মাসচারেক বাকি বিয়ের। কেন্দ্রীয় সরকারি সরকারি চাকরিতে সদ্য পদোন্নতি হয়েছে। মনোরোগের চিকিৎসকের চেম্বার থেকে বার হলেন যুবক। সপ্তাহখানেক ধরে সেই চিকিৎসকের ওষুধ খাচ্ছেন। তাতে রাতে খানিকটা ঘুম হলেও চিন্তা কিছুতেই দূর হচ্ছে না, সে কথাই জানাতে এসেছিলেন চিকিৎসককে। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই রাতে ঘুম আসছে না, খিদে কমে গিয়েছে, কাজেও নাকি মনোযোগ কম। কোনও কিছুতেই ধৈর্য রাখতে পারছেন না। বন্ধুরা তা নিয়ে নানা রসিকতা করলেও পরিস্থিতি দিনদিন আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে আন্দাজ করে যুবক শরণাপন্ন হয়েছিলেন পরিচিত এক চিকিৎসকের। তাঁর পরামর্শেই মনোরোগের কাউন্সেলরের পরামর্শ নিতে শুরু করেছেন। বিশেষজ্ঞ যুবককে জানিয়েছেন, সে ‘স্ট্রেস’-এ আক্রান্ত। জানিয়েছেন, বিয়ের যাবতীয় প্রস্তুতি এবং পরবর্তী জীবন নিয়ে যুবক এতটাই ভাবতে শুরু করেছেন যে, তাঁর মাথায় অস্থিরতা বাসা বেঁধেছে। মুক্তি পাওয়ার পথ— পর্যাপ্ত ঘুমোনো এবং অনর্থক চিন্তা না করা।

জলপাইগুড়ি শহরে সন্ধে নেমেছে। গরম পোশাক, সোয়েটার ছাড়া বাইরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না এর মধ্যেই। মনোরোগের কাউন্সেলারের চেম্বারের বাইরে তখনও লম্বা লাইন। কাউন্সেলর জানালেন, বাইরে যাঁরা বসে রয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগেরই একটাই সমস্যা। স্ট্রেস। যার পরিণতি অবসাদে। চেম্বারের বাইরে বসে ইতিহাসের এক শিক্ষিকা। নিজে ড্রাইভ করেন। এক মেয়ে বিদেশে চাকরি করেন। স্বামী পুলিশে কাজ করেন, মেদহীন ঝড়ঝড়ে শরীর। সম্প্রতি তাঁরা কলকাতায় একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। সেই শিক্ষিকাও স্ট্রেসে আক্রান্ত। দেড় মাস ধরে নিয়মিত কাউন্সেলরের চেম্বারে আসছেন। অনেক আলোচনা করে মাঝবয়সি কাউন্সেলর জানতে পেরেছেন শিক্ষিকার স্ট্রেসের কারণ, অবসর-পরবর্তী জীবন। বছর পাঁচেক বাদে অবসর নেওয়ার পরে কী ভাবে সময কাটাবেন, তা নিয়েই তিনি এখন থেকে ভাবছেন।

এক ছাত্রকে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর বাবা-মা। ছোটবেলা থেকেই সে ভাল পড়াশোনায়। এবারের ফাইনাল পরীক্ষার আগে থেকে পড়তে পারছে না। ভয় পাচ্ছে। কান্নাকাঁটি করছে। সেই ছাত্র সারা দিনের রুটিনের যে ছক কাউন্সেলর তৈরি করলেন, তাতে দেখা গেল এতদিন ছাত্রটি ঘুমিয়েছে মাত্র চার ঘণ্টা। রাতে না ঘুমিয়ে মোবাইলে ইন্টারনেট করেছে।

বছর পাঁচেক আগেও মফস্‌সল শহরের কোনও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাউকে ‘স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট’ করতে বললে উত্তরে নীরবতা মিলত। এখন মনোরোগের কাউন্সেলররের চেম্বারে দিন দিন লাইন বাড়ছে। জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ স্বস্তিশোভন চৌধুরীর ব্যাখ্যা, “এর কারণ হল, ইঁদুরদৌড়। আমাদের চারপাশের পরিকাঠামোয় সাঙ্ঘাতিক কোনও পরিবর্তন না এলেও সোশাল মিডিয়া এবং ঘরে ঢুকে পড়া বিপণনের সুবাদে আমরা সকলেই কিন্তু দৌড়তে শুরু করেছি। বেকার থেকে শুরু করে পাঁচটি গাড়ির মালিক, বহুতলের বাসিন্দা থেকে ভাড়া বাড়িতে অর্ধেক জীবন কাটিয়ে দেওয়া সকলেই পাশাপাশি দৌড়ছে, একই দৌড়ে। তাই স্ট্রেস বাড়ছে।”

স্ট্রেস কেন হয়?

