট’-এর দিনও বটে। কোনও বড়বাড়ির বউ দুপুরটা বাপের বাড়িতে ফোঁটাপর্ব চুকিয়ে হয়ত সন্ধেটা শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়কুটুমদের সঙ্গে উপভোগ করলেন। হাতের কাছে, ঘরের কাছে তখন সকলকে চাইলেই পাওয়া যেত এটাই বড় কথা!

অধুনা ৮০ পার, কলকাতার এক বড়বাড়ির বুড়োকর্তার কথা মনে পড়ছে। বাড়ি থেকে দু’পা দূরের কলেজে মেয়ের পছন্দের বিষয় পড়ার সুযোগ না-থাকায় তাঁর অন্যত্র গ্র্যাজুয়েশন করায় ঘোর আপত্তি জানিয়েছিলেন। সব সময়ে বলতেন, মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি সব ঘরের কাছেই হবে। বেয়াইবেয়ানের সঙ্গে কুটুম্বিতা সেরে রাতে পারলে হেঁটেহেঁটেই বাড়ি ফিরবেন। কয়েক বছর আগে সেই ছোট মেয়েই বিলেতে বরসু্দ্ধ চাকরিতে যোগ দেওয়ায় ভারী অবাক হয়েছিলেন তিনি। বাড়ির মেয়েরা এখন অনেকেই বেঙ্গালুরু-পুণেয় থিতু। আর পাঁচ জনের মতো বিয়েশাদি করাতেও অনেকেরই আগ্রহ নেই। ভাইফোঁটায় সবার আসা হবে না বলা বাহুল্য। গত দশ-বারো বছরের আমাদের চারপাশটা পাল্টে গিয়েছে এমনই অভাবনীয় ভাবে।

সাবেক ভাইফোঁটার যৌথতা তাই অনেকটাই স্মৃতি! জনা চল্লিশ ভাইবোনের গুষ্টির একজোট হওয়াটা আর বোধহয় সহজে ঘটবে না। তবে যে কোনও ধর্মীয় আচার থেকে শত হস্ত দূরে থাকা কড়া যুক্তিবাদী ডাক্তারবাবুও দেখি ভাইফোঁটার নামে ছানার পায়েসের মতো গলে-গলে যান। আদতে ঢাকাইয়া বাঙালের ছোটবেলা পশ্চিমে কেটেছে। ভাইফোঁটায় আত্মীয় সমাগম তত ঘটে উঠত না। কিন্তু বাবার মুখে বাঙাল বুলির মিষ্টি ছড়াটুকু আজও বহন করছেন তিনি।

সগগে উলুউলু, মর্ত্যে তুর

আইজ অবধি ভাই তুমি না যাইও দূর।

বইনের কনিষ্ঠ আঙ্গুল লড়েচড়ে,

ভাইয়ের একশ বছর আয়ু বাড়ে।

এখানে লক্ষ্যণীয়, ষাট বছর বয়সী ভাইয়ের জন্যও এই মন্ত্র, অর্থাৎ তা সত্যি হলে ভাইয়ের আয়ু হবে ১৬০ বছর। আর একটি মন্ত্র ছিল,

যম-যমুনা ভাই বইন---

যমুনা দেয় যমেরে ফোঁটা

আমি দেই আমার ভাই অমুকেরে ফোঁটা।

বইনের কনিষ্ঠ আঙ্গুল লড়েচড়ে,

ভাইয়ের একশ বছর আয়ু বাড়ে।

ছড়ার একটি অংশে ভাইয়ের শরীরকে পাথরের মত বলা হয়েছে।

সব শেষে বলা হয়,

গাঙের কূলে জোয়ার ভাটি

ভাই আমার লোহার কাঠি।

এই বলে ভাইয়ের বুকে পিঠে লোহার ছোঁয়া দেওয়া হয়। তাঁর ছেলেমেয়েরা বাঙাল কথা বলতে পারে না বলে ডাক্তারবাবু নিজেই ওদের ফোঁটার সময়ও এই মন্ত্র আওড়াতেন। এ বছর ছেলে আমদাবাদে অ্যানিমেশন শিখতে গিয়েছেন, বোনের থেকে ফোঁটা তাই নেওয়া হবে না।

এই সার্বিক আচার, মন্ত্র— সব কিছুতে স্রেফ ভাইয়ের আয়ুবৃদ্ধি থেকে শুরু করে ভাইকে তোয়াজটা ভেবে দেখলে খানিক একপেশে ঠেকে বটে। কিন্তু তবু এই দিনটার মহিমাই আলাদা! আমহার্স্ট স্ট্রিট পাড়ার কন্যে অধুনা ৭০ পার বৃদ্ধার চোখমুখ উজ্জ্বল হযে ওঠে। আহা, মন্ত্রে যাই বলা হোক, আমি ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করলে ভাই কি আমার খারাপটা চাইবে! ভাইফোঁটা মানে প্রথম শাড়ি আবার প্রথম উপোস! উপোস মানে নিজেকে প্রথম অতটা গুরুত্বপূর্ণ বড় বড় টের পাওয়া। নিজের দুই দাদা ছাড়াও মামার বাড়ি বা পাড়ার এক ঝাঁক ভাইকে ফোঁটা দিতে হতো কচি হাতে। তখনই সে-বাড়িতে এক রকম বোনফোঁটাও অবশ্য চালু ছিল। মেয়েটির মা ফোঁটা দিতেন, তাঁর বউদিদের, বোনদের। মধ্যবিত্ত ঘরে ভাইফোঁটায় উপহার আদানপ্রদান তত গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তবে খাওয়াদাওয়াটা হতো কব্জি ডুবিয়ে।

বহু বছর বাদে ভাইরা কেউ দেশান্তরী, কেউ পরপারে। কখনও দেওরকে ফোঁটা দিয়েছেন সেই প্রৌঢ়া। আর ছেলেমেয়েদের ভাইফোঁটায় প্রাণপণে রান্নার আয়োজনে নিজেকে ব্যস্ত রেখে যেন অন্য ভাবে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছেন ভাইফোঁটার স্মৃতি।

আজকের দেশছাড়া, ঘোর প্রবাসী বাঙালির জীবনে শোনা যায়, স্কাইপ বা ভিডিওচ্যাটে হানা দেয় ভাইফোঁটা। উপোস করে স্নান সেরে দু’জনের সুবিধে মতো সময় মিলিয়ে দুই ভিন গোলার্ধের ভাইবোন হয়ত বা মুখোমুখি হয় কম্পিউটারের স্ত্রিনে। আন্দাজমতো ফোঁটাটাও বসিয়ে দেওয়া হয় জায়গায়। বেজে ওঠে শঙ্খধ্বনি। কিংবা কোনও প্রবাসী দেওয়ালে একলা বোনের হাতের ফোঁটা দাগ রাখে। স্মৃতির দাগেও সজীব হয়ে ওঠে, সিরিয়াসমুখো বোন ফোঁটা দেওয়ার সময়ে তাঁর একনিষ্ঠ মন্ত্রোচ্চারণ গুলিয়ে দিতে দাদার দুষ্টুমি। তার সেই দাদা হয়ত তখন প্রতিপদ না দ্বিতীয়ার দুপুরে দূরের কোনও অফিসক্যান্টিনে টিফিন সারছেন।

স্মৃতি বড় খতরনাক! কিছু মায়া এখনও রয়ে গেছে!

Bhai Phota Nostalgia Riju Basu
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy