বিজেপি-শাসিত একাধিক রাজ্যে গো-রক্ষকদের তাণ্ডব এবং তা নিয়ে দেশ জুড়ে বিতর্ক সত্ত্বেও এত দিন মুখ বুজেই ছিলেন তিনি।

কিন্তু ভোটের অঙ্কই শেষ পর্যন্ত তাঁর মৌনী ভাঙল! কারণ, এই ঘটনার জেরে উত্তরপ্রদেশে দলিত ভোট হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে বলে ভয় পাচ্ছে বিজেপি। সরকারের অন্দরেও ভয়, পরিস্থিতি ক্রমশ আরও হাতের বাইরে চয়ে যেতে পারে। তাই শনিবার এক অনুষ্ঠানে নিজে থেকেই গো-রক্ষক বাহিনীর বিরুদ্ধে মুখ খুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শুধু মুখ খুললেন না, গো-রক্ষকদের সরাসরি ‘সমাজবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বললেন, ‘এরা বেআইনি কাজকারবারে জড়িত! নিজেদের ‘কালো ধান্ধা’ ধামাচাপা দিতেই গো-রক্ষকের মুখোশ পরে নতুন ব্যবসা শুরু করেছে’। তাঁর কথায়, ‘‘এ সব দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হয়।’’

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রশাসনের কাজে আমজনতার মতামত নেওয়ার জন্য ‘মাইগভ’ পোর্টাল চালু করেছিলেন মোদী। তাঁর সরকারের দু’বছর পূর্তি উপলক্ষে, সেই ‘মাইগভ’-এর অনুষ্ঠানের মঞ্চকেই গো-রক্ষকদের আক্রমণের জন্য বেছে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

বারাক ওবামার ‘টাউনহল অনুষ্ঠান’-এর ধাঁচে মোদী সরাসরি আমজনতার প্রশ্নের উত্তর দেবেন, এমন আয়োজনই হয়েছিল দিল্লির ইন্দিরা গাঁধী স্টেডিয়ামে। সেখানে কেউ যে গো-রক্ষকদের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তা কিন্তু নয়। নয়ডার এক তরুণী ছবি যাদব প্রশ্ন করেছিলেন, ভাল স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার জন্য কী বিশেষ গুণ দরকার?

এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েই গো-রক্ষকদের নিশানা করেন মোদী। যা দেখে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মোদী আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন যে তিনি আজ এ বিষয়ে মুখ খুলবেন। কারণ ছবি যাদবের প্রশ্ন আগে থেকেই ভিডিও রেকর্ড করা ছিল। অনুষ্ঠানের মহড়াও হয়ে গিয়েছিল। কাজেই পরিকল্পনা মাফিকই গো-রক্ষকদের নিশানা করেন মোদী। শুধু তা-ই নয়, রাজ্য সরকারগুলিকে এদের ব্যাপারে নথি তৈরি করতেও বলেছেন। মোদীর যুক্তি, তা হলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, স্বঘোষিত গো-রক্ষকদের ৭০-৮০ শতাংশ সমাজবিরোধী কাজে জড়িত!

বিনা প্রশ্নে মোদীর এমন মন্তব্য নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই গুঞ্জন উঠেছে। কারণ গো-রক্ষকদের তাণ্ডবটা শুরু হয়েছে গত বছরের শেষ ভাগ থেকে। উত্তরপ্রদেশের দাদরিতে মহম্মদ আখলাখের খুন দিয়ে শুরু। তার পর রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ছাপিয়ে মোদীর নিজের রাজ্য গুজরাতেও এই বাহিনীর তাণ্ডবের শিকার হয়েছেন দলিত ও সংখ্যালঘুরা। কিন্তু একটি কথাও শোনা যায়নি মোদীর মুখে।

তা হলে এ দিন কেন বললেন? পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মোদী কৌশলে গো-রক্ষকদের আক্রমণ করলেও সঙ্ঘ-পরিবার বা আরএসএস-এর বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। সঙ্ঘ-পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সুতোয় টান পড়বে, এমন কোনও পথে হাঁটেননি। উল্টে সঙ্ঘ-পরিবার যে গো-সেবার কথা বলে, তাতেই উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, গো-সেবা ও গো-রক্ষার মধ্যে অনেক ফারাক। সত্যিকারের গো-সেবা করতে হলে মাঠেঘাটে প্লাস্টিক ফেলা বন্ধ করতে হবে। কারণ এই প্লাস্টিক খেয়ে বহু গরু মারা যায়। মোদী বলেন, ‘‘যাঁরা সমাজসেবা করেন, তাঁরা প্লাস্টিক ফেলা বন্ধ করুন। তাতেই গরুর সেবা করা হবে।’’

গো-রক্ষকদের তাণ্ডব নিয়ে সংসদের চলতি অধিবেশনে কংগ্রেস থেকে শুরু করে সব বিরোধী দলই প্রধানমন্ত্রীকে নিশানা করেছে। গুজরাতের উনায় মৃত গরুর চামড়া ছাড়ানোর জন্য দলিতদের নির্যাতনের পরে দাবি উঠেছে, প্রধানমন্ত্রীকে মুখ খুলতে হবে। কংগ্রেস অভিযোগ তুলেছে, এই সব গো-রক্ষা বাহিনী আসলে সঙ্ঘ-পরিবারের শাখা। কিছু গো-রক্ষা সংগঠনের নেতাও বলেছিলেন, তাঁরা আরএসএস-এর সমর্থনেই কাজ করেন। স্বাভাবিক ভাবেই অস্বস্তি বাড়ছিল সরকারের। উনার ঘটনার পরে আমদাবাদের রাস্তায় দলিতদের বিরাট সমাবেশ চিন্তা বাড়িয়েছিল রাজ্য বিজেপির। বিপাকে পড়ে আগামী বছর গুজরাত ভোটের কথা মাথায় রেখে দলিত-ক্ষোভ চাপা দিতে মুখ্যমন্ত্রী পদে বদলও করেছে বিজেপি। কিন্তু দলিতরা আমদাবাদ থেকে ১০ দিনের বিশাল পদযাত্রা শুরু করে রাজ্যের বিজেপি সরকারকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উত্তরপ্রদেশের ভোটের অঙ্ক। যেখানে দলিতদের পাশে পেতে বিভিন্ন ঘটনাকে তুলে ধরে মোদী সরকার তথা বিজেপিকে ‘দলিত বিরোধী’ তকমা দিয়ে প্রচারে নেমে পড়েছেন বসপা-নেত্রী মায়াবতী। বিজেপিও বুঝতে পারছে, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে শুধু মাত্র উচ্চবর্ণের হিন্দু ভোট দিয়ে বাজিমাত করা যাবে না। সরকার গড়তে গেলে দলিত ভোটও চাই।

এই অবস্থায় মোদী আজ মুখ খুললেন। শুধু গো-রক্ষা বাহিনীকে আক্রমণ না, উন্নয়ন নিয়েও অনেক কথা বলেছেন এ দিন। বিজেপির শীর্ষ নেতাদের একাংশের বক্তব্য, মোদী সরকারের আমলে অনেক ভাল কাজ হচ্ছে। কিন্তু কখনও অসহিষ্ণুতা বিতর্ক, কখনও দলিত-ছাত্র রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যা, কখনও
দাদরিতে গোমাংস রাখার ‘অপরাধ’-এ মহম্মদ আখলাককে খুন, হালফিলে গো-রক্ষা বাহিনীর কাজকর্মে সে সব ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। এ দিনের কড়া বক্তব্যের পরে যদি পরিস্থিতি কিছুটা বদলায়।

মোদীর এই বক্তব্যের পর কংগ্রেস প্রশ্ন তুলেছে, রাগ দেখিয়ে কী হবে? দলিত, গরিবরা ‘অ্যাঙ্গার’ নয়, ‘অ্যাকশন’ দেখতে চায়। বিজেপির তরফে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী আজ রাজ্য সরকারগুলিকে স্বঘোষিত গো-রক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। যার পরে কংগ্রেস নেতা রণদীপ সূর্যেওয়ালা বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী কি তা হলে মানছেন যে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীরা এতদিন দুষ্কৃতীদের মদত দিচ্ছিল? না কি এত দিন ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য তাঁদের অপদার্থতা মেনে নিচ্ছেন?’’

পর্যবেক্ষকদের মত, ২০১৪-র ভোটে তরুণ প্রজন্মের ভোটকেই পাখির চোখ করেছিলেন মোদী। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর দু’রকম ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। একদিকে তিনি ডিজিটাল ভারতের কথা বলছেন, ‘মাইগভ’ পোর্টাল খুলে তথ্যপ্রযুক্তির জয়গান গাইছেন, তরুণদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। উল্টো দিকে তাঁর জমানাতেই উগ্রহিন্দুত্বের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে তরুণদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। মোদী বুঝতে পারছিলেন, গো-রক্ষকদের সক্রিয়তা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তাঁর  গ্রহণযোগ্যতায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আজ তাই ‘মাইগভ’-এর মঞ্চে, তথ্যপ্রযুক্তি বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অভ্যস্ত নাগরিক সমাজের সামনে সেই বাধা কাটানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।