গলার শ্বাসনালির সামনের দিকে অবস্থিত একটি গ্রন্থিতেই লুকিয়ে জীবনের হাজারো স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপের নিয়ন্ত্রণ। বিপাকক্রিয়া থেকে শুরু করে শিশুর বুদ্ধির বিকাশ, বয়ঃসন্ধির লক্ষণ, মহিলাদের ক্ষেত্রে গর্ভধারণের সময় জটিলতা ঠেকানো— এমন অনেক ক্ষেত্রেই থাইরয়েড গ্রন্থি বেশ কিছুটা ভূমিকা পালন করে থাকে।

থাইরয়েড হরমোন দু’প্রকার টি-থ্রি ও টি-ফোর। রক্তে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় এই হরমোনর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু কোনও কারণে এই হরমোনের উপস্থিতির হার বেড়ে বা কমে গেলে সমস্যা শুরু হয়। টিএসএইচ আমাদের মস্তিষ্কের ভিতরে অবস্থিত পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয় এবং থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। রক্তে টি-থ্রি, টি-ফোর হরমোন বেশি মাত্রায় থাকলে টিএসএইচ-এর পরিমাণ কমে যায়।

থাইরয়েডের সমস্যা মূলত দুই ধরনের। ১) হাইপারথাইরয়েডিজম ও ২) হাইপোথাইরয়েডিজম । হাইপারথাইরয়েডিজমে রক্তে থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে রক্তে থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোনের পরিমাণ কমে যায়। থাইরয়েডে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতাও নেহাত কম নয়। থাইরয়েড গ্রন্থির আল্ট্রাসাউন্ড , রক্তের এফটি-ফোর এবং টিএসএইচের মাত্রা, অ্যান্টি টিপিও অ্যান্টিবডি, থাইরয়েড স্টিমিউলেটিং ইত্যাদি পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ রোগ নির্ণয় করা  হয়। বংশগত কারণে এই অসুখের শিকার হতে পারেন। এ ছাড়া জন্ম থেকেই থাইরয়েড গ্রন্থি তৈরি না হওয়া, থাইরয়েডের অপারেশন হলে, কিছু অটো ইমিউন ডিসঅর্ডার থাকলে ও কিছু উৎসেচক ঠিকঠাক কাজ না করলে এই অসুখ হতে পারে।

আরও পড়ুন: ডায়াবিটিসে ইনসুলিন নিতে হয়? তা হলে অবশ্যই মাথায় রাখুন এ সব

সয়াবিনে থাকা আইসোফ্ল্যাভিন থাইরয়েডের সমস্যা বাড়ায়। ছবি: শাটারস্টক।

থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোন রক্তে বেশি হলে বা কমলে ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা কমে যায়। ফলে ডায়াবিটিস হতে পারে। তাই অনেক সময় চিকিৎসকরা এই অসুখের সঙ্গে ডায়াবিটিস থেকেও দূরে থাকার পরামর্শ দেন। এই প্রসঙ্গে এন্ডোক্রিনোলজিস্ট অভিজিৎ কুণ্ডুর মতে, ‘‘এই অসুখের সঙ্গে অনেক অনুষাঙ্গিক অসুখ জুড়ে থাকে। তাই এই অসুখ যতই আপাত নিরীহ হোক, অবহেলা করলে সমস্যা তো বাড়বেই, উল্টে অন্য অসুখও ধেয়ে আসে। বিশেষ করে রোগীর পারিবারিক ইতিহাসে ডায়াবিটিসের সমস্যা থাকলে আরও সাবধান হতে হয়।’’

এই অসুখ হলে কিছু খাবারদাবারও এড়িয়ে চলতে বলেন চিকিৎসকরা। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় অনেক চিকিৎসকই থাইরয়েডের ওষুধ খাওয়ার তিন ঘণ্টা পর থেকে এ সব খাওয়ার অনুমতি দিলেও, তা রোগের ধরণ ও শরীরের উপর নির্ভর করে। অনেক চিকিৎসক আবার এই তিন ঘণ্টার নিয়ম মানেন না। তাঁরা ক্ষতিকর খাদ্যগুলি বাদ দিতেই বলেন। জানেন সে সব কী কী?

সয়াবিন, টোফু: সয়াবিন ও টোফু যতই উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার হোক না কেন, থাইরয়েডের ক্ষেত্রে এই খাবার বিপজ্জনক। সয়াবিনে থাকা আইসোফ্ল্যাভিন থাইরয়েডের সমস্যা বাড়ায়।

বাঁধাকপি, ফুলকপি: কপিতে থাকা ফাইবার ও অন্যান্য নিউট্রিয়েন্ট এই হরমোনের সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়। থাইরয়েড থাকলে শরীরের আয়োডিনকে ব্যবহার করার ক্ষমতাও কমিয়ে দেয় এরা। তাই কপি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন।

বাদাম: ফ্যাট কমানোর ডায়েটে বাদাম দিয়ে থাকেন অনেক পুষ্টিবিদই। শরীরের প্রয়োজনীয় গুড ফ্যাটটুকুর চাহিদা মেটাতে। কিন্তু থাইরয়েড তাকলে এড়িয়ে চলুন বাদাম। খেলেও এক মুঠোর বেশি নয়। বাদামের নুন ও ফ্যাট দুই-ই থাইরয়েডে ভুগলে শরীরের জন্য ভাল হয় না অনেক ক্ষেত্রেই।

আরও পড়ুন: ঘাড় গুঁজে সারা ক্ষণ মোবাইলে, ‘শিং’ গজাচ্ছে মাথার পিছনে, বলছে গবেষণা

থাইরয়েডের ক্ষেত্রে ব্রকোলি বিপজ্জনক। ছবি: শাটারস্টক।

ব্রকোলি ও শালগম: ফুলকপির মতোই ব্রকোলিও এড়িয়ে চলুন।এই সব্জি হজমের সময় থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের আয়োডিন শোষণে বাধা সৃষ্টি করে। ঠিক এই কাজটা করে শালগমও। 

কফি: কাপের পর কাপ কফি খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তাতে রাশ টানুন। কফিতে থাকা ক্যাফিন থাইরয়েডের ওষুধকে কাজ করতে বাধা দেয়। তাই ঘন ঘন কফিতে ‘না’ বলুন। দিনে এক কাপের বেশি কফি একেবারেই নয়।

ভাজাভুজি, ফ্রোজেন ফুড: প্যাকেটজাত ভাজাভুজি বা ফ্রোজেন খাবারে খাবারে প্রচুর পরিমাণে প্রিজারভেটিভ দেওয়া থাকে। প্রিভারভেটিভ মানেই সোডিয়াম। এ দিকে বেশি সোডিয়াম ব্লাড প্রেশার বাড়িয়ে তোলে, তাই থাইরয়েড হলে সোডিয়ামের বাড়াবাড়ি রুখে দিন। নুনও অল্প খান।

অ্যালকোহল: চিকিৎসকরা ‘না’ বলছেন সরাসরি। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত মদ্যপানে পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে টিএসএইচ হরমোন কম নিঃসৃত হয়। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে টি-থ্রি, টি-ফোর কম উৎপাদিত হয়। তাই মদ্যপান বন্ধ করতে হবে। 

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও।সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।