• নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

দুষ্টু আইন...ভ্যানিশ!

বাকস্বাধীনতার তালা খুলল সুপ্রিম কোর্টে

1

Advertisement

শিবঠাকুরের দেশে পদ্য লিখলে খাঁচায় পোরা হতো। ইন্টারনেটে টিপ্পনী কাটা বা ছবি সাঁটার দায়ে ফাটকে পোরার ব্যবস্থা এ দেশেও চালু ছিল এত দিন। একুশে আইন নয়, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬এ ধারায়।

মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট এই আইন সম্পূর্ণ বাতিল করে দিল। শীর্ষ আদালতের রায়, এই আইন অসাংবিধানিক। বাকস্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের বিরোধী।

অর্থাৎ ‘দুষ্টু লোক ভ্যানিশ!’ লিখলে জেলে যেতে হতো যে আইনে, সেই ‘দুষ্টু’ আইনই ‘ভ্যানিশ’ হয়ে গেল আজ থেকে।

সেই সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে গেল, রাজনৈতিক দলগুলি মুখে যতই বাকস্বাধীনতার কথা বলুক, কার্যক্ষেত্রে তারা সকলেই আইনি বেড়া চাপানোর পক্ষপাতী। এ ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মনমোহন সিংহ বা নরেন্দ্র মোদী কারওরই খুব তফাৎ নেই। নাগরিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব তাই নিতে হল সুপ্রিম কোর্টকেই।

কী রকম? যে আইনে অম্বিকেশ মহাপাত্রকে জেলে পাঠিয়েছিলেন মমতা, সেই ৬৬এ ধারাটি তথ্যপ্রযুক্তি আইনে জোড়া হয়েছিল ২০০৯ সালে। কেন্দ্রে তখন ইউপিএ সরকার। কপিল সিব্বল তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী। বিরোধী দল বিজেপি কিন্তু আইনের বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি। তার তিন বছর পরে আইনটির বিরুদ্ধে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন আইনের ছাত্রী শ্রেয়া সিঙ্ঘল। তখনও ইউপিএ সরকারই ক্ষমতায়। গত লোকসভা নির্বাচনে জিতে সরকার গড়ার পরে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ-ও আদালতে আইনটির পক্ষেই সওয়াল করেছে। তাদের বক্তব্য ছিল, এই আইনের অপব্যবহার যাতে না হয়, সরকার তা দেখবে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি জে চেলমেশ্বর ও বিচারপতি রোহিংটন ফলি নরিম্যানের বেঞ্চ এই যুক্তি মানেনি। বিচারপতিদের বক্তব্য, “সরকার আসবে, যাবে। আইন আইনের জায়গায় চিরকাল থাকবে।” অর্থাৎ আইনের অপব্যবহার হবে কি হবে না, সেটা সরকারের বদান্যতার উপরে নির্ভর করতে পারে না। যে আইন সংবিধানের বিরোধী, তাকে বলবৎ রাখারই প্রয়োজন নেই। বিচারপতি নরিম্যান বলেন, “৬৬এ ধারা একটি অসাংবিধানিক আইন। একে বাতিল করতে আমরা এতটুকু কুণ্ঠিত নই।”

বাংলার অম্বিকেশ থেকে মহারাষ্ট্রের শাহিন ধাড়া, অসীম ত্রিবেদী বা উত্তরপ্রদেশের গুলরেজ খান আজকের রায়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। কখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজস্ব মত জানিয়ে, কখনও ব্যঙ্গচিত্র ‘শেয়ার’ করে শাসকের রক্তচক্ষুর কবলে পড়েছিলেন ওঁরা। যখনই রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচিত হয়েছেন, তখনই প্রশাসন ৬৬এ-কে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে গুলরেজের ঘটনাটি সব চেয়ে নতুন। এ মাসেরই ১৮ তারিখ সমাজবাদী নেতা আজম খানের সম্পর্কে একটি মন্তব্যের দায়ে ১৮ বছরের এই তরুণকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। এখন তিনি জামিনে মুক্ত। আজ তাঁর বাড়িতে আনন্দের উৎসব।

সবিস্তার জানতে ক্লিক করুন।

জয়ের আনন্দ শাহিন আর রেণুর বাড়িতেও। ঠানের এই দুই তরুণীর গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছিল আইনি লড়াই। ওঁদের অপরাধ? বালসাহেব ঠাকরের মৃত্যুতে কেন মুম্বই অঘোষিত বন্ধ পালন করবে, এই নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেসবুকে মন্তব্য করেছিলেন শাহিন। শাহিনের পোস্টটি ‘লাইক’ করেছিলেন তাঁর বন্ধু রেণু। ২০১২ সালের নভেম্বর মাসের ঘটনা। মহারাষ্ট্র পুলিশ দু’জনকেই গ্রেফতার করে। ঠিক যেমন তার ক’মাস আগেই, ২০১২-র এপ্রিলে ব্যঙ্গচিত্রের ই-মেল বন্ধুদের ‘ফরওয়ার্ড’ করে গ্রেফতার হয়ে গিয়েছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অম্বিকেশ মহাপাত্র। শাহিন-রেণুর ঘটনায় তারই পুনরাবৃত্তি দেখে নিজের কর্তব্য স্থির করে নেন আর এক জন শ্রেয়া সিঙ্ঘল। আইনের ছাত্রী তিনি। আইনজীবী মা মানালি সিঙ্ঘলও পাশে রইলেন। শ্রেয়া ৬৬এ ধারাটিকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা করলেন। আজ জয় এল। স্বাভাবিক ভাবেই শ্রেয়া উচ্ছ্বসিত। বললেন, “ফেসবুকে কিছু পোস্ট করার জন্য দুই তরুণীর গ্রেফতারে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। তখনই মামলার সিদ্ধান্ত নিই। আইনের এই দানবীয় ধারার জন্য শাহিন-রেণুু-অম্বিকেশবাবুর মতো যাঁদের হেনস্থা হতে হয়েছে, আজ তাঁদের জয়।” দেশের প্রাক্তন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ইন্দিরা জয়সিংহ এ দিন শ্রেয়াকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “শ্রেয়া, তিরিশের নীচের প্রজন্মের কেউই এই কাজটা করতে পারত।”

আর শাহিনের বাবা মহম্মদ ফারুক ধাড়া বলেছেন, “আমি মেয়েকে কোনও দিনই বকিনি। কারণ ও  কোনও ভুল করেনি। আজ সেটাই প্রমাণিত হল।” শাহিনের বান্ধবী  রেণুর গলায় আত্মবিশ্বাস, “আমি ভবিষ্যতেও সোশ্যাল মিডিয়ায়  নিজের স্বাধীন মত প্রকাশ করব।”

স্বাধীন চিন্তা, স্বাধীন মতপ্রকাশ আর সেই মত জানার স্বাধীনতা ৬৬এ ধারায় এর সবগুলোই বিঘ্নিত হচ্ছিল বলে শীর্ষ আদালতের মত। গণতন্ত্রে এই অধিকার ‘অপরিহার্য’ বলে মন্তব্য করেছেন বিচারপতিরা। কেন্দ্রীয় সরকারও দাবি করেছে, তারা নাগরিক স্বাধীনতা হরণের পক্ষে নয়। তা হলে সরকার ৬৬এ ধারা টিকিয়ে রাখতে আদৌ আগ্রহী ছিল কেন? মোদী সরকারের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেটা আইনটি রেখে দেওয়ার জন্য সওয়াল করেছিলেন কেন? কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ এ দিন দাবি করেন, এ ব্যাপারে ইউপিএ সরকারের অবস্থান এবং তাঁদের অবস্থান মোটেই এক নয়। তাঁর অভিযোগ, “আমরা আদালতে লিখিত ভাবে জানিয়েছিলাম যে, আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে। ইউপিএ সরকারই বরং আইনটিকে রাজনৈতিক বিরোধিতা, ব্যঙ্গ এবং সরকারের পক্ষে অস্বস্তিকর অন্যান্য উপাদানকে দমন করার কাজে ব্যবহার করেছিল।”

৬৬এ ধারাটির মধ্যে যে গলদ থেকে গিয়েছিল, সে কথা আজ স্বীকার করেছেন আগের ইউপিএ সরকারের মন্ত্রী পি চিদম্বরমও। সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, “এই ধারাটি গোড়া থেকেই দুর্বল এবং ত্রুটিযুক্ত ছিল। এর অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ ছিল, এবং সেটা হয়েওছে।” চিদম্বরমের এই মন্তব্যের লক্ষ্য কপিল সিব্বল বলেই মনে করা হচ্ছে। এই আইন তৈরির পিছনে অন্যতম মস্তিষ্ক ছিলেন কপিল, এই আইনের পক্ষে বরাবর সরব হয়েছিলেন তিনিই। সেই কপিল আজ অবশ্য সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগতই জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, আইনের অপব্যবহার হয়ে থাকলে সেটা কখনওই কাম্য নয়। তবে তাঁর দাবি, আইনটি তাঁর একার মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। মন্ত্রিসভার সমর্থন ছাড়া তিনি একা আইন পাশ করাননি। অতএব আইনে ত্রুটি থেকে থাকে, তার দায়ও তাঁর একার নয় বলতে চেয়েছেন তিনি।

কী ধরনের ত্রুটি ছিল আইনে? সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, ইন্টারনেটে কী কী কার্যকলাপ অপরাধ বলে গণ্য হবে, সেটাই ৬৬এ ধারায় স্পষ্ট নয়। যেমন এই আইনে বলা আছে, কম্পিউটারের মাধ্যমে ‘অসন্তোষজনক’, ‘অসুবিধাজনক’ এবং ‘আপত্তিকর’ উপাদান ছড়ানো অপরাধ। কিন্তু ‘অসন্তোষজনক’, ‘অসুবিধাজনক’ ও ‘আপত্তিকর’-এর স্পষ্ট সংজ্ঞা আইনে নেই। বিচারপতিদের কথায়, এক জনের কাছে যা আপত্তিকর, অন্যের কাছে তা না-ও হতে পারে! একই বিষয়বস্তু নিয়ে বিচারপতিরাই কত সময় আলাদা মত পোষণ করেন! তা হলে প্রশাসন কী ভাবে ঠিক করবে যে কোনটা আপত্তিকর আর কোনটা নয়?

তবে ধারা খারিজ হল মানে এই নয় যে, এখন থেকে ইন্টারনেটে যথেচ্ছ কুৎসা বা বিদ্বেষমূলক মন্তব্য বা ছবি দেওয়ার স্বাধীনতা মিলে গেল। শীর্ষ আদালত বলেছে যে, ব্যক্তিগত কুৎসা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করার মতো উপাদান বা জাতি-ধর্ম-বর্ণের প্রতি বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে কেউ পার পাবে না। ভারতীয় দণ্ডবিধির আওতাতেই তার বিরুদ্ধে যথোচিত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এই মামলার অন্যতম আইনজীবী অপার গুপ্ত বলেন, “ফৌজদারি অপরাধ আইন বা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অন্যান্য ধারায় দোষীদের বিরুদ্ধে সব রকম ব্যবস্থাই নেওয়া যাবে। কোনও ওয়েবসাইটে এই ধরনের ছবি-বিবৃতি থাকলে সরকার তাতে নিষেধাজ্ঞাও প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু ৬৬এ ধারাটি পুলিশ-প্রশাসনের ইচ্ছেমতো বা প্রতিহিংসামূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সুযোগ ছিল। সেই আশঙ্কা আর রইল না।” বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯এ ধারাও অপরিবর্তিত থাকছে। ওই ধারায় প্রয়োজন বোধে ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচারিত কোনও তথ্য ‘ব্লক’ করে দেওয়া যায়।

সরকার এখন কী ভাবছে? আইনটি তৈরির সময়েও কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ আধিকারিকরা যা বলতেন, এখনও তার অনুরূপ বেশ কিছু যুক্তি শোনা যাচ্ছে সরকারের অন্দরে। প্রশাসনের একাংশ বলছেন, ভারতীয় দণ্ডবিধির কাঠামোয় ইন্টারনেটকে সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না দেখেই নতুন আইনের প্রয়োজন হয়েছিল। ইদানীং ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে দেশের মধ্যে অশান্তি ছড়ানো বা সাম্প্রদায়িক হিংসার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা হয়েছে। অশালীন ছবি বা মন্তব্য করে অপপ্রচার, বিশেষত মহিলাদের সম্মানহানির চেষ্টাও আকছার ঘটছে। এই বিষয়গুলি মাথায় রেখেই রবিশঙ্কর প্রসাদ আজ বলে রেখেছেন, “নিরাপত্তা সংস্থাগুলি যদি মনে করে, তা হলে সংবিধানকে ক্ষুণ্ণ না করে এবং নাগরিক রক্ষাকবচ অক্ষত রেখে নতুন আইনি কাঠামোর কথা ভাবা হতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে স্ব-নিয়ন্ত্রণও কিন্তু জরুরি।” অনেকটা একই সুর চিদম্বরমেরও। তাঁর মন্তব্য, “আইনের কোনও কোনও দিক আরও শক্তিশালী করার দরকার থাকতে পারে। তবে ৬৬এ তার কোনও সমাধান নয়।”

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন