পাহাড়ি রাস্তা। বাঁ দিকে গভীর খাদ। ট্যাক্সি থরথর করে কাঁপছে। স্টিয়ারিংয়ের সামনে ড্রাইভারের লুকিং গ্লাসে কাঁপছিল পেছনের সিটে বসে থাকা অসুস্থ মেয়েটির মুখ। বার বার সে দিকেই চোখ চলে যাচ্ছিল গাড়ির ড্রাইভার রাকেশের। অসুস্থ রোগাটে যুবতীকে নিয়ে তাঁর ভাই যাচ্ছিল হাসপাতালে। কথায় কথায় রাকেশ জেনেছিলেন, বিনীতা নামের ওই বছর কুড়ির যুবতী আসলে বিধবা। ২০১৩ সালে উত্তরাখণ্ডে ঘটে যাওয়া জলপ্রলয়ে মৃত্যু হয়েছিল বিনীতার স্বামীর। কেদারনাথেই কাজ করতেন তার স্বামী। কেদারনাথের রাস্তাতেই ছোট্ট গ্রাম দেওলিভানি। ছবির মত গ্রাম। ফুলে ফুলে ভরা।

আরও পড়ুন: 

বকশিশ নেওয়ায় ২৪৩ নাপিতকে ছাঁটাই করল তিরুমালা

এপিজে আবদুল কালাম সম্পর্কে এই বিষয়গুলো জানতেন

কেদারনাথ আর দেওলির মাঝে রয়েছে আরও দুটি গ্রাম গুপ্তকাশী ও গৌরীকুণ্ড। যেন স্বর্গের কাছাকাছি গ্রামগুলি। বয়ে চলেছে পুণ্যসলিলা মন্দাকিনি। ২০১২ সালে এই গ্রামেই বিয়ে হয়েছিল বিনীতার। তখন তাঁর বয়স ১৮। স্বামী কেদারনাথে পিট্টর কাজ করতেন। পুন্যার্থীদের নিয়ে খচ্চরের পিঠে করে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পৌঁছে দিতেন কেদারনাথ মন্দিরে। মাসে দু’বার ফিরে আসতেন গ্রামে। সেই দিনগুলির দিকে চেয়ে থাকতেন বিনীতা। সারা দিনের ঘর-কন্যার কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে ছুটে বেড়াতেন সোনালি ভুট্টার ক্ষেতে। চলছিল ভালই।

বিনীতাকে পছন্দের গয়না পরিয়ে দিচ্ছেন রাকেশ।

পাহাড়ি গ্রামে মাঝে মাঝে বৃষ্টি এসে ধুয়ে দিত সব কিছু। কিছু ক্ষণ পরেই আবার সোনালি রোদ এসে পিছলে পড়ত বৃষ্টি ধোয়া চকচকে গাছের পাতায়, পাথরের সিড়িতে। ২০১৩ জুন মাসের মাঝামাঝি, আকাশের মুখ ভার করে শুরু হল বৃষ্টি। মিনিট, ঘণ্টা পেরিয়ে লাগাতার কয়েক দিন চলল বৃষ্টি। ১৬ জুন ভাসিয়ে দিল কেদারনাথ মন্দির সংলগ্ন গ্রামগুলি। প্রায় ৪ হাজার গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হল। নিখোঁজ হলেন প্রায় ১১ হাজার মানুষ। সরকারি হিসেবে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল মেঘভাঙা ওই জলপ্রলয়ে। দেওলি গ্রামের ৩৪ জন পুরুষ ভেসে গিয়েছিলেন ওই প্রলয়ে। ভেসে গিয়েছিল বিনীতার স্বপ্নও। প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে গিয়েছিল দেওলিভানি গ্রাম। ওই গ্রামের সমস্ত পুরুষেরই রোজগারের একমাত্র পথ ছিল কেদারনাথ। আজ দেওলিভানি গ্রামকে বিধবাদের গ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন কেউ কেউ। বিনীতা সেই বিধবাদেরই একজন।

বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র।

মেঘ ভাঙা বিপর্যয়ের পর খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত বিনীতা। ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর বাপের বাড়ি রুদ্রপ্রয়াগের কুমরি গ্রামে। মাসের পর মাস কেটে গেলেও কেউ যোগাযোগ করতেন না শ্বশুর বাড়ি থেকে। অসুস্থ বিনীতাকে বাঁচিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালাত তাঁর ছোট ভাইটি। বিধবা বোনের দুশ্চিন্তা আর হাসপাতালে ছুটোছুটি করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না ছোট ছেলেটার। ট্যাক্সি ড্রাইভার রাকেশ ভাইবোনকে পৌঁছে দিয়ে জেনে নিয়েছিলেন পরের হাসপাতালে আসার দিনটি। কাছেই তিলওরা গ্রামে তাঁর বাড়ি। এই ভাবেই পর পর বিনীতার হাসপাতালে যাওয়ার দিনগুলিতে রাকেশ যথাসময়ে পৌঁছে যেতেন কুমরি গ্রামের তেমাথায়। মায়া পড়ে গিয়েছিল মেয়েটির উপর। ভালবেসে ফেলেছিলেন মেয়েটিকে। এক দিন সরাসরি পৌঁছে গিয়েছিলেন বিনীতার বাড়িতে। তাঁর বাবা মাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন বিনীতাকে বিয়ে করার। ভয়ঙ্কর সাহস দেখিয়েছিলেন ট্যাক্সি ড্রাইভার রাকেশ। দিল্লি থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে এই অখ্যাত গ্রামে এমন চিন্তাও যে পাপ! হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন বিনীতার মা-বাবা। বিধবার বিয়ে হয়, এত বছরের জীবনে এমন কথা আগে শোনেননি তাঁরা, ভাবতেও পারেননি। এমন কথা যৌবনে বিধবা হওয়া রাকেশের মাও কখনও শোনেননি। কিন্তু তিনি এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলেন।

কী ভাবে খবর পৌঁছে গিয়েছিল বিনীতার শ্বশুরবাড়িতেও। ‘অনাচার’এর আশঙ্কায় তাঁরা ছুটে এসেছিলেন বিনীতার বাড়িতে। কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন এই বিয়েতে। বিনীতার গ্রামেও শোরগোল পড়ে গিয়েছিল এই খবর জানাজানি হওয়ার পরে। রাকেশও বিধবাকে বিয়ের ঘটনায় বিরূপ পরিস্থিতির আভাস পেয়েছিলেন তাঁর গ্রামে। দুই গ্রাম থেকেই হুমকির মুখে তিনি বিনীতাকে নিয়ে চলে এসেছিলেন আমসারি গ্রামে। সেখানে লুকিয়ে শুধুমাত্র দুই বাড়ির লোকজনকে সাক্ষী রেখে বিয়ে করেছিলেন তাঁরা।

কোনও ভাবে এই খবর পৌঁছে গিয়েছিল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সুলভের কাছে। সংগঠনটি উত্তরাখণ্ডের বন্যায় বিধবা হওয়া মহিলাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। বিনীতা-রাকেশের বিয়ের ঘটনাটিকে দেশের সামনে তাঁরা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরার কথা ভাবলেন। রাকেশ-বিনীতার বিয়েকে সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হল রাকেশের পরিবারকে। কিন্তু সে প্রস্তাবে সাড়া মিলল না কোনও পরিবারের থেকেই। সামাজিক লাঞ্ছনার ভয় তাঁদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। বছর তিনেক ধরে নানা ভাবে কাউন্সেলিঙের পর রাকেশ-বিনীতা এখন নিজেদের বিয়েকে সমাজের সামনে তুলে ধরতে আর দ্বিধান্বিত নন। তাঁদের এই মানসিক উত্তরণকে অভিনন্দিত করতে সোমবার বৃন্দাবনের সহস্র বিধবা মায়েদের মধ্যে, সহস্র প্রদীপ জ্বালিয়ে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে প্রাক দীপাবলি উদযাপন হবে বৃন্দাবনের গোপীনাথ মন্দিরে। তারই তোড়জোড় চলছে খুব। শাড়ি, বাসন-কোসন থেকে আসবাব— সব কিছুই কেনা হচ্ছে বেছে বেছে। দিল্লির সম্ভ্রান্ত এক গয়নার দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল রাকেশ ও বিনীতাকে। বহু উজ্জ্বল গয়নার মধ্যে থেকে তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন ছোট্ট দুটি সবচেয়ে অনাড়ম্বর আংটি। সোমবার গোপীনাথ মন্দিরে সেই দু’টি আংটিই সাক্ষী থাকবে রাকেশ-বিনীতার বিয়ের।

(তথ্য সহায়তা:সুমিত্রা রায়)