উত্তরপ্রদেশের মহাজোট মুখ থুবড়ে পড়ার পর এসপি এবং বিএসপি পরস্পরের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনেছিল। অখিলেশ যাদব ঘরোয়া আলোচনায় বলেছিলেন, তাঁদের জোট প্রার্থীর কাছে মায়াবতীর ভোট আসেনি। মায়াবতী সাংবাদিক সম্মেলন করে দাবি করেছিলেন, জোট হয়েছে ঠিকই কিন্তু তাঁর প্রার্থী এসপি-র ভোট পাননি।

সম্প্রতি ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটি’র (সিএসডিএস) ভোট পরবর্তী সমীক্ষা রিপোর্টে পরিসংখ্যান দিয়ে কিন্তু দেখানো হয়েছে, এসপি-বিএসপি-র পরাজয়ের কারণ অন্য। এই দলগুলির সাবেকি ভোটব্যাঙ্কেই ক্ষয় ধরেছে। এসপি-র যাদব এবং বিএসপি-র দলিত (জাটভ শ্রেণি ছাড়া) ভোট অনেকটাই টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি।

রাজনৈতিক শিবিরে অতএব প্রশ্ন উঠছে, জাতপাতের রাজনীতি কি তা হলে শেষ হয়ে আসছে? লালুপ্রসাদ, অখিলেশ, মায়াবতীর মতো নেতাদের আধিপত্য বজায় রাখতে না-পারা কি সেটাই চিহ্নিত করছে না? পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্নও সামনে আসছে। একমাত্র দাক্ষিণাত্য ছাড়া (যেখানে আঞ্চলিক দলগুলির জাত্যভিমান প্রখর) দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আঞ্চলিক দলগুলির কি তবে বিপদঘন্টা বেজে গেল? এই তালিকায় তৃণমূলও রয়েছে কি? তা নিয়েও আলোচনায় সরগরম রাজধানী।

আপাতত উত্তরপ্রদেশকে নিয়ে সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, হিন্দু মুসলমান মেরুকরণের জেরে মুসলমান ভোটব্যাঙ্ক মোটামুটি ধরে রাখতে পারলেও যাদবদের কিন্তু হারিয়েছেন অখিলেশ। অথচ যাদব এবং মুসলিমই ছিল মুলায়ম সিংহদের সাবেকি শক্তি। আগের লোকসভা ভোটেও ৭৫ শতাংশ যাদব ভোট পেয়েছিল এসপি। কিন্তু এ বার এসপি-র যাদব ভোটের ১০ শতাংশেরও বেশি চলে গিয়েছে বিজেপির বাক্সে, মন্ডল-কমন্ডল রাজনীতি শুরু হওয়ার পর কখনও যেটা হয়নি।

অন্য দিকে মায়াবতীর সাবেকি জাটভ ভোটের ১৮ শতাংশ পেয়েছে বিজেপি। সমীক্ষায় প্রকাশ, জাটভ সম্প্রদায়ভুক্ত নয় এমন দলিত ভোটেরও মাত্র ৩৯ শতাংশ গিয়েছে বিএসপি এবং ৪৬ শতাংশ গিয়েছে এসপি প্রার্থীর কাছে। পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, অর্ধেকেরও বেশি দলিত ভোট (যারা জাটভ নন) পেয়েছে বিজেপি। আবার যারা যাদব নন, এমন অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির একটি বিরাট অংশের ভোটও (৭২ থেকে ৭৫ শতাংশ) পেয়েছে বিজেপি।

কী ভাবে? রাজনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, ছোট ছোট দলিত গোষ্ঠী এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিকে জাতের ঊর্ধ্বে উঠিয়ে এনে হিন্দুত্বের মঞ্চে নিয়ে আসতে পেরেছে বিজেপি। আঞ্চলিক দলগুলির দীর্ঘদিনের ব্যর্থতাই সেটা সম্ভব করেছে। সামাজিক ন্যায়কে সামনে রেখে উঠে আসা এসপি এবং বিএসপি ক্রমশ তাদের মূল মন্ত্র থেকে সরে এসেছে। পিছড়ে বর্গকে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে গড়ে তুলতে পারেননি মায়া মুলায়ম। বরং আঞ্চলিক আশাআকাকঙ্ক্ষা পূরণের নামে তৈরি হয়েছে বাহুবলীকেন্দ্রিক রাজনীতি। পাশাপাশি দরিদ্র যুবসম্প্রদায় যে আর জাতপাতের রাজনীতিতে আস্থা রাখছেন না, সেটিও স্পষ্ট। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা না মিটিয়ে জাতপাতকেই মোক্ষ করতে মানুষ যে নারাজ, তা ২০১৭ সালের উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোটেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। রাজনৈতিক শিবিরের মতে, হিন্দুত্বের জোয়ার এনে দলিত ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিকে বিজেপি দীর্ঘমেয়াদি ভাবে কতটা আপন করে নিতে পারবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু আপাতত হৃতজমি পুনরুদ্ধার করতে হলে আরজেডি-এসপি-বিএসপির মতো জাতভিত্তিক দলগুলিকে রণকৌশল বদলাতে হবে, এটা স্পষ্ট।