Advertisement
E-Paper

এখনও মেঝেতে শুয়ে কাতরায় শিশুরা

ওয়ার্ড উপচে পড়ছে রোগীতে। যারা খাট পায়নি, তাদের জন্য ট্রলিও নেই। স্রেফ এক টুকরো কাপড়ের উপরে শুয়ে রুগ্ণ শিশু। যাতায়াতের পথে ডাক্তার-নার্স, চতুর্থ শ্রেণির কর্মী, এমনকী অন্য রোগীর বাড়ির লোকজনেরও পা ঠেকে যাচ্ছে তাদের গায়ে।

সোমা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৫ ০০:৪০
শিশু শল্য চিকিৎসা বিভাগ। মঙ্গলবার। — নিজস্ব চিত্র।

শিশু শল্য চিকিৎসা বিভাগ। মঙ্গলবার। — নিজস্ব চিত্র।

ওয়ার্ড উপচে পড়ছে রোগীতে। যারা খাট পায়নি, তাদের জন্য ট্রলিও নেই। স্রেফ এক টুকরো কাপড়ের উপরে শুয়ে রুগ্ণ শিশু। যাতায়াতের পথে ডাক্তার-নার্স, চতুর্থ শ্রেণির কর্মী, এমনকী অন্য রোগীর বাড়ির লোকজনেরও পা ঠেকে যাচ্ছে তাদের গায়ে। মেঝেতে শুয়ে থাকায় স্কার্ট পরা নার্সদের পক্ষে নীচু হয়ে বসে সব সময়ে তাদের ইঞ্জেকশনও দেওয়া যাচ্ছে না। এটাই রাজ্যের সেরা সরকারি হাসপাতাল এসএসকেএমের শিশু শল্য চিকিৎসা বিভাগের ছবি।

কর্তৃপক্ষ বিষয়টা জানেন না তা নয়। বরং জানেন বলেই বছরখানেক আগে ওই ভবনেই একটি ফাঁকা ওয়ার্ডে শিশুদের ওয়ার্ডটি স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু এক বছরেও তা না হওয়ায় কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা নিয়েই এ বার প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন অনেকে।

শিশু বিভাগের চিকিৎসকদের বড় অংশ প্রশ্ন তুলেছেন, ক্ষমতায় আসার পরে মা ও শিশুর মৃত্যুহার কমাতে সবচেয়ে বেশি সচেষ্ট হওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ছবির কথা তিনি কি জানেন? তাঁরা বলছেন, মুখ্যমন্ত্রী মাঝেমধ্যেই এসএসকেএমে আসেন। কখনও যদি এই শিশু বিভাগে তাঁর পা পড়ে, তা হলে তিনি বুঝবেন রোগ সারাতে এসে এখানে আরও কত যন্ত্রণার শিকার হয় শিশুরা।

কী ভাবছেন কর্তৃপক্ষ? এসএসকেএম তথা ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ-এর অধিকর্তা মঞ্জু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘এখন আমরা বিষয়টা নিয়ে কিছু ভাবছি না।’’ কেন ভাবছেন না? এত শিশু দিনের পর দিন মেঝেতে পড়ে থেকে কষ্ট পাচ্ছে, সংক্রমণের শিকার হচ্ছে। তা-ও কেন তাঁরা কিছু ভাবছেন না? অধিকর্তা পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘‘আপনাদের কে এ সব ভুল খবর দেয়? কেউ নীচে পড়ে নেই। সকলেই খাট পায়।’’ তাঁকে জানানো হল, আনন্দবাজার-এর কাছে ওই ওয়ার্ডের ছবি আছে। তখন তিনি বলেন, ‘‘চিকিৎসার জন্য এলে কাউকে তো ফেরত পাঠাতে পারি না। তখন আবার সে নিয়ে খবর হবে। সকলকে ভর্তি নিতে গিয়ে এই অবস্থা।’’ কেন অন্যত্র জায়গা খালি থাকা সত্ত্বেও এই ওয়ার্ডটিকে সেখানে সরানোর ব্যবস্থা হচ্ছে না? এ বার জবাব না দিয়ে ফোন কেটে দেন তিনি।

এসএসকেএমের মেন ব্লকের চারতলায় অ্যালেক্স ওয়ার্ড। সেখানেই পেডিয়াট্রিক মেডিসিন, পেডিয়াট্রিক সার্জারি এবং অর্থোপেডিক, নিউরোলজি ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের শিশু রোগীদের ভিড়। যত রোগী ভর্তি থাকার কথা, থাকে তার তিন গুণ। সঙ্গে তাদের মায়েরা। এমন ভিড়ের ঠেলায় রাজ্যের একমাত্র সরকারি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের ওয়ার্ড প্রতিদিন ধোয়ামোছা করাও কঠিন হয়ে পড়ে সাফাইকর্মীদের পক্ষে।

ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেল, মেঝের নোংরা জলে ভিজে যাচ্ছে শিশুদের পোশাক। মাথার উপরে ঝুলছে বিদ্যুতের তারের বাক্স। ওয়ার্ড ছাপিয়ে লিফ্‌টের ধারে, এমনকী শৌচাগারের সামনেও শুয়ে আছে শিশুরা। কেউ অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায়। কারও বা অস্ত্রোপচার হয়ে গিয়েছে, শরীরে ব্যান্ডেজ। সংক্রমণের সব ঝুঁকি নিয়ে দিনের পর দিন রাজ্যের ‘সেরা’ সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে এরা।

বিষয়টি নিয়ে একাধিক বার বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ ওঠার পরে স্থির হয়েছিল, ওই বাড়িরই অন্য একটি তলায় ভিক্টোরিয়া ওয়ার্ডের ফাঁকা জায়গায় এই ওয়ার্ডটি স্থানান্তরিত করা হবে। এক সময়ে ভিক্টোরিয়া ওয়ার্ডের সামনে সে কথা লিখে বোর্ডও ঝোলানো হয়। কিন্তু পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়নি। অ্যালেক্স ওয়ার্ডের উল্টো দিকে ইএনটি বিভাগ। সেই বিভাগটিকে স্থানান্তরিত করে সেখানে অ্যালেক্স ওয়ার্ডের বর্ধিত শয্যার ব্যবস্থা করা হবে ঘোষণা হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে একই বাড়ির একই তলায় পেডিয়াট্রিক মেডিসিন, পেডিয়াট্রিক সার্জারি এবং পেডিয়াট্রিক আইসিইউ থাকলে তা সব দিক থেকেই সুবিধাজনক হতো। কিন্তু সেটাও স্রেফ মৌখিক আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছে।

বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, ‘‘শীত আসছে। ভোরে ঠান্ডা হাওয়া আসে। বাচ্চাগুলো মাটিতে কুঁকড়ে শুয়ে থাকে। ঠান্ডা বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। প্রতি বছর এখানে ভর্তি হওয়া বাচ্চাদের কয়েক জন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। এই ব্যর্থতার দায় আমাদের সকলের।’’ ওয়ার্ডের এক নার্স বলেন, ‘‘স্কার্ট পরে মেঝেতে বসে ইঞ্জেকশন দেওয়া, স্যালাইন চালানো খুব সমস্যা। আমরা বার বার এ নিয়ে অভিযোগ করেছি। কিন্তু কোনও ফল হয়নি।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy