এ যেন ঠিক গোদের উপর বিষফোঁড়া।
একেই তো নির্দিষ্ট সময়ের অনেকটাই আগে জন্ম, তার সঙ্গে আবার হৃদ্যন্ত্রে দু’টি জটিল সমস্যা। একাধিক চিকিৎসক কার্যত জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কলকাতার এক হাসপাতালের তিন চিকিৎসকের একটি দল কঠিন অস্ত্রোপচারের পরে বোলপুরের ছোট্ট আয়ুষকে ফিরিয়ে দিয়েছেন মায়ের কোলে।
কী হয়েছিল আয়ুষের? আয়ুষের বাবা আশিস মণ্ডল জানান, নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় দু’মাস আগেই পৃথিবীর আলো দেখেছিল সে। ওজন ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ খানিকটা কম, মাত্র এক কিলো আটশো গ্রাম। সময়ের আগে জন্মানো বাচ্চার যে ধরনের শারীরিক অসুবিধা থাকে, সে সব ছাড়াও আয়ুষের বুকে একটা শব্দ হচ্ছিল। নার্সিংহোম থেকে ছাড়া পাওয়ার বেশ কয়েক দিন পরেও তা থামেনি। বরং ক্রমশই দেখা দিচ্ছিল আরও নানা উপসর্গ। কিছু খাওয়ালেই উগরে দিচ্ছিল সে। অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গিয়েছিল জন্ডিস। একেবারে নেতিয়ে পড়েছিল ছোট্ট শরীরটা। তখনই বোলপুর থেকে আয়ুষকে নিয়ে চলে তাঁরা চলে আসেন কলকাতায়। পরীক্ষার পরে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, একইসঙ্গে দু’টি জটিল সমস্যা দেখা দিয়েছে আয়ুষের হৃদ্যন্ত্রে।
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, জন্মের পরে কিছুক্ষণ পর্যন্ত মানুষের ফুসফুস ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। চুপসে থাকে। ততক্ষণ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট পথে ফুসফুসকে রক্ত জোগান দিতে থাকে হৃৎপিণ্ডই। জন্মের ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই হৃৎপিণ্ড থেকে ফুসফুসে রক্ত চলাচলের ওই পথটি বন্ধ হয়ে যায়। নিজের মতো কাজ শুরু করে ফুসফুস। কিন্তু আয়ুষের ক্ষেত্রে জন্মের বেশ কয়েক দিন পরেও সেটি বন্ধ হয়নি (ডাক্তারি পরিভাষায় যার নাম লার্জ পেটেন্ট ডাক্টাস আর্টেরিওসাস)। ফলে দেখা দিয়েছিল ‘হার্ট ফেলিওর’-এর আশঙ্কা। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। যে ‘ভাল্ভ’টির মাধ্যমে মানুষের হৃৎপিণ্ডের বাম নিলয় সারা দেহে রক্ত পাঠায়, সেই ‘অ্যায়োর্টিক’ ভাল্ভটিতেও ছিল ‘ব্লক’। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হচ্ছিল আয়ুষের শরীরে। ঠিক মতো রক্ত পৌঁছচ্ছিল না ক্ষুদ্রান্ত্র এবং বৃহদন্ত্রে।
তিন শিশু-হৃদ্রোগ চিকিৎসক অনিল সিংহি, ধৃতব্রত দাস এবং অশোক মিত্তলের একটি দল আয়ুষের দেহে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেখানেও জটিলতা। আয়ুষকে সুস্থ করে তুলতে প্রয়োজন ছিল বাইপাস অস্ত্রোপচারের। কিন্তু একরত্তি শরীরটা অত কাঁটাছেঁড়া সহ্য করতে পারবে না বলেই মনে হয়েছিল তাঁদের। চিকিৎসক অনিল সিংহি জানান, এর পরেই তাঁরা আয়ুষের মা-বাবার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁদের বোঝান, আয়ুষের দেহে বাইপাস সম্ভব না হলেও বিকল্প একটি পথ রয়েছে। তবে সে পথেও ঝুঁকি কম নেই। রাজি হওয়া ছাড়া কোনও উপায়ও ছিল না আয়ুষের মা-বাবার কাছে।
এর পরে অস্ত্রোপচার। পদ্ধতির নাম, ‘ট্রান্সক্যাথিটার বেলুন অ্যায়োর্টিক ভালভোটমি অ্যান্ড পিডিএ ডিভাইস ক্লোজার’। এই পদ্ধতিতে শিরা বা ধমনী দিয়ে সূক্ষ্ম নল প্রবেশ করিয়ে বেলুনের সাহায্যে প্রথমে আয়ুষের অ্যায়োর্টিক ভালভটিকে ঠিক করা হয়। তার পরে বন্ধ করা হয় হৃদযন্ত্র থেকে ফুসফুসে রক্ত চলাচলের পথটি। ফলে কাটাছেঁড়ার দরকার পড়েনি।
এই অস্ত্রোপচারকে যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য বলে মনে করছেন অন্য হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞেরাও। যেমন বিশ্বকেশ মজুমদার ও অমিতাভ চক্রবর্তী জানাচ্ছেন, এই ধরনের চিকিৎসা করার মতো পরিকাঠামো এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসক খুবই কম এ রাজ্যে। শিশুদের এই ধরনের সমস্যা দেখা দিলে চেন্নাই বা হায়দরাবাদে ছুটতে হয়। দুই বিশেষজ্ঞই বলেন, ‘‘অত ছোট বাচ্চার দেহে একই সঙ্গে দু’টি অস্ত্রোপচার ভীষণই ঝুঁকির এবং রীতিমতো বিরল। একটু ভুল হলেই অনেক বড় ক্ষতি হতে পারত।’’ অনিলবাবু নিজেও জানান, এর আগে চার কিলো ওজনের একটি শিশুর দেহে এই অস্ত্রোপচার করেছেন তাঁরা। ছোট বাচ্চার ধমনী এবং শিরা এমনিতেই খুব সরু হয়। সেই পথে ক্যাথিটার ঢুকিয়ে অস্ত্রোপচার করা খুবই কঠিন। তার উপরে আয়ুষের ওজন ছিল মাত্র এক কিলো আটশো গ্রাম।
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে আয়ুষ। ওজন বাড়ছে। দিব্যি হাত পা ছুঁড়ে খেলছেও। দুশ্চিন্তার দিন পেরিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছে মণ্ডল পরিবার।