ক্রমশ সুর চড়াচ্ছে বিরোধী শিবির। বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণের বিরুদ্ধে প্রায় এক সুরে কথা বলছে কংগ্রেস, তৃণমূল, বামেরা। কিন্তু বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্তে সরকার যে অটল, কোনও রাখঢাক না করেই তা এ বার বিরোধীদের জানিয়ে দিতে শুরু করল দেশের অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রক। আর সঙ্ঘাত তীব্র করার লক্ষ্যে সুর আরও চড়াতে শুরু করল তৃণমূল।

বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণ নিয়ে আলোচনা অনেক দিন ধরেই চলছে। লোকসভা এবং রাজ্যসভায় আগেই সরকারের বিলগ্নিকরণ নীতির বিরোধিতা করেছে তৃণমূল। সংসদের বাইরেও প্রতিবাদ চালিয়ে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল। এয়ার ইন্ডিয়া-সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণের যে সিদ্ধান্ত কেন্দ্র নিয়েছে, তার বিরুদ্ধে তোপ দাগতে শুরু করেছেন খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। রাজ্য সরকারি কর্মীদের নিয়ে তৃণমূলের যে সংগঠন, তার সাংগঠনিক সমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়ে মমতা শুক্রবারও বিষয়টি নিয়ে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রক যে চিঠি তৃণমূলের সংসদীয় দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠিয়েছে, তাতে কিন্তু আগেই স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, এ বিষয়ে কোনও বিরোধিতা সরকার মানবে না।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণ সক্রান্ত একটি প্রশ্ন গত ১৭ জুলাই লোকসভায় উত্থাপন করেছিলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। ৫ সেপ্টেম্বর সুদীপকে চিঠি লিখে জবাব দিয়েছেন অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর। তিনি লিখেছেন, ‘‘বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কৌশলগত বিলগ্নিকরণ করা হচ্ছে ভারত সরকারের বর্তমান নীতি অনুসারেই।’’ ‘মাইনরিটি স্টেক সেল’ অর্থাৎ অন্তত ৫১ শতাংশ মালিকানা হাতে রাখা বা সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ মালিকানা বিক্রি করার নীতিও সরকার অনুসরণ করছে বলে অনুরাগ জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন: ‘দেশে চাকরি আছে, উত্তর ভারতের প্রার্থীদের যোগ্যতা নেই’, বিতর্কিত মন্তব্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর

বিজেপি তথা এনডিএ বরাবরই বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণের পক্ষে। অটলবিহারী বাজপেয়ীর জমানায় শুধুমাত্র বিলগ্নিকরণের জন্যই আলাদা একটা মন্ত্রক তৈরি করা হয়েছিল। মোদী সরকারে তেমন কোনও স্বতন্ত্র মন্ত্রক নেই। তবে এ দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যতগুলি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার উপস্থিতি রয়েছে, ততগুলি ক্ষেত্রে আর রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নেই বলেই এই সরকার মনে করছে। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে অনুরাগ ঠাকুর জানিয়েছেন, যে সব ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই ‘প্রতিযোগিতামূলক বাজার’ তৈরি হয়ে গিয়েছে, সেই সব ক্ষেত্রে সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার থাকার প্রয়োজন যে নেই, এটা বুনিয়াদী আর্থিক নীতি এবং সেই অনুযায়ীই কৌশলগত বিলগ্নিকরণের পথে সরকার হাঁটছে।

আরও পড়ুন: দু’ হাজারেরও বেশি সংঘর্ষবিরতি লঙ্ঘন, পাকিস্তানকে হুঁশিয়ারি ভারতের

কর্পোরেট বিশেষজ্ঞ সুপর্ণ মৈত্রের কথায়, ‘‘স্বাধীনতার পর থেকেই দেশে একটা অংশ মনে করে আসছেন যে, সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়। তবু সরকার অনেক ব্যবসাতেই থেকেছে, এখনও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো সেই সব উদ্যোগ জরুরিও ছিল। কিন্তু পরবর্তী কালে সরকার চিহ্নিত করেছে, কোন কোন ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগ আর জরুরি নয়। বিমান পরিষেবাও তেমনই একটি ক্ষেত্র। তাই এয়ার ইন্ডিয়ার বিলগ্নিকরণ সরকারের ঘোষিত এবং অনুমোদিত নীতি অনুযায়ীই হচ্ছে।’’

এই আর্থিক বছরে শুধুমাত্র বিলগ্নিকরণ থেকেই এক লক্ষ পাঁচ হাজার কোটি টাকা আয় করার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে কেন্দ্র। শুধু এয়ার ইন্ডিয়া নয়, অন্য যে সব রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, সেগুলির ক্ষেত্রেও পিছু হঠার কথা সরকার ভাববে না বলে অর্থ ও কর্পোরেট মন্ত্রক সূত্রের খবর। তবে বিরোধী দলগুলির বড় অংশই সরকারের এই নীতির বিরোধিতায় আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিতে শুরু করেছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক বার মুখ খুলেছেন মোদী সরকারের বিলগ্নিকরণ নীতির বিরুদ্ধে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও তিনি এ প্রসঙ্গে আক্রমণ করেছেন সরকারকে। আর তৃণমূলের সংসদীয় দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় আনন্দবাজারকে বলেছেন, ‘‘এয়ার ইন্ডিয়া হল আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও গৌরবের প্রতিষ্ঠান। আমরা এই প্রতিষ্ঠানের বিলগ্নিকরণের বিরুদ্ধে।’’ বিরোধিতা যে চলবে তা সুদীপের মন্তব্যে পরিষ্কার।

তবে অনুরাগ ঠাকুরের লেখা চিঠিতেও পরিষ্কার যে, বিরোধিতা যতই হোক, সরকার থামবে না। তৃণমূলের সংসদীয় দলনেতাকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী লিখেছেন, ‘‘কৌশলগত বিলগ্নিকরণ থেকে যে টাকা আসবে তাকে সরকারের আয় হিসেবেই বাজেটে ধরা হয়েছে এবং পরিকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়ন-সহ বিভিন্ন খাতে সরকার সেই টাকা খরচ করবে।’’