আগামী বছর গুরু নানকের জন্মের ৫৫০ বছর পূর্তি। সেই উপলক্ষে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে করতারপুর করিডর গড়ায় সায় দিয়েছে মোদী সরকার। ভারতের পঞ্জাব থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত সেটি। সীমান্তের ওপারে পাকিস্তানেও একই ধরনের একটি করিডর গড়ে উঠবে, যাতে উপকৃত হবেন পুণ্যার্থীরা। সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশে অবস্থিত করতারপুর গুরুদ্বারে নানকের সমাধিস্থলে পৌঁছতে আর সমস্যায় পড়তে হবে না তাঁদের। যে কোনও আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের মতো সুযোগ সুবিধা মিলবে ওই করিডরে। উপ রাষ্ট্রপতি বেঙ্কাইয়া নাইডু এবং পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংহ সোমবারই তার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। পাকিস্তানের তরফে বুধবার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করবেন ইমরান খান। কিন্তু যে করতারপুর গুরুদ্বার ঘিরে এত তোরজোর, তার সম্পর্কে এগুলি জানতেন কি!

  • লাহৌর থেকে ১২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশের নানকানা সাহিব শহরে ইরাবতী নদীর তীরে অবস্থিত করতারপুর গুরুদ্বার। তার পুরো নাম গুরুদ্বার দরবার সাহিব করতারপুর। পৃথিবীর সর্বপ্রথম গুরুদ্বার সেটি। তাই ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসীম। ১৫২২ সালে গুরুদ্বারটি স্থাপন করেন প্রথম শিখ ধর্মগুরু।
  • ভারতের পঞ্জাবের গুরদাসপুরের ডেরা নবাব সাহিব রেল স্টেশন থেকে গুরুদ্বারটির দূরত্ব মোটে চার কিলোমিটার। এমনকি সীমান্তের এপার থেকে দেখাও যায় সেটি।
  • জীবনের ১৮টি বছর ওই গুরুদ্বারেই কাটান প্রথম গুরু নানক। ১৫৩৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলে বিশ্বাস ভক্তদের। তাঁর একটি সমাধিও রয়েছে সেখানে। তাই প্রতিবছর সেখানে ভিড় জমান ভক্তরা।
  • কথিত আছে, নানকের ভক্তদের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই সামিল ছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া শুরু হয় দু’পক্ষের মধ্যে। তাঁকে সমাধিস্থ করার দাবি তোলেন মুসলিমরা। হিন্দুরা রীতি মেনে তাঁর শেষকৃত্য করতে চান। পরিস্থিতি চরমে উঠলে আচমকাই তাঁদের সামনে আবির্ভূত হন নানক। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে রাত গড়িয়ে ভোর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। কিন্তু ভোরবেলা গুরুদ্বারে পৌঁছে মানুষ দেখেন, তাঁর দেহ উধাও হয়ে গিয়েছে। পড়ে রয়েছে শুধু কিছু ফুল। তার অর্ধেক সমাধিস্থ করেন মুসলিমরা। বাকি অর্ধেক ফুল নিয়ে নানকের শেষকৃত্য সারেন হিন্দুরা।

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

  • দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিক্ততা ক্রমশ বাড়লেও, করতারপুর গুরুদ্বারেরজন্যই আজও সম্পর্কের শেষ সুতোটুকু টিকে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে। ভিসা পাসপোর্ট ছাড়াই প্রতিবছর বিশেষ দিনগুলিতে ভারত থেকে হাজার হাজার শিখ পুণ্যার্থী হাজির হন সেখানে।
  • যদিও স্বাধীনতার পর থেকেই সেখানে যাওয়ার অবাধ সুযোগ ছিল না ভারতীয়দের। ১৯৭৪ সালে প্রথমবার ভারতের তরফে গুরুদ্বারটি সকলের জন্য খুলে দেওয়ার প্রস্তাব ওঠে। তার বাস্তবায়ন হয় অবশ্য ১৯৯৯ সালে। সে বছর বাসে চড়ে লাহৌর গিয়েছিলেন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ী। তিনিই প্রথম করিডর গড়ার প্রস্তাব দেন। ২০০০ সালে দুই দেশের সরকারই তাতে সম্মত হয়। কিন্তু অজানা কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি।
  • ২০০৪ এবং ২০০৮ সালে ইউপিএ সরকারের তরফে নতুন করে করিডর গড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ২০১০ সালে পঞ্জাব সরকারও কেন্দ্রকে তা নিয়ে চাপ দেয়। ২০১৭ সালে বিষয়টি সংসদে উঠলে দুই দেশের মধ্যে তিক্ততা বাড়ার অজুহাতে পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডিং কমিটির রিপোর্টে তা খারিজ হয়ে যায়।
  • বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয় চলতি বছরের অগস্ট মাসে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যান পঞ্জাবে কংগ্রেসের মন্ত্রী নভজ্যোত সিংহ সিধু। সেখানে পাক সেনা প্রধান কামার জাভেদ বাজওয়াকে আলিঙ্গন করেন তিনি। তার জন্য ‘দেশদ্রোহী’ তকমা জোটে তাঁর কপালে। বিজেপির তরফে তাঁর আচরণের তীব্র নিন্দা করা হয়। তবে সিধু জানান, পাক সেনাপ্রধান করিডর গড়ায় সায় দেওয়াতেই তাঁকে আলিঙ্গন করেন তিনি। বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে দেখাও করেন সিধু। যাতে করিডর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কথা শুরু হয়।
  • যার পর ২২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। সেখানে করিডরের প্রস্তাবে সায় মেলে। এ ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারকেও উদ্যোগ নিতে বলা হয়। বুধবার পাকিস্তানে করিডরটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন ইমরান খান।বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে সেখানে হাজির থাকতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তিনি। আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিংহকেও। তবে তাঁরা দু’জনেই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়েছেন। কেন্দ্রের অনুমতি নিয়ে গিয়েছেন শুধু সিধু।