ঠিক যেমনটি চাইছিল, দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর ঠিক তেমনটিই পেল নাসা। একটা নয়, তিন-তিনটি গ্রহ। আমাদের মোটামুটি কাছেপিঠেরই একটি নক্ষত্রমণ্ডলে। মেরেকেটে ৭৩ আলোকবর্ষ দূরে।

ব্রহ্মাণ্ডে এত কাছে, এত ‘মনের মতো’ ভিন গ্রহ এর আগে আর পাওয়া যায়নি, এমনটাই দাবি নাসার। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার ‘ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট’ (টেস)-এর গোয়েন্দা নজরদারিতেই ধরা দিয়েছে ওই তিনটি ভিন গ্রহ।

সেই তিন ‘আগন্তুক’ আপাদমস্তক পৃথিবীর মতোই কি না, তাদেরও আমাদের মতোই পুরু বায়ুমণ্ডল রয়েছে কি না, সেই মুলুকেও রয়েছে কি না তরল জল বা শ্বাসের বাতাস, সেই সব এখনও জানা যায়নি ঠিকই; কিন্তু প্রাণের সহায়ক পরিবেশ মিলতে পারে, এই আবিষ্কারে এমন আশা জোরালো হয়ে উঠেছে বিজ্ঞানীদের।

আবিষ্কারের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’তে। ২৭ জুলাই। যে গবেষকদলে রয়েছেন এক অনাবাসী ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী। কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নীলেশ মহাপাত্র।

কেন এই তিনটি গ্রহকে ‘মনের মতো’ মনে হয়েছে নাসার?

‘আনন্দবাজার ডিজিটাল’-এর পাঠানো প্রশ্নের জবাবে অন্যতম গবেষক, কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নীলেশ মহাপাত্র জানিয়েছেন, ওই তিনটি ভিন গ্রহের মধ্যে একটি পৃথিবীর চেয়ে আকারে সামান্য বড়। ওজনেও কিছুটা দড়। বাকি দু’টি এমন ধরনের যার মতো কোনও গ্রহের হদিশ এখনও পর্যন্ত মেলেনি আমাদের সৌরমণ্ডলে।

আমাদের থেকে মাত্র ৭৩ আলোকবর্ষ দূরে থাকা ওই নক্ষত্রমণ্ডলটির নাম দেওয়া হয়েছে, ‘টিওআই-২৭০’। ‘টিওআই’ শব্দটির অর্থ, ‘টেস অবজেক্ট অফ ইন্টারেস্ট’। তার মানে, নাসার ‘টেস’ উপগ্রহ প্রাণের সহায়ক পরিবেশের সন্ধানে যে ধরনের ভিন গ্রহ বা নক্ষত্রমণ্ডলগুলিকে খুঁজে চলেছে, সদ্য আবিষ্কৃত তারামণ্ডলটি পড়ে তাদেরই মধ্যে।

সূর্যের চেয়ে অনেক ঠান্ডা ওই নক্ষত্রের পিঠ!

নীলেশ বলছেন, ‘‘এই নক্ষত্রমণ্ডলের অভিনবত্ব কোথায়? অভিনবত্বটা হল, তার ‘সূর্য’ বা নক্ষত্রের চেহারা ও চরিত্রে। গোত্রের নিরিখে এই নক্ষত্রগুলি পড়ে ‘এম-৩’-তে। যা আমাদের সূর্যের চেহারা ও ওজনের ৪০ শতাংশ মাত্র। তার মানে, আমাদের চেহারায় আমাদের সূর্যের কাছে তো নস্যিই, ওজনেও আমাদের সূর্যের মতো ভারী নয় ‘টিওআই-২৭০’ নক্ষত্র। শুধু তাই নয়, ওই নক্ষত্র আমাদের সূর্যের মতো অতটা তেতেপুড়েও নেই। বরং অনেকটাই ঠান্ডা। সূর্যের মতো পুরোদস্তুর তারা হয়ে উঠতে পারেনি বলেই ‘টিওআই-২৭০’ আদতে বামন নক্ষত্র (ডোয়ার্ফ স্টার)। তাই আমাদের সূর্যের পিঠ যতটা গরম, এই বামন নক্ষত্রটির পিঠের তাপমাত্রা তার তিন ভাগের এক ভাগ।’’

মাত্র ৭৩ আলোকবর্ষ দূরে...

পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার জন্যেও এই তারামণ্ডলটি রয়েছে আমাদের যথেষ্টই কাছে। মাত্র ৭৩ আলোকবর্ষ দূরে। আকাশের দক্ষিণ দিকে থাকা ‘পিক্টর’ নক্ষত্রপুঞ্জে।

ভিন গ্রহে প্রাণ: গত তিন দশকের অভিযান। দেখুন নাসার ভিডিয়ো

তিনটি ভিন গ্রহের মধ্যে অন্তত দু’টি তাঁদের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে, জানাচ্ছেন গবেষকরা। তাদের একটির নাম- ‘টিওআই-২৭০-বি’। অন্য ভিন গ্রহটি- ‘টিওআই-২৭০-ডি’।

আরও পড়ুন- মহাকাশে এই প্রথম খোঁজ মিলল ‘প্রবলেম চাইল্ড’-এর​

আরও পড়ুন- ভিনগ্রহে প্রাণ আছে, প্রমাণ এক বছরেই, দাবি বিজ্ঞানীর

একটি পাথুরে, অন্য দু’টি হতে পারে গ্যাসে ভরা

তিনটি ভিন গ্রহের মধ্যে নক্ষত্রের (টিওআই-২৭০) সবচেয়ে কাছে রয়েছে যে ভিন গ্রহটি, তার নাম- টিওআই-২৭০-বি। এই গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে আকারে ২৫ শতাংশ বড়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই গ্রহটিরই আমাদের পৃথিবী বা মঙ্গলের মতো পাথুরে গ্রহ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

বুধ গ্রহটি যতটা দূরত্বের কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে সূর্যকে, তার চেয়ে ১৩ গুণ কম দূরত্বে এই টিওআই-২৭০-বি ভিন গ্রহটি পাক মারে তার নক্ষত্র টিওআই-২৭০-এর চার পাশে। তার জন্য পৃথিবীর চেয়ে সময়ও নেয় অনেকটাই কম। সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবী সময় নেয় ৩৬৫ দিন। আর এই ভিন গ্রহটি তার নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় ৩ দিন ৪ ঘণ্টা। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই গ্রহটির ওজন হতে পারে পৃথিবীর প্রায় দু’গুণ (১.৯ গুণ)।

দু’টি গ্রহ নেপচুনের ক্ষুদ্র সংস্করণ

নীলেশের কথায়, ‘‘তবে এই গ্রহে প্রাণের সহায়ক পরিবেশ পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা কী রয়েছে, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে আমাদের। কারণ, যতই মিইয়ে পড়া তারা হোক টিওআই-২৭০, গ্রহটি তার এতটাই কাছে রয়েছে যে, তার গা পুড়ে যাচ্ছে। তার ফলে, তার বায়ুমণ্ডল রয়েছে কি না, থাকলেও তা উড়ে-পুড়ে যাচ্ছে কি না, তা জানতে হবে।’’

গবেষকরা জানিয়েছেন, বাকি দু’টি গ্রহের অন্যতম টিওআই-২৭০-সি পৃথিবীর আকারের প্রায় আড়াই গুণ (আদতে ২.৪ গুণ)। যা তার নক্ষত্রটিকে প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় ৫ দিন ৭ ঘণ্টা। আর অন্য গ্রহ, টিওআই-২৭০-ডি ২.১ গুণ বড় পৃথিবীর চেয়ে। টিওআই-২৭০ নক্ষত্রটিকে প্রদক্ষিণ করতে ওই ভিন গ্রহটি সময় নেয় ১১ দিন ৪ ঘণ্টা।

নীলেশ বলছেন, ‘‘টিওআই-২৭০-সি এবং টিওআই-২৭০-ডি, এই দু’টি গ্রহই আমাদের নেপচুনের ছোটখাটো সংস্করণের মতো বলে মনে হচ্ছে আমাদের। সে ক্ষেত্রে সেগুলি হয়তো পাথুরে না হয়ে হবে গ্যাসে ভরা গ্রহ। ওজনে হতে পারে পৃথিবীর ৭ বা ৫ গুণ বেশি, যথাক্রমে।’’

যেমন চাঁদ, তিনটি গ্রহের একটা পিঠ সূর্যের দিকে সব সময়...

নীলেশ এও জানিয়েছেন, আমাদের চাঁদের যেমন একটা পিঠ সব সময় থাকে পৃথিবীর দিকে (টাইড্যালি লক্ড), ঠিক তেমনই এই তিনটি গ্রহেরও একটি পিঠ সব সময় থাকে তাদের নক্ষত্রের দিকে। অন্য দিকটিকে সেই গ্রহগুলি কখনওই দেখায় না তাদের নক্ষত্রকে। ফলে, গ্রহগুলির একটি দিকে যেমন নক্ষত্রের আলো ও বিকিরণ আছড়ে পড়ছে সব সময়, অন্য দিকটি তেমনই বঞ্চিত হয় নক্ষত্রের আলো বা বিকিরণের থেকে। তাই যে দিকটিতে আলো পড়ে না, সেই দিকে প্রাণের জন্ম বা টিঁকে থাকা সহজ হতে পারে বলে ধারণা।

নীলেশের কথায়, ‘‘তবে আমাদের সবচেয়ে আগ্রহ ওই নক্ষত্রমণ্ডলের সবচেয়ে বাইরের দিকে থাকা ভিন গ্রহ টিওআই-২৭০-ডি-কে নিয়ে। কারণ, তার পিঠের গড় তাপমাত্রা মাত্র ৬৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা প্রাণের সহায়ক হতেই পারে। আগামী দিনে, এই নক্ষত্রমণ্ডলে এমন আরও কয়েকটি গ্রহের হদিশ পাওয়ার আশা করছি।’’

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

ছবি ও ভিডিয়ো সৌজন্যে: নাসা