চিকিৎসা শ্রাস্ত্রের ধ্রুপদী সংজ্ঞায় স্ট্রেসের নানা কারণ বলা হয়েছে। যেমন, প্রিয়জনের মৃত্যু, কাজের চাপ, সম্পর্কের জটিলতা, পরকিয়া, পড়াশোনার চিন্তা, কাজ না থাকা ইত্যাদি। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, এই ধ্রুপদী সংজ্ঞা যর্থাথ ছিল যতক্ষণ না পর্যন্ত মোবাইলে ইন্টারনেট জলভাত না হয়ে ছিল। খবরের কাগজ থেকে দূরে থাকা চেনা-অচেনা কারও সঙ্গে ভিডিও চ্যাট, নীলনদ দেখতে যাওয়ার ট্রেন, প্লেন, জাহাজের টিকিট কাটা থেকে শুরু করে নিজের লেখা কবিতা কতকজন পছন্দ করল— সবই মোবাইলে দেখে নেওয়া যায় এখন। তাতেই মানুষ একসঙ্গে হাজার জীবন বাঁচছেন। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক সন্দীপ সাহা যেমন বললেন, “হয়তো কেউ অফিসে বসে ফেসবুক করছেন। তখন কিন্তু তাঁর মাথায় একই সঙ্গে অফিসও চলছে, আবার একসঙ্গে আড্ডাও চলছে। হয়তো তিনি অনলাইন মার্কেটিং শুরু করলেন। তখন একই সঙ্গে অফিসে আবার দোকানেও। সারাদিন যদি এমন চলে তবে মস্তিস্ক তো ক্লান্ত হয়ে যাবেই।”

স্ট্রেস কোনও রোগ নয়। এটিকে রোগের একটি উপসর্গ বলা যেতে পারে। এক চিকিৎসকের কথায়, “সহজ ভাষায় বললে স্ট্রেস হল একটা ক্ষমতার মাত্রা। কতটা চাপ আমার সামলাতে পারব। চাপ বেশি হয়ে গেলে স্ট্রেস বেশি হয়। এখন সমস্যা হল সারাদিন নানা প্রতিযোগিতা এবং সোশাল মিডিয়ার বায়নাক্কা সামলাতে সামলাতে আমরা দিনের শেষে আর চাপ সামলাতে পারি না।”

সামলাতে না পারার প্রবণতার বাড়বাড়ন্তের কারণে রীতিমতো উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞেরা। ছোট বয়স থেকেই স্ট্রেস বাসা বাঁধছে মস্তিস্কে। গত শনিবারই জলপাইগুড়ি সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ১০০ পডুয়াকে নিয়ে স্ট্রেস ম্যানেজম্যান্টের কর্মশালার আয়োজন করেছিলেন কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং প্রাক্তনীরা। কলেজের অধ্যক্ষ অমিতাভ রায়ের কথায়, “প্রতিটি ছাত্রের মানসিক সুস্থতার দিকে লক্ষ রাখাও কলেজেরই কর্তব্য।” 

তবে, চিকিৎসকরা মনে করছেন, অযথা কোনও কারণ নিয়ে আশঙ্কা না করা এবং যথাযথ ঘুমোনোই স্ট্রেস সামলে নেওয়ার প্রকৃষ্ট পথ। কিন্তু উপসর্গ রোগে পৌঁছে গেলে, অর্থাৎ, কেউ যদি স্ট্রেস নিতে নিতে মানসিক অবসাদের শিকার হয়ে পড়েন, তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তা না হলে গোটা বিষয়টি চূড়ান্ত খারাপ জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে।