ডাক্তারির চতুর্থ বর্ষের ছাত্র রীতেশ জায়সবালের মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ উঠেছিল ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের একাধিক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। হাসপাতালের নিজস্ব তদন্তে সেই অভিযোগের সত্যতা মেলায় শনিবার ওই কলেজের রেসিডেনশিয়াল সার্জন সুমন দাসকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সৌরভ চক্রবর্তী ও বিকাশ কুমার নামে দুই স্নাতকোত্তর ছাত্রকেও (পিজিটি) দোষী সাব্যস্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে রাজ্য স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে, নজিরবিহীন শাস্তি হয়েছে সরকারি ডাক্তারদের। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য দফতরের ভূমিকা প্রশংসিত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, এই নিরপেক্ষ বিচার পদ্ধতি সব ক্ষেত্রে অনুসৃত হচ্ছে নাকি এক ডাক্তারি ছাত্রের মৃত্যু হওয়ায় ব্যতিক্রমী ভাবে এই প্রথম ব্যবস্থা নিতে সক্রিয় হতে দেখা গেল স্বাস্থ্য দফতরকে?
সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসায় গাফিলতির সুস্পষ্ট প্রমাণ সত্ত্বেও শাস্তি না হওয়া বা নামমাত্র শাস্তিতেই ছাড়ের অভিযোগ নিকট অতীতে একাধিক। পিজিতে এক অটোচালকের মৃত্যুতে চিকিৎসা গাফিলতির অভিযোগ ওঠে। শাস্তি তো দূরে থাক, তদন্ত রিপোর্টই এখনও প্রকাশ হয়নি। আগে পিজিতেই রক্তের অভাবে সুহানা নামে এক কিশোরীর মৃত্যুতে কয়েক জন অভিযুক্তের নামমাত্র শাস্তি হয়। নীলরতনে কোরপান-কাণ্ডে ঘটনাস্থলে উপস্থিত চিকিৎসকদের নাম পেতে গলদঘর্ম হয় পুলিশ। স্বাস্থ্য দফতরের একাংশের সংশয়, রীতেশও সাধারণ রোগী হলে এত দ্রুত শাস্তি হত না।
গত রবিবার মোটরবাইক দুর্ঘটনায় জখম হন রীতেশ। সঙ্গীরাই তাঁকে ন্যাশনালে ভর্তি করেন। অভিযোগ, সার্জারি বিভাগে ভর্তির পরে আট ঘণ্টা বেঁচে ছিলেন রীতেশ। প্রচুর রক্তপাত হচ্ছিল। কিন্তু কোনও সিনিয়র চিকিৎসককে তখন হাসপাতালে পাওয়া যায়নি। সার্জারি বিভাগে সেই রাতে ডিউটিতে ছিলেন রেসিডেনশিয়াল সার্জন সুমন দাস এবং দুই পিজিটি সৌরভ ও বিকাশ। অভিযোগ, তাঁরা রীতেশকে ওই অবস্থায় দেখেও সিটি স্ক্যান, এক্স-রে বা রক্তপরীক্ষার মতো প্রাথমিক চিকিৎসাও করেননি। কার্যত বিনা চিকিৎসায় পড়ে থেকে সোমবার সকালে রীতেশের মৃত্যু হয়।
এর পরেই চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তুলে ওই হাসপাতালের জুনিয়ার ডাক্তারদের একাংশ অধ্যক্ষ মঞ্জুশ্রী রায়কে ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখান। চাপের মুখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও চটজলদি ছ’সদস্যের তদন্ত কমিটি গড়েন। শুক্রবার ওই কমিটি রিপোর্ট জমা দেয়। তার ভিত্তিতেই তিন ডাক্তারের বিরুদ্ধে শাস্তির সিদ্ধান্ত নেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এমনিতেই অহরহ রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তোলেন সাধারণ মানুষ। আমজনতার এমন অভিযোগ যে খুব একটা মিথ্যে নয়, রীতেশের মৃত্যু ও পরবর্তী কালে হাসপাতালের নিজস্ব তদন্তে তিন ডাক্তারের বিরুদ্ধে কর্তব্যে গাফিলতির প্রমাণ তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। মঞ্জুশ্রীদেবী বলেন, ‘‘কোথাও একটা ফাঁক যে রয়েছে, বোঝাই যাচ্ছে। তদন্তেই তা উঠে এসেছে। আগামী বুধবার এ নিয়ে আলোচনার জন্য কলেজ কাউন্সিলের বৈঠক ডাকা হয়েছে। সরকারি চিকিৎসকদের এ বার বোধহয় আত্মসমালোচনা-আত্মবিশ্লেষণের সময় এসেছে।’