Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৮ অগস্ট ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

ভয় নয়, এন্ডোমেট্রিওসিসে সতর্কতা জরুরি হবু মায়েদের

প্রতি বছর এ দেশে গড়ে ১০ লক্ষ মহিলা এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। যন্ত্রণাদায়ক এই রোগ মা হওয়ার পথে বাধা তৈরিও করতে পারে। তবে চিকিৎসায় এর

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০৫:০৪
Save
Something isn't right! Please refresh.
রোগী দেখছেন চিকিৎসক। —ছবি: অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়

রোগী দেখছেন চিকিৎসক। —ছবি: অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়

Popup Close

প্রশ্ন: ইদানীং মহিলাদের মধ্যে একটি রোগের কথা বেশি শোনা যাচ্ছে, এন্ডোমেট্রিওসিস। এই রোগটি কী?

উত্তর: প্রজননক্ষম মহিলাদের মধ্যে এই ধরনের সমস্যা আজকাল দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি একটি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, আমাদের দেশে বছরে গড়ে ১০ লক্ষ মহিলা এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে ওই সমীক্ষায় এও দেখা গিয়েছে, সামাজিক অবস্থান, আর্থিক পরিস্থিতি বা বিশেষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগ সীমাবদ্ধ নয়। এখনও মেনোপজ হয়নি, এমন যে কোন মহিলার এই রোগটি হতে পারে। এন্ডোমেট্রিওসিস কোনও সংক্রমণ নয়, ছোঁয়াচে রোগও নয়। নয় থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়স অবধি মহিলাদের জরায়ুতে যে এন্ড্রোমেট্রিয়াল লাইন থাকে, তার কোষ জরায়ুর বাইরে ফেলোপিয়ান টিউব, ডিম্বাশয় বা পাউচ অব ডগলাসে লেপ্টে বসে থাকলে তাকে এন্ডোমেট্রিওসিস বলে।

প্রশ্ন: এই রোগে কেউ আক্রান্ত হয়েছে কি না তা কী ভাবে বোঝা সম্ভব? উপসর্গগুলিই বা কেমন?

Advertisement

উত্তর: ঋতুচক্রের সময়ে এন্ডোমেট্রিয়াম যেমন ফুলে ওঠে, তেমনই বাইরে (ফেলোপিয়ান টিউব, ডিম্বাশয় বা পাউচ অব ডগলাস)এ সব অঙ্গের উপরে রক্তভরা পিণ্ড তৈরি হয়। এই রোগের প্রধান লক্ষণই হল (১) তলপেট ও পেলভিসে ব্যথা। ঋতুস্রাবের শুরুর দিন চারেক আগে থেকে যন্ত্রণাদায়ক ঋতুস্রাব শুরু হওয়া। আবার কারও কারও প্রবল রক্তপাত হতে পারে। (২) যৌন মিলনের সময় বা পরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়। (৩) কোমর, তলদেশ বা শ্রোণিচক্রে এক টানা ব্যথা চলতেই থাকে। এই পেলভিক পেইন যথেষ্ট কষ্টদায়ক। (৪) সন্তানধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারন, এই রোগ হলে মেনস্ট্রুয়াল প্যাটার্নে পরিবর্তন হয়। অনেকের বন্ধ্যাত্ব পর্যন্ত এসে যায়। (৫) মূত্রথলি বা পায়ুদ্বারে ব্যথা হতে পারে। এই পথে অস্বাভাবিক রক্তপাতও হতে পারে, আবার না-ও তে পারে। এই রোগ এক জন নারীর সাধারণ স্বাস্থ্য ভেঙে দেয়। সহজে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে ও অনেকেই ক্লান্তি, হতাশায় ভুগতে শুরু করেন। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এমন অনেক মহিলা আছেন যাঁরা জীবনে কখনও এমন কোন উপসর্গ অনুভব করেননি, অথচ পরীক্ষা করলে তাঁদের এন্ডোমেট্রিওসিস ধরা পড়েছে।

প্রশ্ন: এ ক্ষেত্রে ব্যথার মাত্রা কী রকম?

উত্তর: রোগী অনুযায়ী ব্যথার মাত্রার তারতম্য দেখা যায়। অধিকাংশ মহিলাই ব্যথাটা অনুভব করেন কোমর ও নিতম্বের মধ্যবর্তী অঞ্চলে। পায়ের উপরের অংশেও ব্যথা হতে পারে। আবার কিছু মহিলার ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক ব্যথা হয়। কারও ঋতুস্রাবের শুরু হওয়ার ক’দিন আগে ব্যথা অনুভূত হয়। আর সবারই ঋতুস্রাবের সময়ে ব্যথা চলতে থাকে। এন্ডোমেট্রিওসিস হলে কিছু মহিলার গর্ভধারণে সমস্যা হয়। আবার অনেকেই এই রোগ নিয়ে দিব্য গর্ভধারণ করতে পারেন। গর্ভবতী হলে ব্যথা একদম কমে যায়, কারন তখন ঋতুস্রাব বন্ধ থাকে। শিশু জন্মানোর ছ’মাস থেকে বছরখানেক পরে ব্যথা ফের মাথচাড়া দিতে পারে। অভিজ্ঞতা বলছে, বেশ কিছু মহিলার এন্ডোমেট্রিওসিসের ব্যথা আপনাআপনিই উধাও হয়ে যায়, কোনও চিকিৎসা ছাড়াই।

প্রশ্ন: এন্ডোমেট্রিওসিস কেন হয়?

উত্তর: ঋতুচক্রের সময় ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের প্রভাবে এন্ডোমেট্রিয়াম বা জরায়ুর ভেতরের লাইনিং পুরু হয়ে যায়। উদ্দেশ্য হল, ফার্টিলাইজড ওভাম বা ডিম্বানু যাতে সহজে গেঁথে যায়, সেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। গর্ভধারণ না হলে, এই পুরু হয়ে যাওয়া এন্ডোমেট্রিয়াম খসে পড়ে। তাই ঋতুস্রাব হিসেবে বেরিয়ে আসে। এন্ডোমেট্রিওসিস হলে জরায়ুর ভেতরের এই দেওয়াল বা লাইনিং পেলভিসের নানা অংশে খুঁজে পাওয়া যায়। তারা অস্বাভাবিক অবস্থানে পৌঁছে যায়। বাইরে লেপ্টে থাকা এন্ডোমেট্রিয়াম প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময়ে মোটা হয় এবং জরায়ুর অভ্যন্তর থেকে যে ভাবে খসে পড়া লাইনিং পিরিয়ড হিসেবে বেরিয়ে আসে, এটিরও তাই হয়। পেলভিস বা শ্রোণিদেশে ঘটে যাওয়া অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের বাইরে বেরনোর কোনও পথ থাকে না। এ ক্ষেত্রে ঋতু্স্রাবের সময়ে প্রতিবর্ত ব্লিডিং হয়। একে বলে ‘রেট্রোগ্রেড মেন্ট্রুয়েশন’। এটি জমে গিয়ে তৈরি হয় প্রদাহ, সঙ্গে ব্যথা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক হল, এর ফলে অভ্যন্তরীণ জননাঙ্গ বিপর্যস্ত হতে পারে।

প্রশ্ন: কোথায় এই রোগের প্রকোপ দেখা যায়?

উত্তর: (১) ওভারি বা ডিম্বাশয়ের উপরে লেপ্টে বসে থাকা ছোট রক্তভরা থলি বা সিস্ট তৈরি হতে পারে। একে চকোলেট সিস্ট বলে। (২) যোনিপথ বা মলদ্বারের মাঝে হতে পারে, যাকে রেক্টো ভ্যাজাইনাল এন্ডোমেট্রিওসিস বলে। (৩) পেরিটোনিয়ামেও হতে পারে। এটি এক ধরনের ঝিল্লি যা পেটের ভিতরের সব অঙ্গকে ঢেকে রাখে। (৪) মূত্রথলি, পায়ু বা বাওয়েলে এন্ডোমেট্রিওসিস হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ঋতুস্রাবের সময়ে প্রস্রাবের সঙ্গে পায়ুদ্বার দিয়েও রক্তপাত হতে পারে। তবে এটি খুব কম হয়। (৫) জরায়ুর পেশির দেওয়ালেও এই সমস্যা হতে পারে। একে অ্যাডিনোমায়োসিস বলে। (৬) বিরল তবু শরীরের অন্যান্য অংশে যেমন নাভি বা ফুসফুসেও হতে পারে। তবে এর সংখ্যা খুব কম।

প্রশ্ন: রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতিগুলি কী?

উত্তর: অনেক মহিলার রোগ নির্ণয়ে অনেকটা সময় লেগে যায়। কারণ, কোনও একটি বা একাধিক উপসর্গ দেখে এন্ডোমেট্রিওসিস নির্ণয় করা কঠিন। আবার এমন কয়েকটি সমস্যা রয়েছে, যার সঙ্গে এন্ডোমেট্রিওসিসের উপসর্গ মিলে যায়। যেমন ‘ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম’ ও ‘পেলভিক ইনফ্লেমেটরি ডিজিজ’। ফলে অনেক সময় চিকিৎসকের বুঝতে সমস্যা হয়। উপসর্গের বৈচিত্র যেমন দেখা যায়, তেমনই উপসর্গহীন এন্ডোমেট্রিওসিসও হয়। প্রথমত, ক্লিনিক্যালি অর্থাৎ পেটের কোথায় ব্যথা আছে তা জানতে চিকিৎসক প্যারাভ্যাজাইনাল পরীক্ষা করে দেখেন। পাউচ অব ডগলাসে টেন্ডার নডিউল অর্থাৎ রক্ত জমে দানা আকারে তৈরি হলে জরায়ুর স্বাভাবিক নড়াচড়ায় ব্যাঘাত ঘটে। দ্বিতীয়ত, আর যে সব পরীক্ষা করতে হয়, সেগুলি হল আলট্রাসাউন্ড ও ডায়াগনস্টিক ল্যাপ্রোস্কপি। আলট্রাসাউন্ড এক ধরনের স্ক্যান। এর মাধ্যমে এন্ডোমেট্রিওসিস হয়েছে কি না তা নিশ্চিত ভাবে জানা যায় না। তবে দ্বিতীয়টি হল এন্ডোমেট্রিওসিস নির্ধারণের নিশ্চিত উপায়। নাভির মধ্যে ছোট্ট একটা ফুটো করে, টেলিস্কোপের মতো দেখতে যন্ত্র, যাকে ল্যাপ্রোস্কোপ বলে, তা পেটে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এই পরীক্ষা এন্ডোমেট্রিওসিস রয়েছে কি না তা নিশ্চিত করে। জেনারেল অ্যানাস্থেসিয়ার মাধ্যমে করা এটি একটি ঝুঁকিবিহীন অস্ত্রোপচার।

প্রশ্ন: এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসা কী?

উত্তর: ব্যথা কমানোর ওষুধ সব সময় প্রদাহ কমায়। প্রদাহ কমলে ব্যথা কমতে বাধ্য। অস্ত্রোপচার ছাড়া বেশ কিছু পদ্ধতিতে এই রোগের চিকিৎসা সম্ভব। ছ’মাসের চিকিৎসা করতে হয়। প্রথমত, নন স্টেরয়েড অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি ড্রাগ দিতে হয়, ব্যথা উপশমের জন্য। দ্বিতীয়ত, মাসে ২১টি ওরাল কনট্রাসেপ্টিভ পিল দেওয়া হয় রোগীকে। এতে থাকা ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোন যৌথ ভাবে ওভিলেশন দমিয়ে দেয়। ফলে অল্প সময়ের জন্য ঋতুস্রাব হয়। তাতে ব্যথাও কম হবে। তৃতীয়ত, ‘ইন্ট্রাইউটেরাইন ডিভাইসেস’। এটি একটি ছোট্ট যন্ত্র, যা জরায়ুতে ঢোকালে তা ধীরে ধীরে প্রোজেস্টেরনের নিঃসরণে সাহায্য করবে। ফলে রক্তক্ষরণের মাত্রা কমে যায় ও ব্যথা কমে। উপরে উল্লেখিত হরমোন দিয়ে চিকিৎসা জন্মনিরোধক। তাই গর্ভধারণ করতে চাইলে তা ব্যহত হবে। অন্য দিকে, জিএনআরএইচ অ্যাগোনিস্ট (গোনাডোট্রপিন রিলিজিং হরমোন অ্যাগোনিস্ট) ট্যাবলেট ডিম্বাশয় থেকে ইস্ট্রোজেন উৎপাদন বন্ধ করে। তাই অস্থায়ী (ওষুধ খাওয়া পর্যন্ত) মেনোপজ তৈরি হয়। এটি জন্মনিরোধক নয়।

প্রশ্ন: কোন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই রোগ নিরাময় সম্ভব?

উত্তর: অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগাক্রান্ত অঞ্চলগুলি সাফ করে দেওয়া হয়। কোথায় এন্ডোমেট্রিওসিস হয়েছে ও তার ব্যাপ্তি কতটা তার উপরে নির্ভর করে যে কী ধরনের অস্ত্রোপচার হবে। প্রথমত, ল্যাপ্রোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে আক্রান্ত অঞ্চলগুলি বাষ্পীভূত করে দেওয়া হয়। এন্ডোমেট্রিওটিক নডিউলগুলি ডিম্বাশয়ে জমে সিস্টের আকার ধারণ করলে তাকে এন্ডোমেট্রিওমা বলে। এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা কেটে বাদ দিতে হয়। মহিলাদের রোগ সংক্রান্ত এটি জটিলতম অস্ত্রোপচার। এন্ডোমেট্রিওটিক নডিউলগুলির সঙ্গে খাদ্যনালি জড়িয়ে গেলে জীবন সংশয় পর্যন্ত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এন্ডোমেট্রিওসিস যদি ব্যাপক ও অনেকটা অঞ্চল জুড়ে হয়, তবে ল্যাপারোটমি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে নাভির তলার অংশ থেকে পেট কাটতে হয়। সন্তানধারণে ইচ্ছুক না হলে, প্রয়োজনে ডিম্বাশয় বাদ দিতে হয়। তৃতীয়ত, এই রোগে জরায়ু বাদ দেওয়া বা হিস্টেরেক্টমি করতে হতে পারে। তবে এই অস্ত্রোপচারের পরে আর সন্তানধারণ সম্ভব নয়।

প্রশ্ন: এই রোগ নিয়ে মা হওয়া সম্ভব?

উত্তর: হ্যাঁ সম্ভব। তবে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই ভাল। এন্ডোমেট্রিওসিসের রোগীর গর্ভসঞ্চার হলে চিন্তার কিছু নেই।

প্রশ্ন: কি কি বিষয়ে নজর দিলে এন্ডোমেট্রিওসিস এড়ানো সম্ভব?

উত্তর: একটু খেলাধুলো বা শরীরচর্চা করলে এন্ডোমেট্রিওসিসের যন্ত্রণা কম অনুভূত হয়। দুগ্ধজাত দ্রব্য, রেডমিট, কফি, গম থেকে তৈরি খাবার এড়িয়ে যাওয়াই ভাল। শেষে বলা ভাল, ঋতুচক্রের সময় পেটে ব্যথা অনুভব করলেই তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

সাক্ষাৎকার: সুচন্দ্রা দে

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement