রাবণবধের পর অযোধ্যায় ফিরছেন রামচন্দ্র। ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন রাজা দশরথ। রামের বকলমে রাজ্য চালাচ্ছেন ভরত। প্রাণাধিক প্রিয় রামচন্দ্রের অযোধ্যা প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখতে তাঁকে দীপ জ্বালিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন অযোধ্যার মানুষ। সুশাসনের প্রত্যাশ্যায় সেই দিয়া বা দীপ জ্বালানো থেকেই দেওয়ালি বা দীপাবলি। কিন্তু দেওয়ালি মানে কি শুধুই রামচন্দ্র? আর রামচন্দ্র মানেই কি বাল্মিকীর রামায়ণ? অযোধ্যায় সরযূ নদীর পাড়ে রামমন্দির আর রামমূর্তি নির্মাণ নিয়ে যখন দেশ জুড়ে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ, তখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে রাম কার? তার অধিকার কি শুধুই কোনও একটি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর, নাকি রাম বেঁচে আছেন ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে?

দেওয়ালি আর রামচন্দ্র মেলালে তা উত্তর ভারতের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের উৎসবকে বোঝায়। তা কোনও ভাবেই বাঙালিকে মেলায় না। এখানে এই সময় বড় উৎসব কালীপুজো। বাঙালির কালীপুজোয় কোথাও নেই রাম। একই সময়ে আবার কালীপুজো বা দেওয়ালি কোনওটাই নয়, অন্য এক উৎসবে মাতেন ঝাড়খণ্ড, বিহার সহ আমাদের রাজ্যের পুরুলিয়া ও জঙ্গলমহলের আদিবাসীরা। দেওয়ালির রাত সাঁওতালদের কাছে বাঁদনা পরবের সময়।  বর্ষা ও তার পর চাষের জমিতে উদয়াস্ত পরিশ্রমের পর এই সময়টায় তাঁদের ঘরে ঘরে ফসল। হাজার হাজার বছর পর এখনও ভারতবর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ। বেশি হোক বা কম, ঘরে ফসল থাকায় নেই খিদের তাড়না। সেই নতুন ফসল আসার আনন্দে দেওয়ালির সময়ই বাঁদনা পরবে মাতেন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ। এই উৎসবেও কোনও ভাবে নেই রামচন্দ্র। বরং এখানে এখনও খুঁজে পাওয়া যায় কৃষিভিত্তিক আদিম গ্রামজীবনের যাপনচিত্র।

এ ছাড়া শুধু হিন্দু ধর্মের দিকে তাকালেই মেলে দেওয়ালির নানা তাৎপর্য। পূর্ব ভারতে এই সময় কালীপুজোয় মাতেন বাঙালিরা। মহাভারতে দেখা যায়, এই রাত বনবাস ছেড়ে পাণ্ডবদের ঘরে ফেরার সময়। কোথাও আবার দেওয়ালি ভগবান বিষ্ণুর সঙ্গে লক্ষ্মীর বিয়ের রাত। জৈন ধর্মেও এই অমাবস্যার রাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জৈনদের বিশ্বাস, এই রাতেই মোক্ষ লাভ করেছিলেন তাঁদের ২৪ তম তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীর। দেবতাদের উপস্থিতির জন্য অমাবস্যার রাতেও তিনি দেখতে পেয়েছিলেন আলোকোজ্জ্বল আকাশ। সেই থেকে আলো জ্বালিয়ে নিজেদের মতো করে দেওয়ালি পালন করেন জৈনরা। দেওয়ালির রাতেই গুরু হরগোবিন্দ সিংহ ও ৫২ জন শিখ রাজাকে মুক্তি দিয়েছিলেন মুঘল বাদশাহ জাহাঙ্গির। সেই থেকে ‘বন্দি ছোড় দিবস’ নামে এই দিনটি পালন করেন শিখ সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

বাঁদনা পরবে পুরুলিয়ার ডুংরিডি গ্রামে চালগুঁড়ির আলপনা। ছবি: অরুণাভ পাত্র। 

এ ভাবেই এই দিনটির সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে নিয়েছেন উপমহাদেশের মানুষ। তা কখনও কোনও নির্দিষ্ট ধর্ম বা রীতিতে আটকে থাকেনি। রাম, রামায়ণ ও অযোধ্যা— সেই স্রোতের একটি ধারা মাত্র। ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, অযোধ্যায় সরযূ নদীর পাড়ে রাম ও দেওয়ালি মিশিয়ে যে সর্বভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু তৈরির চেষ্টা চলছে, সেই চেষ্টা কোনও ভাবেই ভারতবর্ষের বৈচিত্র ছুঁতে পারে না। যা উত্তর ভারতের জন্য সত্য, তা আবার বদলে যায় পূর্ব বা দক্ষিণ ভারতে এসে।

শুধু দেওয়ালি নয়, এ ভাবেই স্থান, কাল আর পাত্র বিশেষে বদলে যান রামচন্দ্রও। বদলে যায় রামায়ণও। শুধু অযোধ্যায় আটকে না থেকে সে ছড়িয়ে পড়ে উপমহাদেশের কোনায় কোনায়, এমনকি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সুদূর প্রান্তেও। আর এই চলনকালে বদলে যায় রামায়ণের গল্প, বদলে যান রাম, হনুমান, সীতা আর লক্ষ্মণও। শুধু বাল্মিকী রামায়ণে আবদ্ধ না থেকে আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন রাম। বেঁচে থাকেন প্রাসাদ আর মন্দিরগাত্রের দেওয়ালে, কাব্যে, গানে, আঁকায়, উপন্যাসে, হাল আমলের গ্রাফিক নভেল আর ভিডিয়ো গেমে। আড়াই হাজার বছর ধরে এ ভাবেই জন্ম নিতে নিতে এগিয়ে চলেছে অসংখ্য রামায়ণ।

আরও পড়ুন: ফৈজাবাদ এখন অযোধ্যা, নীরব মন্দিরে

রামায়ণের সংখ্যা কত, তা নির্দিষ্ট ভাবে বলা আজ আর সম্ভব নয়। ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়া যে সব অঞ্চলে রামকথার প্রচলন আছে সেগুলি হল চিন, তাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, মায়ানমার, তিব্বত, বালি, জাভা, সুমাত্রা, মালয়েশিয়া। রামায়ণ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে তাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককের কাছেই আছে আয়োধিয়া বা অযোধ্যা নামের একটি জায়গা। ১৩৫০ থেকে ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই অযোধ্যা‍ থেকেই রাজ্যপাট চালাতেন শ্যামদেশের রাজারা। শুধু বংশ পরম্পরায় মোট ৩৭ জন রাজা নিজেদের নামের সঙ্গে রাম শব্দটি জড়িয়ে রেখেছিলেন। যদিও বাল্মিকী রামায়ণের সঙ্গে তাইল্যান্ডের রামায়ণের মিলের থেকে অমিলই বেশি। এখানে রাবণ ট্র্যাজিক চরিত্র। সর্বজ্ঞানী এই রাজার মৃত্যুতে শ্রোতাদের মধ্যে নামে বিষাদ। সীতা নামের এক জন মহিলাকে ভালবেসে নিজের সর্বনাশ ডেকে নিয়ে আসা রাবণের শেষ সংলাপ ঘিরে তাইল্যান্ডে তাই রচিত হয় ভালবাসার কবিতা। হনুমানও এখানে ব্রহ্মচারী নন। তাই-রামায়ণে হনুমানকে বার বার দেখতে পাওয়া যায় বিভিন্ন ভালবাসার দৃশ্যে।

ঐতিহাসিকদের মতে, মূলত তিনটি পথে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল রামায়ণ। প্রথমটি পঞ্জাব, কাশ্মীর হয়ে তিব্বত, চিন এবং পূর্ব তুর্কিস্তান। দ্বিতীয়টি গুজরাত ও দক্ষিণ ভারত থেকে জলপথ ধরে জাভা, সুমাত্রা, মালয়েশিয়া। তৃতীয় পথটি হল বাংলা থেকে মায়ানমার, লাওস, তাইল্যান্ড। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াতে রামায়ণের গল্প তৈরি হয় কিছুটা জাভা ও কিছুটা বাংলা থেকে যাওয়া রামায়ণের প্রভাবে।

শুধু বহির্বিশ্ব নয়, উপমহাদেশের মধ্যেও বিভিন্ন সময় তৈরি হয়েছে বিভিন্ন রামায়ণ। আজ থেকে ষোলোশো বছর আগে রামায়ণ লেখার সময় বাস্তবতাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন জৈন কবি বিমলসূরী। বাল্মিকী রামায়ণের মতো জৈন রামায়ণের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাম নয়। এখানে রাবণ দিয়েই গল্পের শুরু। মনে রাখতে হবে, জৈন ধর্মে ৬৩ জন শলাকাপুরষের এক জন হলেন রাবণ। রাবণকে এখানে দেখানো হয়েছে জ্ঞানী, বীর, যোদ্ধা এবং মহান হিসেবে। যদিও সীতাকে দেখার পর থেকেই প্রবল প্রেমে আকৃষ্ট হয়ে নিজের সর্বনাশ ডেকে এনেছিলেন রাবণ। কোনও কোনও জৈন রামায়ণে সীতাকে দেখানো হয়েছে রাবণের মেয়ে হিসেবে। আবার রাম নন, রাবণকে এখানে হত্যা করেছিলেন লক্ষ্মণ। দক্ষিণ ভারতে আরও বিভিন্ন ভাষায় রামায়ণ তৈরির সময় এই জৈন রামায়ণের প্রভাব পড়েছিল বেশ ভাল ভাবেই। তা বোঝা যায় তামিল ও কন্নড় রামায়ণ পড়লেই। তামিল ও কন্নড় লোকগানেও সীতাকে দেখানো হয়েছে রাবণের মেয়ে হিসেবেই। দক্ষিণ ভারতের অনেকেই তাই সীতাকে রাবণের মেয়ে হিসেবেই জানেন। এই অঞ্চলের কোনও কোনও রামকথা ও কাব্যে আবার রাম বা রাবণ নন, গল্প আবর্তিত হয় কেন্দ্রীয় চরিত্র সীতাকে ঘিরেই।

আরও পড়ুন: শবরীমালা উত্তপ্তই, নিগৃহীতা প্রৌঢ়া

রামের ক্ষেত্রে এই বদলে যাওয়া এক প্রকার অনিবার্যই। শুধু দক্ষিণ ভারত বা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া নয়, আমাদের কৃত্তিবাসী রামায়ণও বাল্মিকী রামায়ণ থেকে নিজেকে অনেকটাই বদলে নিয়েছে। এখানে রাম যেন এক বাঙালি পরিবারের প্রতীক। রামচন্দ্র মাদুরে বসে পাত্রমিত্রের সঙ্গে পরামর্শ করেন। এই রামায়ণে খাবার হিসেবে যা দেখানো হয়েছে, সেই ভাত, লুচি, রুই, চিতল মাছ, পুলিপিঠে, গুড়, পায়েস— আর যাই হোক, কোনও ভাবে বাল্মিকী রামায়ণকে মনে পড়তে দেয় না।

পরিবেশ ও পরিস্থিতিভেদে এই পরিবর্তনই রামায়ণকে করে তুলেছে সর্বগ্রাহ্য। যে কারণে আড়াই হাজার বছর পরেও নানা পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে দিয়েই বেঁচে আছেন রাম। যে কারণে বেঁচে আছে অসমের কার্বি উপজাতির মহিলাদের মধ্যে শূর্পনখার গান। এই গানে রাবণের বোন কৃষিকাজের দেবী। কার্বিদের বিশ্বাস, জঙ্গল কেটে চাষের জমি তৈরি করতেই বনবাসে গিয়েছিলেন রাম, সীতা আর লক্ষ্মণ। আর সেই কাজে তাঁদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সীতাই। ঐতিহাসিকেরা বলেন, মহারাষ্ট্রের নাসিকের সপ্তশ্রুঙ্গি দেবীও আসলে শূর্পনখা।

নিজেদের গায়েই রামনামের উল্কি করেন ছত্তীসগঢ়ের রামনামী সম্প্রদায়। ছবি সৌজন্য: পিপলস আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়া।

রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবিতে যখন সরযূ নদীর পাড়ে রীতিমতো যুদ্ধ পরিস্থিতি, তখন কোথায় আছেন ভারতবর্ষের দলিত সমাজ। রামের ওপর তাঁদের কোনও অধিকার আছে কি? কিভাবে তৈরি হয়েছিল রামনামী গোষ্ঠী? ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে রামকে পুজো করার অধিকার পেতে আন্দোলনে নেমেছিলেন ছত্তীসগঢ়ের দলিতরা। সেই আন্দোলনের পথ হিসেবে সারা গায়ে রামের উল্কি আঁকতে শুরু করেছিলেন তাঁরা। এ ভাবেই জন্ম হয়েছিল রামনামী গোষ্ঠী। রাম কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, তাঁকে পুজো করার অধিকার সবার আছে, এই বিশ্বাস থেকেই এই আন্দোলনের শুরু। আজও এই গোষ্ঠীতে নবজাতক জন্মানোর কয়েক বছরের মধ্যে তার গায়ে রামনাম লিখে উল্কি কেটে দেওয়ার চল আছে।

যে অবস্থানের বিরুদ্ধে নিজের গায়ে উল্কি আঁকতে শুরু করেছিলেন ছত্তীসগঢ়ের দলিতরা, সেই অবস্থানের সঙ্গে সাজুয্য রেখে থেকে আজও চলছে রামকে কুক্ষীগত করে রাখার প্রচেষ্টা। রামনবমীতে অস্ত্রমিছিল কৃত্তিবাসী রামের সঙ্গে মেলে না। বার বার ভুলে যাওয়া হচ্ছে যে, অযোধ্যা আর বাংলায় রামের চরিত্রের ফারাক অনেকটাই। সেই ফারাকটুকুই হয়তো রামায়ণের সাফল্যের সব থেকে বড় উপাদান। রামচন্দ্রের বিশ্বব্যাপী আবেদনের মাঝে অযোধ্যা হয় বিন্দুবৎ, নয়তো কোথাও সে হারিয়েই গিয়েছে। আড়াই হাজার বছর ধরে রামায়ণের যে সহস্র ধারা বয়ে চলেছে ভারতবর্ষ জুড়ে, সেখানে কোনও একটি ধারাকে মূল বলে ভাবাটাই হয়তো ভুল।

গ্রাফিক- শৌভিক দেবনাথ
 তথ্যসূত্র- থ্রি হান্ড্রেড রামায়ণাস, এ কে রামানুজন

রামকথার প্রাক-ইতিহাস, সুকুমার সেন

রামায়ণের বিশ্বায়ন, সুধীরকুমার করণ