কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গাঁধীর গায়ের রং নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে গত কাল হইচই ফেলে দিয়েছিলেন কেন্দ্রের ছোট ও মাঝারি শিল্প দফতরের প্রতিমন্ত্রী গিরিরাজ সিংহ। তবে গিরিরাজের মন্তব্যে তিনি এতটুকু বিচলিত নন বলে আজ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন সনিয়া।

কংগ্রেস সভানেত্রীকে নিশানা করে কাল গিরিরাজ বলেন, “রাজীব গাঁধী যদি কোনও নাইজেরীয় মহিলাকে বিয়ে করতেন, তা হলে কি তিনি কংগ্রেসের সভানেত্রী হতে পারতেন? সনিয়া গাঁধীর গায়ের রং সাদা বলেই তিনি কংগ্রেসকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।” এই মন্তব্যেই শুরু হয় সমালোচনা।

মধ্যপ্রদেশের নিমাচ গ্রামে আজ গিরিরাজ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নে সনিয়া বলেন, ‘‘উনি কী বলেছেন? ওই রকম নিচু মানসিকতার এক ব্যক্তির কথার কোনও জবাব আমি দিতে চাই না।’’ সনিয়া শুধুমাত্র এই মন্তব্য করে বিষয়টি থেকে দূরত্ব বজায় রাখলেও বিক্ষোভ-প্রতিবাদ থেকে সরানো যায়নি কংগ্রেস নেতা-কর্মীদের। আজ সারাদিন ধরে দিল্লি, বেঙ্গালুরু এবং পটনার মতো বিভিন্ন জায়গায় গিরিরাজকে পদ থেকে সরানোর দাবিতে সরব হয়েছেন তাঁরা।

বিতর্কে ইতি টানতে আগ্রহী বিজেপি নেতৃত্বও। দলীয় সূত্রে খবর, গোটা বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে অসন্তুষ্ট, তা গত কালই বোঝা গিয়েছিল। গিরিরাজের মন্তব্য নিয়ে শোরগোলের জেরে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ভবিষ্যতে তাঁকে সতর্ক হয়ে মন্তব্য করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আজ দলের জাতীয় কমর্সমিতির বৈঠক উপলক্ষে বেঙ্গালুরুতে বিজেপি মুখপাত্র শাহনওয়াজ হুসেন বলেছেন, ‘‘এই বিতর্কে ইতি টানাই বাঞ্ছনীয়। বিশেষত মন্ত্রী যখন তাঁর মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেওছেন, তার পরে বিরোধীদের আর এ নিয়ে জলঘোলা করার কোনও অর্থ হয় না।’’

দলের অন্দরেও সেই ভাবনাই ঘোরাফেরা করছে। বেশির ভাগ নেতা মনে করছেন, এ নিয়ে এত বাড়াবাড়ির কিছু নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যাবে। অতীতেও মোদী সম্পর্কে অনেকে অনেক উল্টোপাল্টা মন্তব্য করেছেন। কিন্তু তা নিয়ে কেউ ইস্তফা দিয়েছেন বা দুঃখপ্রকাশ করেছেন, এমন নয়। আর কিছু দিনের মধ্যেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ফের রদবদলের সম্ভাবনা রয়েছে। দলের তরফে দাবি, তত দিন পর্যন্ত গিরিরাজ-প্রসঙ্গের উত্তাপ কতটা বজায় থাকে, তা বুঝে ওই প্রতিমন্ত্রী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বেঙ্গালুরুতে কাল থেকে বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক। সেই উপলক্ষে যে হোটেলে উঠেছেন নেতা-মন্ত্রীরা, তার ঢিল ছোড়া দূরত্বে আজ বিক্ষোভ দেখান কংগ্রেস সমর্থকরা। গিরিরাজের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে তাঁর কুশপুতুল পোড়ান তাঁরা।

এর মধ্যে আজই বিহারের এক কোর্ট গিরিরাজ সিংহের বিরুদ্ধে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশকে। সনিয়াকে নিয়ে ওই আপত্তিকর মন্তব্য করায় পটনার কংগ্রেসকর্মী সঞ্জয়কুমার সিংহ ওই প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মুজফ্ফরপুর মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট বেদ প্রকাশ সিংহের আদালতে মানহানির মামলা করেন। বিচারক মামলাটি সাব ডিভিশনাল বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট অঞ্জু সিংহের কোর্টে (এসজে়ডিএম) পাঠিয়ে দেন। এসজে়ডিএম পরে পুলিশকে এফআইআরের নির্দেশ দেয়। পরে বিহারের দ্বারভাঙা থেকেও জেলা কংগ্রেসের সহ-সভাপতি পবনকুমার চৌধুরি গিরিরাজের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।

গিরিরাজ সিংহের পটনার বাড়ির সামনেও যুব কংগ্রেস কর্মীরা বিক্ষোভ দেখান। গত কাল রাতে মন্ত্রীর বাড়ি লক্ষ করে ডিম, টম্যাটো ছুড়তে থাকে তারা। তবে মন্ত্রী অবশ্য এখন দিল্লিতে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়। মন্ত্রীর নয়াদিল্লির বাড়ির বাইরেও যুব কংগ্রেস বিক্ষোভ দেখিয়েছে। দিল্লিতে বিজেপির সদর দফতরের বাইরে প্রতিবাদ জানান মহিলা কংগ্রেসের সদস্যরা।

পশ্চিমবঙ্গেও গিরিরাজ সিংহের বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদে সরব হয় কংগ্রেস। বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা মানস ভুঁইয়া এ দিন বলেন, ‘‘যে ভাষায় গিরিরাজ সনিয়াকে আক্রমণ করেছেন, তা কেন্দ্র ও বিজেপির বর্ণবিদ্বেষী মানসিকতারই প্রতিফলন। নারীবিদ্বেষী এই মন্তব্যের জন্য অবিলম্বে গিরিরাজকে বরখাস্ত করা হোক। করজোড়ে কেন্দ্রকেও ক্ষমা চাইতে হবে।’’ এ দিন দুপুরে গিরিরাজ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কুশপুতুল দাহ করে মৌলালি মোড়ে পথ অবরোধ করে মহিলা কংগ্রেস।