রাত পৌনে এগারোটায় দুধ খাওয়াতে গিয়ে ওয়ার্মারে শোওয়ানো শিশুর গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠেছিলেন সোনম বাগদি। ‘সিক নিওনেটাল কেয়ার ইউনিট’ (এসএনসিইউ)-এ ডিউটিতে থাকা নার্সকে বলেছিলেন, ‘‘বাচ্চার গা খুব গরম। দিদি, একটু দেখুন।’’ সোনমের অভিযোগ, এর পরেও কর্তব্যরত নার্স বাচ্চার গায়ে এক বারও হাত দিয়ে দেখেননি।
২০ নভেম্বর রাতের এই ঘটনার পরের দিন ভোরে কলকাতা মেডিক্যালের এসএনসিইউয়ে যেতেই চিকিৎসকেরা তাঁকে জানান, শিশুর অবস্থা সঙ্কটজনক। অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। সোনম গিয়ে দেখেন, শিশুটির দেহ শক্ত, হাতের আঙুল কালো হয়ে মুড়ে গিয়েছে।
তালতলার বাসিন্দা অসরিমা খাতুনের অভিজ্ঞতাও প্রায় এক। তাঁর অভিযোগ, ‘‘গিয়ে দেখি বাচ্চার চোখমুখ কালো হয়ে গিয়েছে, নড়ছে না। কাঁদতে কাঁদতে ডাক্তারবাবু ও নার্সের কাছে গেলাম। ওঁরা নিজেদের মধ্যে গল্পই করতে লাগলেন!’’ তাঁর আরও অভিযোগ, ‘‘বাচ্চার ‘ডেথ সার্টিফিকেটে’ মৃত্যুর কারণ না লিখে শুধু মারা যাওয়ার তারিখ ও সময় লেখা হয়েছে!’’
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের এসএনসিইউয়ের রেডিয়্যান্ট ওয়ার্মারে দুই সদ্যোজাতের পুড়ে মৃত্যুর অভিযোগের ঘটনায় বারবার উঠে আসছে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের গাফিলতির প্রসঙ্গ। ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে সুপার শিখা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এখন আর কিছু বলা যাবে না।’’ স্বাস্থ্য দফতরের একটা বড় অংশই অবশ্য স্বীকার করছেন, দ্রুত তদন্ত করার বদলে বুধবার গুরু নানক জয়ন্তীর ছুটি কাটাতে ব্যস্ত ছিলেন স্বাস্থ্য কর্তারা। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিতে চাননি।
সাম্প্রতিক সব নির্বাচনে কলকাতা-সহ বিভিন্ন জেলায় গুরুতর অসুস্থ সদ্যোজাতের চিকিৎসায় এসএনসিইউ গড়ে তোলাকে সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তা হলে এমন গাফিলতি হবে কেন? কেন চিকিৎসক বা নার্স প্রতি আধ ঘণ্টা-এক ঘণ্টা অন্তর ওয়ার্মারে থাকা প্রতিটি শিশুর শরীরের তাপ মাপবেন না?
মেডিক্যালের এসএনসিইউয়ের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক তাপস সাবুই এ দিন বারবার ফোন কেটে দেন। রাজ্যে এসএনসিইউগুলোর নজরদারিতে গঠিত কমিটির প্রধান ত্রিদিব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ঘটনাটি নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক। কিন্তু এর জন্য কারও গাফিলতি দায়ী, সেটা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা পড়ার আগেই ভেবে নেওয়া ঠিক নয়।’’ তাঁর আরও ব্যাখ্যা, ‘‘এসএনসিইউয়ে সব সময় শয্যার তুলনার দ্বিগুণ-তিন গুণ বাচ্চা ভর্তি হয়। প্রচণ্ড চাপের মধ্যে
সব সময় নার্স, ডাক্তারদের কাজ করতে হয়। নজরদারিতে কখনও সামান্য ফাঁক হতে পারে। সেটা ইচ্ছাকৃত নয়।’’
প্রশ্ন উঠেছে, এসএনসিইউয়ের ওয়ার্মার থেকে সরাসরি মায়েরা কেন বাচ্চাদের তুলে দুধ খাওয়াবেন বা শোয়াতে যাবেন? এই কাজ তো নার্সদের। মায়েরা এটা করতে গেলেই দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা। তা ছাড়া, মা যখন জানাচ্ছেন, শিশুর তাপ বেশি, তখনও কেন নার্স দেখবেন না? ত্রিদিববাবুর উত্তর, ‘‘কেউ গাফিলতি করে থাকলে তদন্তে ধরা পড়বে।’’
রাজ্যে এখন ৪৮টি এসএনসিইউ রয়েছে। আরও ১৮টি হওয়ার কথা। বহু দিন ধরেই অভিযোগ, এসএনসিইউয়ের বাড়ি তৈরি হচ্ছে, যন্ত্র আসছে, কিন্তু প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসাকর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ এসএনসিইউ ধুঁকছে। ভারত সরকারের স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা নিওনেটোলজিস্ট অরুণ সিংহের কথায়, ‘‘লোকের সংস্থান না-করে শুধু লোকদেখানো কেন্দ্র খুললে তার পরিণতি এমনই হয়।’’