সেই ‘ভুতুড়ে আলো’র ঝলসানি এ বার দেখা গেল পশ্চিম মেদিনীপুরের সীতাপুরের আকাশে! আতসবাজির মতো। ব্রহ্মাণ্ডের প্রায় শৈশবের আলো। রবিবার, সন্ধ্যায়।

যে রহস্যময় আলোর সৃষ্টি হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১২শো কোটি বছর আগে। তখন আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ডের সদ্য শৈশব। বিগ ব্যাং বা মহা বিস্ফোরণের পর তখন চার পাশ জমাট অন্ধকারে ঢাকা। সবে ‘ভোরের আলো’ ফুটতে শুরু করেছে এখনকার তুলনায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সেই আদিমতম ব্রহ্মাণ্ডে।

গ্রহ, উপগ্রহ বা সূর্যের মতো তারা তো দূরের কথাই, কোনও গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের জন্মই হয়নি তখন। আকারে ব্রহ্মাণ্ড ছিল নেহাৎই শিশু! এখন ব্রহ্মাণ্ডের যা চেহারা, তার মাত্র ৩৫ শতাংশ। সবে তৈরি হতে শুরু করেছে প্রথম প্রজন্মের তারাগুলি। বিগ ব্যাং-এর ৫০ থেকে ৭০ কোটি বছরের মধ্যেই সেই রহস্যময় আলোর সৃষ্টি হয়েছিল অসম্ভব শক্তিশালী গামা রশ্মির বিস্ফোরণের দৌলতে। গ্যালাক্সিগুলির জন্ম হতে শুরু করেছিল বিগ ব্যাং-এর ১০০ থেকে ১৫০ কোটি বছর পর থেকে।

রবিবার, সন্ধ্যা ৭টায় হয় সেই আলোর ঝলসানি!

সীতাপুরের আকাশে রবিবার ধরা পড়েছে এই রহস্যময় আলো ‘জিআরবি-১৯০১০৬এ’। সৌজন্যে: আইসিএসপি, কলকাতা।

পশ্চিম মেদিনীপুরের সীতাপুরের আকাশে রবিবার সন্ধ্যা ৭টা ৪ মিনিটে দেখা গিয়েছিল সেই আলো। সময়ের সুদীর্ঘ ধারায় আর প্রায় দেড় হাজার কোটি বছর ধরে এই ব্রহ্মাণ্ডে দৌড়তে গিয়ে অত্যন্ত ক্ষীয়মান হয়ে পড়া সেই রহস্যময় আলো ধরা পড়েছিল দেশের বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী, কলকাতার ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্স (আইসিএসপি)-এর অধিকর্তা সন্দীপ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একটি গবেষকদলের চোখে। তাঁদের ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের লেন্সের অত্যন্ত শক্তিশালী ‘বশিষ্ঠ’ টেলিস্কোপের নজরে। সঙ্গে ছিল ১০ ইঞ্চি ব্যাসের ‘অরূন্ধতী’ টেলিস্কোপও। এতটাই ক্ষীয়মান ছিল সেই আলো যে, তার পরের দিন আর সেই ভুতুড়ে আলোকে আর দেখা যায়নি, এমনকী, অত্যন্ত শক্তিশালী টেলিস্কোপেও। সেই রহস্যময় আলোর নাম দেওয়া হয়েছে, ‘জিআরবি-১৯০১০৬এ’। নামকরণের সংখ্যাতেই বলে দেওয়া রয়েছে, কবে তা ধরা পড়েছে কলকাতার বাঙালি বিজ্ঞানীদের চোখে।

‘ভিনগ্রহীদের আলো’র চেয়েও শক্তিশালী!

গামা রশ্মির বিস্ফোরণের পর আলোর ঝলসানি

আনন্দবাজার ডিজিটাল’কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সন্দীপ বললেন, ‘‘আমরা যে ভুতুড়ে আলো দেখেছি, তা আদতে গামা রে বার্স্ট (জিআরবি)। অসম্ভব শক্তিশালী গামা রশ্মির বিস্ফোরণ। তখন ব্রহ্মাণ্ডে প্রায় কিছুই ছিল না। বিগ ব্যাং-টা, খুব বেশি হলে, হয়েছে তার ৫০ থেকে ৭০ কোটি বছর আগে। ওই সময় গামা রশ্মির বিস্ফোরণের পর সেই রশ্মি গিয়ে ধাক্কা মেরেছিল চার পাশে জমাট বেঁধে থাকা গ্যাস, ধুলোবালির মেঘকে। সেই প্রচণ্ড তাপে তেতে উঠেছিল আদিমতম ব্রহ্মাণ্ডের জমাট বাঁধা মেঘ। তেতে ওঠা মেঘ থেকে বেরিয়ে এসেছিল ধোঁয়া। বিকিরণ। সেই রহস্যময়, প্রায় বিরল আলোই আমরা দেখেছি সীতাপুরে, রবিবার সন্ধ্যায়।’’

গামা রে বার্স্ট (জিআরবি) কী জিনিস? দেখুন নাসার ভিডিয়ো

আরও পড়ুন- ব্রহ্মাণ্ডের ভোরের প্রথম আলোর হদিশ মিলল

আরও পড়ুন- বিদ্যুতের অপচয় আর হবে না! এক শতাব্দী পর খোঁজ মিলল সেই ‘দুর্লভ’ পদার্থের

এই আলো ‘ভিনগ্রহীদের আলো’ বা ফার্স্ট রেডিও বার্স্টের চেয়েও বেশি শক্তিশালী।

কী ভাবে হঠাৎ সেই আলোর ঠিকানা জানতে পারলেন কলকাতার বিজ্ঞানীরা?

সন্দীপ জানাচ্ছেন, পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা ‘সুইফ্‌ট’ উপগ্রহের টেলিস্কোপে ওই দিন সন্ধ্যায় প্রথম ধরা পড়েছিল সেই রহস্যময় আলো। সঙ্গে সঙ্গে উপগ্রহটি টেলিগ্রামে খবর পাঠায় আমাদের। তার পরেই সচেতন হয়ে ওঠেন কলকাতার বিজ্ঞানীরা। শুরু হয় টেলিস্কোপ দিয়ে তন্নতন্ন খোঁজতল্লাশ। ‘‘শেষ পর্যন্ত আমরা সেই রহস্যময় আলোর দেখা পাই রবিবার রাত ১০টা নাগাদ’’, জানালেন সন্দীপ।

যাদের নজরে ধরা পড়ল রহস্যময় আলো, সেই টেলিস্কোপ। সৌজন্যে: আইসিএসপি, কলকাতা।

উপগ্রহের পাঠানো ‘মেসেজ’ পেয়েও তার খোঁজ পেতে দেরি হল কেন?

সন্দীপের কথায়, ‘‘কোথায় সেই রহস্যময় আলো দেখা যেতে পারে, তার আভাস দিতে গিয়ে সুইফ্‌ট’ মহাকাশের অনেক বড় এলাকার কথা জানিয়েছিল আমাদের। যার মাপ ছিল মহাকাশের ৩ আর্ক মিনিট কৌণিক অবস্থানের বিশাল একটি এলাকা। তার পর আমরা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি, কোথায় দেখা যাচ্ছে সেই আলো। পাইনি। তখন আমরা মহাকাশের আরও ছোট এলাকায় নজর রাখতে শুরু করি, টেলিস্কোপের মাধ্যমে। সেই ভাবেই রাত ১০টা নাগাদ দেখতে পাই ওই আলো। মহাকাশের ০.৪৬ আর্ক সেকেন্ড কৌণিক অবস্থানের এলাকায়। আমাদের কৃতিত্ব, অত্যন্ত নির্দিষ্ট ভাবে সেই আলোর ক্ষেত্রটিকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। পরের দিন আমরা সেই আলোকে আর দেখতে পাইনি।’’

উজ্জ্বলতম গামা রশ্মি বিস্ফোরণের ঘটনা দেখুন নাসার ভিডিয়োয়

এর আগে ভারতে এক বারই ওই রহস্যময় আলোর দেখা মিলেছিল। সেটা ২০০০ সাল। নৈনিতালের ‘এরিস’-এর বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী রাম সাগর সেই আলোর দেখা পেয়েছিলেন। তার দেখা সেই আলো ছিল আরও একটু বেশি আদিম। এখনকার চেহারার তুলনায় তখনকার ব্রহ্মাণ্ড ছিল মাত্র ৩৩ শতাংশ! সেই ‘ভুতুড়ে আলো’র নাম ছিল- ‘জিআরবি-০০০৩০১-সি’।

এই ‘আলো’ কতটা হাতিয়ার পারে বিজ্ঞানীদের ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য সন্ধানে?

সন্দীপ বলছেন, ‘‘যে হেতু এই আলো গ্যালাক্সি সৃষ্টিরও আগে জন্মেছে, তাই ওই আলোর সূত্র ধরে বিগ ব্যাং বা তার কিছু পরের সময়ে কোন কোন ঘটনা, কী ভাবে ঘটেছিল, তা জানার কাজটা সহজতর হবে।’’

এও জানাচ্ছেন, লোকজন যাকে ‘ভিনগ্রহীদের আলো’ বা ফার্স্ট রেডিও বার্স্ট (এফআরবি) বলেন, সীতাপুরের আকাশে হদিশ মেলা রহস্যময় আলোর বয়স তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি। শক্তির দাঁড়িপাল্লাতেও তা অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে ‘ভিনগ্রহীদের আলো’-র চেয়ে।

ছবি ও ভিডিয়ো সৌজন্যে: নাসা