দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে, বলেছিল স্বাস্থ্য দফতর।
শেষ অবধি তিন জন জুনিয়র ডাক্তার এবং এক নার্স সাসপেন্ড হলেন। কিন্তু, যে সিনিয়র চিকিৎসক ও নার্সরা ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন, তাঁরা স্রেফ এক মেডিক্যাল কলেজ থেকে কলকাতারই আর এক মেডিক্যাল কলেজে বদলি হলেন। সঙ্গে শো-কজ! কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে দুই শিশুর পুড়ে মরার ঘটনায় রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের ঘোষিত ‘দৃষ্টান্তমূলক’ শাস্তি বলতে এইটুকুই! একই সঙ্গে জুনিয়রদের ‘বলির পাঁঠা’ করে সিনিয়রদের ছাড় দেওয়ার সরকারি ঐতিহ্যও বজায় রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ‘সিক নিওনেটাল কেয়ার ইউনিট’ (এসএনসিইউ)-এ গত ২০ নভেম্বর রাতে রেডিয়েন্ট ওয়ার্মারে দুই সদ্যোজাত মারাত্মক পুড়ে পুড়ে যায়। পর দিন তাদের মৃত ঘোষণা করা হয়। ঘটনা ধামাচাপা দিতে মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ এসএনসিইউ-এর চিকিৎসক ও নার্সদের মুখ বন্ধ রাখতে বলেছিল বলে অভিযোগ। খুবই গোপনে অধ্যক্ষ তপনকুমার লাহিড়ি, সুপার শিখা বন্দ্যোপাধ্যায়, পেডিয়াট্রিক মেডিসিন তথা এসএনসিইউ প্রধান তাপসকুমার সাবুই এবং নার্সিং সুপার কেয়া সামন্তকে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এমনকী, এ রকম গুরুতর ঘটনার খবর তৎক্ষণাৎ স্বাস্থ্যসচিব বা স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তাকেও জানানো হয়নি।
আনন্দবাজার পত্রিকায় ২৫ নভেম্বর ঘটনার কথা প্রকাশিত হওয়ার পরেই স্বাস্থ্য দফতরে হুলস্থুল শুরু হয়। সমালোচনার ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে যায় স্বাস্থ্য দফতর। তদন্ত রিপোর্ট চেয়ে পাঠান স্বাস্থ্যসচিব মলয় দে। ২৬ তারিখ রিপোর্ট পেয়ে তিনি জানান, একাধিক চিকিৎসক ও নার্সের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শুক্রবার দুপুরেই নবান্ন থেকে মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সই করা শাস্তির ফাইল স্বাস্থ্যভবনে পৌঁছয়। তাতে দেখা যাচ্ছে, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তদন্ত কমিটিতে যে চার জন চিকিৎসক ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই কিছু না কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিকট অতীতে কখনও তদন্ত কমিটির সদস্যদেরই শাস্তির নজির স্বাস্থ্য দফতরে নেই।
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, এসএনসিইউ-য়ে যথেষ্ট নজরদারি ছিল না এবং কেন ঘটনার পরেই স্বাস্থ্যকর্তাদের জানানো হয়নি, সে ব্যাপারে মেডিক্যালের অধ্যক্ষ ও সুপারকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। তাপসকুমার সাবুই এবং কেয়া সামন্তকে বদলি করা হয়েছে আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। একই সঙ্গে, ঘটনার সময় ডিউটিতে থাকা নার্স চন্দ্রাণী দে-কে অনির্দিষ্টকালের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে। এক মাসের জন্য সাসপেন্ড হয়েছেন তিন পিজিটি রোশনী চক্রবর্তী, মালবিকা মাইতি ও
সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আরএমও সুশান্ত ভঞ্জ, ডেপুটি নার্সিং সুপার ইন্দ্রাণী দাস এবং এএসএনসিইউ-এর নার্সিং ইন-চার্জ শ্রাবণী পালকে আরজিকর-এ বদলি করা হয়েছে। তবে, তাপসবাবু, কেয়াদেবী, সুশান্তবাবু ও ইন্দ্রাণীদেবীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। শাস্তিপ্রাপ্তরা কেউই অবশ্য এ দিন মুখ খুলতে রাজি হননি।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, গাফিলতির এত বড় অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কলকাতারই এক মেডিক্যাল কলেজ থেকে আর এক মেডিক্যাল কলেজে বদলিকে কি শাস্তি বলা যায়? রাজ্যে এসএনসিইউগুলির নজরদারিতে গঠিত কমিটির প্রধান ত্রিদিব বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তর, ‘‘যাঁরা সাসপেন্ড করার মতো অপরাধ করেননি, তাঁদের সাসপেন্ড করি কী করে? এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। দুর্ভাগ্যবশত ঘটে গিয়েছে। তাতে এর থেকে বেশি ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।’’ বিভাগীয় প্রধান, নার্সিং সুপারদের কাজ হল এসএনসিইউয়ে সব পরিষেবার লাগাতার নজরদারি করা। তাঁরা সেই কাজে ব্যর্থ হলেও তা ত্রুটি হিসাবে গণ্য হবে না কেন? উত্তর দেননি ত্রিদিববাবু। তবে, ঘটনার দায় নিয়ে তিনি পদ থেকে ইস্তফা দেবেন কিনা জানতে চাওয়ায় তাঁর জবাব, ‘‘আমি কেন পদত্যাগ করব? এত দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করা হল। এত বড় ঘটনা আমি যে-ভাবে সামলালাম, সেটা আর কেউ পারতেন কিনা সন্দেহ।’’
স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথীর কথায়, ‘‘যে চিকিৎসক-নার্সরা সে দিন সরাসরি ডিউটিতে ছিলেন, তাঁদের দোষ অনেক বেশি। তাই তাঁরা সাসপেন্ড হয়েছেন। যাঁরা সরাসরি জড়িত নন, তাঁদের বদলি করা হয়েছে। তবে, তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও হবে।’’
এই ঘটনায় স্বাস্থ্য দফতর পুলিশে অভিযোগ করবে না বলেও জানিয়েছেন ত্রিদিববাবু। সন্তান-হারানো দুই পরিবারের তরফে অষ্টম বাগদি ও মহম্মদ শাকিবের কথায়, ‘‘কিছুটা শাস্তি যে হয়েছে, সেটা স্বস্তি-র। আমরা চেয়েছিলাম, বাচ্চাদের মেরে ফেলার ব্যাপারে যাঁরা অভিযুক্ত, তাঁদের প্রত্যেককে সাসপেন্ড করা হোক। এ বার পুলিশে যাওয়ার কথাও ভাবব।’’
কলকাতা মেডিক্যালের ঘটনায় শাস্তি হয়েছে। পুরুলিয়া সদর হাসপাতালে গাফিলতির জেরে নবজাতক মৃত্যুর অভিযোগের তদন্তে চার জনের কমিটি গড়েছে জেলা স্বাস্থ্য দফতর। তবে এ দিনও মৃত শিশুর দেহের সুরতহাল করানো যায়নি। শিশুটির বাড়ির লোক অনুপস্থিত থাকাতেই তা করা যায়নি বলে দাবি করেছে পুলিশ। তবে মৃত সদ্যোজাতের কানে ও মাথায় রক্তের ছবি দেখে চটেছেন স্বাস্থ্যকর্তারা। বিশ্বরঞ্জনবাবু এ দিন সন্ধ্যায় বলেন, ‘‘এই ঘটনা সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। আমি রিপোর্ট চেয়েছিলাম। তা-ও পাইনি। আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব!’’ যদিও তিনি রিপোর্ট পাঠিয়েছেন বলে দাবি করেছেন পুরুলিয়ার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক অনিল দত্ত।